Written by 12:12 pm বিশ্লেষণ Views: 4

পাটওয়ারীর ছাগল-মন্তব্য ও প্রতিহিংসার রাজনীতি

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ছাগল-মন্তব্য কি নিছক বাগাড়ম্বর, নাকি গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নেতৃত্বের চরিত্র সম্পর্কে একটি সতর্কসংকেত? রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখুন কেন এই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ।

বটি দিয়ে গলাটা যতটুকু কাটা গিয়েছিল, ছুরি আসার আগ পর্যন্ত অবোধ প্রাণীটা ঠিক কতটা কষ্ট পেয়েছিল — সেটা কেউ জানে না। আর একটা ছোট্ট শিশু, যার কাছে ওই ছাগল ছিল বন্ধু, সে কাঁদতে কাঁদতে বমি করে দিয়েছিল, দেড় দিন কিছু খেতে পারেনি। এই দৃশ্যটা লেখক ও চিত্রনাট্যকার রাজীব হাসানের মতো অনেককেই শিউরে তুলেছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসিফ নজরুলের ছাগল চুরির ঘটনা তখন হয়েছিল নিছক হাসির খোরাক। কিন্তু সম্প্রতি ‘ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন’ টকশোতে আসিফ নজরুল এটিকে বললেন জীবনের অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা, আর যারা এটা করেছে তাদের তিনি বললেন “ইতর, বদমাইশ, পাষণ্ড পশু আর কেউ নেই”। কথাটার অর্থ স্পষ্ট — তিনি এটিকে কৌতুক নয়, চরম নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখছেন।

অথচ তার এক বছর আগে তিনি জুলাই-অভ্যুত্থানের নেতাদের “বাবা” সম্বোধন করে বলেছিলেন, তাঁরা যেন আরও অন্তত পাঁচ-দশ বছর নেতৃত্বে থেকে রাষ্ট্রকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেন। তখন তিনি মনে করতেন এই নেতারাই দেশের জন্য ভালো নেতৃত্ব।

তাঁর মতো আমরাও ভেবেছিলাম — অভ্যুত্থানের পর যে আসবে, সে আগের চেয়ে ভালো হবে। অথচ কিছুদিন আগে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রকাশ্যে বললেন, একটি ছাগল খাওয়া উচিত হয়নি, দুইটাই খাওয়া উচিত ছিল। একজন রাজনৈতিক নেতা একটি শিশুর কষ্টকে কৌতুক বানিয়ে প্রতিহিংসাকে উদযাপন করছেন। এবার বলুন — এটা কি সেই নেতৃত্বের ভাষা, যার স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম?

রাজীব হাসান ঠিক এই জায়গাতেই আঙুল তুলেছেন। পাটওয়ারী যখন নবীজির জীবনদর্শন নিয়ে অন্যকে নসিহত করতে যান, রাজীব হাসান মনে করিয়ে দেন সেই পুরোনো ঘটনার কথা — নবীজি চাদরের যে কোণে পোষা বিড়াল ঘুমিয়ে ছিল, সেটুকু কেটে ফেলেছিলেন, তবু বিড়ালের ঘুম ভাঙাননি। তাহলে কী দাঁড়াল? যে সহমর্মিতার কথা পাটওয়ারী মুখে বলছেন, নিজের আচরণে তার ছিটেফোঁটাও কি রেখেছেন?

প্রাবন্ধিক ফিরোজ আহমেদ এই ঘটনাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে গেছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক দিশার অভাবে এত বড় একটি গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন প্রায় “ছাগল চোরদের হাতে” তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত পাকা হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ পাটওয়ারীর ছাগল-কাণ্ড এখানে নিছক একটি ঘটনা নয় — এটি একটি রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্নের প্রতীক। প্রশ্ন উঠছে, গণ-অভ্যুত্থানের ফসল কারা নিচ্ছে?

এর উত্তরে যাওয়ার আগে একটু ভাবুন — পাটওয়ারীর এই সুর আমাদের পরিচিত কোন শাসকের সঙ্গে মেলে? প্রতিহিংসার এই সুর আমরা আগেও শুনেছি। ২০২২ সালে কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনার মুখেও প্রতিপক্ষকে পদ্মা সেতু থেকে “টুস করে” নদীতে ফেলে দেওয়ার কথা ছিল। পার্থক্য একটাই — হাসিনার পেছনে ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের পূর্ণ ক্ষমতা, পাটওয়ারীর পেছনে সেই কাঠামো এখনো নেই। কিন্তু আসতেও তো পারে, তাই না?

অভ্যুত্থানের পুরো বৈধতাই দাঁড়িয়ে ছিল একটি দাবির ওপর — আমরা পুরোনোদের চেয়ে নৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত, ভিন্ন। আর এই “সাংস্কৃতিক ভিন্নতা”র দাবিটাই ছিল ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগের জবাব, কারণ ওই সংগঠনের চরিত্র হয়ে উঠেছিল দখল, প্রতিহিংসা আর প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো।

তাই যে নেতৃত্ব ঠিক এই চরিত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার রাজনীতি করছে বলে দাবি করে, তাদের মুখে যখন প্রতিপক্ষের কষ্টকে কৌতুক বানানো এবং প্রতিহিংসাকে উদযাপন করার একই ভাষা ঘুরেফিরে আসে, তখন রুচির প্রশ্ন উঠবেই।

আর কেন এই ভাষাকে হালকাভাবে দেখা উচিত নয়, তা বোঝাতে একটু রাজনীতিবিজ্ঞানের দিকে তাকানো দরকার। হার্ভার্ডের দুই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাট তাঁদের বহুল আলোচিত ‘How Democracies Die’ (২০১৮) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, একজন রাজনীতিক গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবেন কিনা, তা আগেভাগেই চেনার উপায় আছে। সেখানে চারটি পূর্বলক্ষণের কথা বলা হয়েছে, যার একটি হলো প্রতিপক্ষকে বৈধ প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং “অস্তিত্বের হুমকি বা বিশ্বাসঘাতক” হিসেবে উপস্থাপন করা — অর্থাৎ এমনভাবে দেখানো যেন প্রতিপক্ষ নির্মূল করে দেওয়ারই যোগ্য।

এখন মিলিয়ে দেখুন। প্রতিপক্ষের কষ্টকে উপভোগ্য বানানো, প্রতিশোধকে উদযাপন করা — এই সুরটা ঠিক সেই লক্ষণেরই ক্ষুদ্র সংস্করণ। প্রতিদ্বন্দ্বীকে মানুষ নয়, উপহাসযোগ্য বা শাস্তিযোগ্য বস্তুতে পরিণত করা। তবে এটুকু বলেই থামা দরকার — একটি মন্তব্য লক্ষণ হতে পারে, প্রমাণ নয়। লক্ষণ মানে সতর্কের লালবাতি জ্বলে উঠেছে।

তাহলে কোন নেতৃত্ব ভালো? রাজনৈতিকভাবে কে ভালো, তা মাপা হয় প্যাটার্নে, কোনো একটি মন্তব্যে নয়। দেখতে হবে বিরোধী কণ্ঠ দমন হচ্ছে কিনা, প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ হচ্ছে কিনা, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে কিনা। কিন্তু ফিরোজ আহমেদের সতর্কবার্তা — রাজনৈতিক দিশার অভাব — ঠিক এই জায়গায় একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ক্ষমতার আসল পরীক্ষায় এই নেতৃত্ব কি সত্যিই আলাদা হবে — নাকি আমরা আবারও একই ধরনের নেতৃত্বই পাচ্ছি, শুধু ভিন্ন শব্দের মোড়কে?

Visited 4 times, 1 visit(s) today
Close