৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের একটি সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। নতুন বিধানে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা, দাদা-দাদি বা স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে কিংবা সন্তান ও নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পর, দাতা নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। সহজ কথায়, সম্পত্তি লিখে দিলেও দাতার জীবদ্দশায় তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার আইনি সুযোগ থাকছে না। আইনমন্ত্রী বলছেন, পিতা-মাতার সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই পদ্ধতিটি আনা হয়েছে এবং এটি মুসলিম আইনের অধীনস্থ হেবা ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করবে না। কিন্তু আইনটি পাসের পর থেকেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদে এই আইনকে সরাসরি শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেছেন। সূরা নিসার উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হেবা বা উইলের শর্ত হলো যাকে দেওয়া হবে, তাকে তাৎক্ষণিক মালিকানা ও ভোগদখল পেতে হবে। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার একটি হাদিসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ভোগদখল না করলে হেবা কার্যকর হয় না। আর শর্ত যদি এমন হয় যে মৃত্যুর পর মালিকানা কার্যকর হবে, তবে সেটি অসিয়ত হয়ে যায়। শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ ওয়ারিশদের অসিয়ত করা যায় না এবং মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশিও অসিয়ত করা যায় না। তার আশঙ্কা, এই আইন কোরআনের মূলনীতির পরিপন্থী এবং এটি সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরির পাশাপাশি হকদারের হক বিনষ্ট করবে। বিলটি পাস না করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা শরিয়া বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানোর দাবি জানিয়েছিলেন তিনি।
সংসদের বাইরেও আলেমরা নতুন এই বিধানের সমালোচনা করছেন। তাহরিকে খাতমে নুবুওয়্যাত বাংলাদেশের আমির ড. সাইয়্যেদ মুহাম্মদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী এই আইনকে তাগুতের কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেকের পরিচালিত গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া থেকে একটি ফতোয়া প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই আইনের মাধ্যমে মূলত ইসলামী উত্তরাধিকার আইনকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সমাজে যাদের পুত্রসন্তান নেই, তারা কন্যাসন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিয়ে নিজেরা আজীবন ভোগের যে পদ্ধতি খুঁজছেন, তা শরিয়তসম্মত নয়। কারণ এর ফলে অন্য উত্তরাধিকারীরা বঞ্চিত হন।
এই পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, জামায়াত সংস্কারের রাজনীতি আসলে কতটা গ্রহণ করতে পারবে, তা এই সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিরোধিতার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তার এই মন্তব্যের সূত্র ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন সামনে আসছে। দেশের ইসলামী দলগুলো, বিশেষত প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, কথায় কথায় সংস্কারের কথা বলে। বিভিন্ন সমাবেশে, সাক্ষাৎকারে তারা জুলাই সনদ এবং নতুন রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের আলোচনায় বেশ সরব। কিন্তু যখনই উত্তরাধিকার বা নারীর অধিকার নিশ্চিত করার মতো সামাজিক বাস্তবতার প্রশ্নগুলো সামনে আসে, তখন তারা কেন ধর্মের কথা বলে সেই সংস্কার আটকে দেওয়ার দাবি সামনে আনে? এখান থেকে কি এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, তারা শুধু ক্ষমতার সুবিধায় কাজে লাগে এমন সংস্কারই চায়?
পিতা-মাতাকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর ঘটনা সমাজে অহরহ ঘটছে। আবার পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যা ও স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়েও অনেক পরিবারে চরম উদ্বেগ থাকে। অনেকেই বলছেন, রাষ্ট্র নাগরিকদের এই বাস্তব সমস্যা সমাধানে একটি আইন প্রণয়ন করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যদি সব জায়গায় এভাবেই ধর্মীয় হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়, তাহলে কি এই বিতর্কগুলো ক্রমাগত আরও বাড়বে না, আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠবে না? সংস্কারের আলাপ কি শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু আইনি ও ধর্মীয় গণ্ডিতেই আটকে যাবে, নাকি রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের বাস্তব সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে সামনের দিকে এগোতে পারবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
