যুদ্ধের ময়দানে কে শত্রু, কে ধ্বংস হবে, কে টিকে থাকবে—এইসব পরিচিত ঘটনা। কিন্তু ইতিহাস কখনো এত সহজে বদলে যায় না। সাম্প্রতিক ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ, সামরিক হামলা, পাল্টা হুমকি—এসবের মধ্যে সবচেয়ে জোরে কানে আসে ক্ষমতার চিৎকার। রাষ্ট্রনেতাকে টার্গেটেড হত্যার খবর, কোনো সামরিক আক্রমণ, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্পের “সভ্যতা ধ্বংস” করার হুমকি—এসব আসলে ইতিহাস না। এগুলো ক্ষমতার সাময়িক আত্মপ্রকাশ। কারণ সভ্যতা একদিনে তৈরি হয় না, আর একদিনে ধ্বংসও হয় না। পারস্য সভ্যতা সেই ধরনেরই এক দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মাণ।
সাম্রাজ্য বদলেছে, যুদ্ধ হয়েছে, পতন এসেছে; কিন্তু জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা বারবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে। সেই ধারাবাহিকতার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা এক উজ্জ্বল নাম—ওমর খৈয়াম। খৈয়াম কোনো যুদ্ধের নায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন বর্তমান ইরানের খোরাসান অঞ্চলের একজন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক; সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজসভার পণ্ডিত। তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব মূলত বিজ্ঞানের জগৎ থেকে আসে। তিনি কিউবিক ইকুয়েশন সমাধানের জন্য জ্যামিতিক পদ্ধতি তৈরি করেন এবং জালালী ক্যালেন্ডার সংস্কারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন; যেটা সৌর বর্ষ গণনায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নির্ভরযোগ্য একটি ব্যবস্থা।
কিন্তু খৈয়ামের গুরুত্ব শুধু বিজ্ঞানী হিসেবে না। তাঁর কাজ পারস্যের চিন্তার জগতে বড় পরিবর্তন আনে। কারণ তিনি দেখিয়েছিলেন—পৃথিবীকে বোঝার জন্য শুধু ধর্মীয় ব্যাখ্যাই যথেষ্ট না; গণিত, বিজ্ঞান আর যুক্তিও সত্য সন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ পথ। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এটাও বুঝেছিলেন, শুধু যুক্তি দিয়েই জীবনের সব রহস্য পুরোপুরি বোঝা যায় না।
এই টানাপোড়েন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত “রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম”-এ। যদিও এই রুবাইগুলোর উৎস পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, পশ্চিমে এগুলো জনপ্রিয় করেন এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড, যিনি আক্ষরিক অনুবাদ না করে এগুলোকে নতুনভাবে রূপান্তর করেন, যেখানে দর্শনগত গভীরতা আছে।
এই রুবাইগুলোতে খৈয়ামের সবচেয়ে গভীর দার্শনিক দ্বন্দ্ব হলো—নিশ্চয়তা বনাম অনিশ্চয়তা। যেমন একটি রুবাইয়ের ভাবার্থ দাঁড়ায়: “যে আঙুল লিখে যায়; লেখা শেষে আর ফিরে তাকায় না—এগিয়ে যায় সময়ের পথ ধরে।” অর্থাৎ সময় একবার এগিয়ে গেলে মানুষ তাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারে না। আবার অন্যত্র তিনি বলেন: “আহা! যেটুকু সময় বাঁচে তা পূর্ণভাবে উদযাপন করো; একদিন আমরাও মিলিয়ে যাবো এই ধুলোয়।” এই বক্তব্য তাঁকে সরলভাবে ধর্মীয় বা অধর্মীয় কোনো ঘরে আটকে রাখে না। বরং তিনি এমন এক অবস্থান তৈরি করেন, যেখানে মানুষ নিশ্চিতভাবে জানে না কী ঘটতে যাচ্ছে, তবুও তাকে বাঁচতে হয়। এটাই খৈয়ামের সবচেয়ে বড় দার্শনিক শক্তি। তিনি কোনো চূড়ান্ত সমাধান দেন না; বরং প্রশ্নের স্থায়িত্বকে স্বীকৃতি দেন।
আজকের পৃথিবীতে, যেখানে যুদ্ধের ভাষা আবার নিশ্চয়তার ভান করে কথা বলে, খৈয়ামের কণ্ঠস্বর ঠিক তার উল্টো দিকে দাঁড়ায়। তাঁর আরেকটি লাইনের ভাবার্থ: “জানোই তো বন্ধুরা, কী উন্মত্ত উল্লাসে আমার ঘরে বসিয়েছিলাম দ্বিতীয় প্রেমের আসর।” এখানে আনন্দের চেয়ে বেশি আছে অস্তিত্বের সংগ্রাম। “দ্বিতীয় প্রেমের আসর” আসলে জীবন ক্ষণস্থায়ী জেনেও আবার জীবনের দিকেই ফিরে যাওয়া। মানুষ জানে সব একদিন ধুলোর মধ্যে মিশে যাবে, তবুও সে প্রেম করে, হাসে, উদযাপন করে। তাই এই উল্লাস শুধু সুখ না; এটা ক্ষয়ে যাওয়া জীবনের বিরুদ্ধে মানুষের শেষ সুন্দর অবাধ্যতা।
হয়তো এখানেই খৈয়াম এখনো এত জরুরি। একদিকে তিনি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ, যিনি মহাবিশ্বকে সংখ্যা আর যুক্তি দিয়ে বুঝতে চেয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর কাব্য বলেছে জীবন অনিশ্চিত, সত্য সম্পূর্ণরূপে ধরা যায় না। এই দুই বিপরীত জগত তাঁর ভেতরে সহাবস্থানে বাস করেছে। আর ঠিক এ কারণেই তিনি আধুনিক।
কারণ আজও মানুষ একই সঙ্গে বিজ্ঞান দিয়ে পৃথিবীকে বুঝতে চায়, আবার গভীর রাতে প্রেম, মৃত্যু, শূন্যতা আর অর্থহীনতার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। খৈয়াম আমাদের শেখান—মানুষ শুধু যুক্তির প্রাণী না; মানুষ একই সঙ্গে রহস্যেরও সন্তান।
যুদ্ধ সবসময় বলে: “আমরা জানি ধ্বংস নিশ্চিত।” খৈয়াম তখন হয়তো নীরবে মুচকি হেসে প্রশ্ন করেন: “তোমরা কি সত্যিই জানো?”
