Written by 11:14 am বিশ্লেষণ Views: 2

বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি হরমুজ প্রণালী?

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান-আমেরিকা সংঘাত কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে? চার্চিলের গ্যালিপোলি ভুল থেকে মন্ট্রে মডেল—ট্রাম্পের জন্য কোন পথ সঠিক?

ইতিহাসের চাকা কি বারবার একই জায়গায় ফিরে আসে? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান উইনস্টন চার্চিল যে ভুল করেছিলেন তুরস্কের ডারডানেলেস প্রণালিতে, সেই একই ভুল করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প? পারস্য উপসাগরের সংকীর্ণ এক জলপথ—হরমুজ প্রণালি। বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয় যাকে। এই পথ নিয়ে ইরান আর আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধ কি আমাদের আরেকটি ‘গ্যালিপোলি ট্র্যাজেডি’র দিকে ঠেলে দিচ্ছে? তুরস্কের ইতিহাসই হতে পারে ট্রাম্পের জন্য একটি উদাহরণ।

বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি—হরমুজ প্রণালি

প্রথমে বুঝতে হবে হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ। পুরো বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং বিশ্বের বড় অংশের এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) এ পথটি দিয়ে যায়। ইরান বর্তমানে কার্যত এই পথটি নিয়ন্ত্রণ করছে। যদি কোনোভাবে এখানে সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তবে কেবল জ্বালানি সংকট নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। ট্রাম্পের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—কোনো অন্তহীন যুদ্ধ ছাড়াই এই জলপথকে উন্মুক্ত রাখা। কিন্তু সংকীর্ণ জলপথ কেবল ভৌগোলিক বাধা নয়, এটি সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

চার্চিলের সেই ঐতিহাসিক ভুল

ফিরে যাওয়া যাক ১৯১৫ সালে। উইনস্টন চার্চিল এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করলেন। তুরস্কের ডারডানেলেস প্রণালি দখল করে রাশিয়াকে সাহায্য করবেন এবং অটোমানদের কুপোকাত করবেন। ফলাফল কী হয়েছিল? ইতিহাসে এটি ‘গ্যালিপোলি অভিযান’ নামে পরিচিত—যা ছিল এক রক্তাক্ত বিপর্যয়। ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। চার্চিলকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। তুর্কিদের কাছে এটি ছিল এক নতুন জাতি গঠনের বীরত্বগাথা। তাদের স্লোগান ছিল—‘চানাককালে পার হওয়া সম্ভব নয়’। এই পরাজয় কেবল ব্রিটিশদের হার নয়, রাশিয়ার রাজতন্ত্রের পতনেরও অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শক্তি প্রয়োগ করে প্রণালি জয় করার সেই চেষ্টা আজও সাম্রাজ্যগুলোর জন্য এক সতর্কবার্তা।

মন্ট্রে কনভেনশন ও সমাধানের পথ

তাহলে সমাধান কী? সমাধান লুকিয়ে আছে তুরস্কেরই আরেক ইতিহাসে—১৯৩৬ সালের ‘মন্ট্রে কনভেনশন’। এই চুক্তি দেখিয়েছিল কীভাবে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেও আন্তর্জাতিক জলপথ উন্মুক্ত রাখা যায়। এই চুক্তির ফলে তুরস্ক যেমন যুদ্ধের সময় জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা পায়, তেমনি শান্তির সময় অবাধ বাণিজ্য নিশ্চিত হয়। এমনকি সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধেও তুরস্ক এই ক্ষমতা ব্যবহার করে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ রুখে দিয়েছিল।

সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প যদি মনে করেন ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র আর মাইনে সজ্জিত ইরানকে কেবল নৌবাহিনী দিয়ে পিষে ফেলবেন, তবে তিনি ভুল করছেন। ইরান এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অস্ত্র ব্যবহার করে মার্কিন নৌবাহিনীকে বড় বিপদে ফেলতে পারে।

ট্রাম্পের জন্য ‘মন্ট্রে মডেল’ ও আগামীর পথ

যদিও হরমুজ আর তুরস্ক হুবহু এক নয়, তবে মন্ট্রে মডেল এখানে প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। ইরান এবং ওমানের সীমান্তে অবস্থিত এই প্রণালি নিয়ে একটি বহুপক্ষীয় কাঠামো তৈরি করা জরুরি। যেখানে জাহাজ বা ট্যাংকারে আক্রমণ না করার আইনি প্রতিশ্রুতি থাকবে। এর বিনিময়ে ইরানের কিছু যৌক্তিক স্বার্থ পূরণ করা যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি কোনো আকাশকুসুম কল্পনা দিয়ে হবে না, বরং ইরানের আঞ্চলিক ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই আসতে পারে। ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে, হরমুজ যেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের জন্য আরেকটি ‘গ্যালিপোলি’ হয়ে না দাঁড়ায়।

ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, কৌশলগত চেকপয়েন্টগুলো কেবল পেশিশক্তি দিয়ে শাসন করা যায় না। সেখানে প্রয়োজন নিয়ম আর ভারসাম্যের কূটনীতি। ট্রাম্প কি ইতিহাসের সেই ধুলোপড়া পাতা থেকে শিক্ষা নেবেন? নাকি আরও একবার বিশ্ব দেখবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?

Visited 2 times, 1 visit(s) today
Close