Written by • 10:44 am• বিশ্লেষণ • Views: 86

সবাই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায়, তবু সংকট কোথায়?

বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নীতিগতভাবে জুলাই সনদের পক্ষে হলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সংসদে তীব্র বিতর্ক ও ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের দাবি, তারা কাজ করছে ‘জনগণের’ জন্য। কিন্তু অনেক সময় সেই কাজ নিয়ে তাদের ‘মত’, ‘পথ’, ‘পদ্ধতি’, ‘প্রক্রিয়ার’ বিরোধ এমন পর্যায়ে যায়, তখন যেন ‘জনগণ’ হারিয়ে যায়, প্রকট হয়ে ওঠে দলের এজেন্ডা।

সর্বশেষ উদাহরণ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গত দেড় বছর নানা শঙ্কা পেরিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন শেষে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রথম সংসদ অধিবেশনেই সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়াল ‘জুলাই সনদ’। এ নিয়ে বিতর্কে সংসদে বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি করেছে ওয়াকআউট, এমনকি দিয়েছে আন্দোলনের ঘোষণা। অথচ মজার ব্যাপার হলো—বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি (জাতীয় নাগরিক ফ্রন্ট/ছাত্রপ্রতিনিধি)—এই তিন দলই নীতিগতভাবে জুলাই সনদের পক্ষে। তারা সবাই জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চায়। কিন্তু সংকট দানা বেঁধেছে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে।

কেউ প্রশ্ন তুলছেন রাষ্ট্রপতির আদেশে গণভোট নিয়ে, কেউ বলছেন জনগণের সঙ্গে প্রতারণা হচ্ছে, আবার কেউ দুষছেন রাজনৈতিক দলগুলোর সুবিধাবাদী চরিত্রকে। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমদ, বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর মধ্যে প্রাণবন্ত তর্ক-বিতর্ক যেমন দেখা যায়, তেমনি পাল্টাপাল্টি অবস্থান এক সময় ওয়াকআউটে গড়ায়।

সবাই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায়, তবু সংকট কোথায়?

প্রথমত, সংকটের গোড়া। বিএনপি বলছে, রাষ্ট্রপতির আদেশ দেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ রায় অনুযায়ী সরাসরি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার বৈধতা নিয়ে। ফলে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ নয়, সংবিধান সংস্কার কমিটি করার কথা বলছেন। আমরা তো জানি, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তারা শপথও নেননি।

সালাউদ্দিন আহম্মদ বলছেন—গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন দিয়ে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এটি তো কলার ভেতরে তিতা ওষুধ ঢুকিয়ে জোর করে খাওয়ানোর মতো অবস্থা। কোনো আইনকে আপনি জাতিকে এভাবে বাধ্য করে খাওয়াতে পারেন না।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশটি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন একটি প্রতারণার দলিল। রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ এই আদেশে উল্লেখ না করে এটি জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একটি জাতীয় প্রতারণা।

এদিকে জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান পদ্ধতিগত প্রতারণার অভিযোগটি খণ্ডন করেন এবং দায় চাপান বিএনপির ‘স্ববিরোধিতা’র ওপর। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং রাষ্ট্রপতি মিলে যে গণভোটের আয়োজন করেছে, তা বিএনপির দাবির কারণেই সংসদ নির্বাচনের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) অনুষ্ঠিত হয়েছে। শফিকুর রহমান স্পষ্ট করেন যে, সংস্কার কমিশনের রূপরেখা এবং গণভোটের বিষয়বস্তু আগে থেকেই সবার সামনে ছিল। সেখানে সবার প্রতিনিধিও ছিল। এখন যখন জনগণের রায় চলে এসেছে, তখন সেই প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা একধরনের রাজনৈতিক ভণ্ডামি। তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ কমিটির মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের প্রস্তাব দেন।

আরেক বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য, এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ, সংসদে দাঁড়িয়ে সোজা আঙুল তুলেছেন প্রথাগত রাজনীতিকদের (বিশেষ করে বিএনপি বা ট্রেজারি বেঞ্চের) দিকে। তাঁর মতে, রাজনীতিবিদরা ‘সুযোগসন্ধানী’। তারা সংবিধানের ঠিক ততটুকুই মানতে চান, যতটুকু তাদের স্বার্থ রক্ষা করে।

• তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি ৭২-এর সংবিধানকেই বাইবেল মানতে হয়, তবে ৫ আগস্টের পর বেগম খালেদা জিয়া কীভাবে মুক্তি পেলেন? কারণ সাংবিধানিক নিয়মে তা সম্ভব ছিল না; সেটি হয়েছিল গণঅভ্যুত্থান ও ডকট্রিন অফ নেসেসিটির (Doctrine of Necessity) কারণে।

• হাসনাতের মতে, বিপ্লবের পর যখন সংবিধান সংস্কারের কথা উঠল, তখন হঠাৎ করে আবার পুরনো সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এটি ছাত্র-জনতার রক্তের সঙ্গে প্রতারণা। তাঁর সাফ কথা—ভ্যাটিকান সিটির মতো গসপেল দিয়ে দেশ চলবে না, দেশ চলবে ৬৮% জনতার রায়ে, যারা সংস্কার চেয়েছে।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে খালেদা জিয়া কি সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলেছিলেন?

আমরা যদি সেই বক্তব্যটি দেখি, তাহলে দেখব তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছিলেন,

আওয়ামী লীগ আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ বিভিন্ন সংশোধনী এনেছে। আমরা বলতে চাই—এসব সংশোধনী আওয়ামী ইশতেহার। এটা জনগণ মানে না। তাই আগামী সরকার পরিবর্তনের পর এসব সংশোধনী ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে।

অন্যদিকে সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ তাঁর বক্তব্যে শফিকুর রহমান ও হাসনাত আব্দুল্লাহ দুজনের বক্তব্যের পাল্টা জবাবে জুলাই সনদের স্পিরিট বা মূল সুরের সঙ্গে একমত হলেও এর বাস্তবায়নের ‘উগ্র প্রক্রিয়া’ নিয়ে ঘোর আপত্তি জানান।

• পার্থর মতে, প্রতারণা হয়েছে গণভোটের ব্যালটে। সেখানে মাত্র ৪টি বিষয় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে, যা একটি টেকনিক্যাল ফাঁদ (Political Bluff)। রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে পুরো জুলাই সনদকে পাশ কাটিয়ে আংশিক বিষয়বস্তু আনা হয়েছে।

• হাসনাতের ‘সুযোগসন্ধানী’ খোঁচার জবাবে পার্থ স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত ১৭ বছর ধরে রাজপথে রক্ত দিয়েছে বিএনপি এবং অন্যান্য দল। ছাত্ররা যদি শেষ ৬ বলে ১২ রান করে থাকে, তবে এর আগের ৩০০ রান রাজনৈতিক দলগুলোই করেছে।

• পার্থর সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো সংবিধান বাতিল করার ধারণায়। তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের পর তো রেভল্যুশনারি সরকার গঠিত হয়নি, হয়েছে সাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পুরনো সংবিধানের অধীনে শপথ নিয়ে সেই সংবিধানকেই ছুড়ে ফেলা যায় না। তিনি হাসনাতদের সতর্ক করে বলেন, “জেন-জি (Gen-Z) কে রিপ্রেজেন্ট করুন, জামায়াত জেনারেশন হয়ে যেয়েন না।”

এখানেই রাজনীতির দ্বিতীয় দিকটি হাজির হয়। কেন জামায়াত ৭২-এর সংবিধান পুরোটা বাতিল করে দিতে চায়?

অনেকে বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে জামায়াতে ইসলামী যে সূক্ষ্মভাবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আর ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চেয়েছে, তারা এখন ৭২-এর পুরো সংবিধান বাতিলের মধ্য দিয়ে একাত্তর নিয়ে তাদের রাজনীতির নতুন ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চায় নতুন জেনারেশনের সামনে।

সম্ভবত এই দ্বিতীয় দিকটিতেই গিট্টু লেগেছে। যদিও ৭২-এর সংবিধান আমরা ৭৫-এ পটপরিবর্তনের পরও অনেকদূর বদলাতে দেখেছি। এই পর্যন্ত এই সংবিধান নানাভাবে কাটাছেঁড়া হয়েছে, ষোলোটার মতো সংশোধনী হয়েছে এবং সংবিধানের মূলনীতিতেও পরিবর্তন ঘটেছিল। তবু পুরো সংবিধান বাতিল করে একটা নতুন সংবিধান তৈরির প্রয়োজন আছে কি না, নাকি বিদ্যমান সংবিধানে ক্ষমতা কাঠামোর ভারসাম্য প্রশ্নসহ গণতান্ত্রিক নীতির ত্রুটি-বিচ্যুতি যেখানে রয়েছে, সেগুলো সংশোধন বা সংস্কার করাটা জরুরি, সেই প্রশ্নটাও তুলছেন রাজনীতির মানুষরা।

যেমন—রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করে যাচ্ছেন রাষ্ট্রসংস্কার প্রশ্নে, সংস্কার প্রশ্নে ভূমিকা রেখেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে, তিনি সম্প্রতি তাঁর ফেসবুক পোস্টে বলেছেন,

“জাতীয় সংসদ সংবিধান পরিবর্তন করতে পারে না, সংবিধান সংশোধন করতে পারে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না, করলে উচ্চ আদালত বাতিল করে দিতে পারে।

গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে সংস্কার। সংস্কার করতে পারে সংস্কার পরিষদ। সংস্কার করা হলে আদালত কিংবা পরবর্তী সংসদ তা বদলাতে পারে না, বদলাতে আবার জনগণের অনুমতি নিতে হয়।

অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম আরো লিখেছেন—‘সংবিধান মেনে এই আইন প্রণয়ন করতে হয়। সংবিধান পরিপন্থী আইন উচ্চ আদালত বাতিল করে দিতে পারে। …আমাদের প্রয়োজন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অনেকগুলো পরিবর্তন। যেটা সংবিধান সংশোধনের চাইতে বেশি আবার সম্পুর্ন নতুনের চেয়ে অনেক কম।’

  • 0
  • 0
  • 0
  • 0
Visited 86 times, 1 visit(s) today
↑
Close