কখনো খেয়াল করেছেন, বড়লোকদের মুখের সেই ঢং করা “থ্যাংক ইউ” আর “সরি”-র আসল বাজারদর কত? এগুলো কি সত্যিই তাদের বড় মনের প্রমাণ? নাকি কর ফাঁকি আর খেটে খাওয়া মানুষের রক্ত চোষার পাপ ঢাকতে নামী ব্র্যান্ডের সবচেয়ে সস্তা পিআর মেকআপ?
বং জুন-হো তাঁর ‘প্যারাসাইট’ সিনেমায় কোনো ভিলেনকে রিভলভার হাতে দাঁড় করাননি। পার্ক পরিবার কাউকে ডেকে গালাগালি করে না, চিৎকারও করে না। বোনাসের দিন বাড়তি টাকা দেয়, বাসার কাজের বুয়াকে “আপনি তো আমাদের পরিবারের মতোই” বলে সান্ত্বনা দেয়। বাহ! শুনে তো লিবারেল ফ্রি-মার্কেটের চোখে পানি চলে আসার কথা, তাই না? আমাদের সমাজেও এই চল আছে।
কিন্তু এই পালিশ করা ভণ্ডামির গালে সফলভাবে চড় মেরে লাল করে দেন কিম পরিবারের মা।
স্বামী যখন পার্ক পরিবারের অমায়িক ব্যবহারে গলে ইশারা করে বলে, “আহা! এত বড়লোক, তাও কত মিষ্টি, কত শান্ত!”— মা তখন এক সেকেন্ডও না ভেবে মুখের ওপর সত্যটা চপেটাঘাত করেন এভাবে: “They are nice because they are rich. If I had all this, I would be nice too.”
সোজা হিসাব! ব্যাংক ব্যালেন্স ফুলেফেঁপে উঠলে অমায়িক হওয়াটা কোনো ব্যাপারই না।
বড়লোকদের এই ঢংয়ের মেকআপ এক টানে তুলে ফেললে দেখা যায়— উচ্চবিত্তের এই মিষ্টি ব্যবহার কোনো মানবিক গুণ নয়, এটা তাদের লেটেস্ট আইফোন বা ব্র্যান্ডেড ঘড়ির মতোই আরেকটা দামি স্ট্যাটাস সিম্বল। নিওলিবারেল ব্যবস্থায় কোটি কোটি টাকার পুঁজি আপনাকে দুনিয়ার সব অন্যায় দেখেও ‘কোল্ড মাস্ক’ পরে অন্ধ থাকার রাজকীয় বিলাসিতা দেয়। আপনি নিশ্চিন্তে ধোয়া তুলসীপাতা সেজে ঘুরে বেড়াতে পারেন, কারণ আপনার পেছনের ময়লা আর শোষণের রক্ত সাফ করার জন্য রাষ্ট্র আর সস্তা শ্রম আগে থেকেই রাখা আছে।
ঠিক এখানেই স্লাভয় জিজেকের (Slavoj Žižek) ‘কালচারাল ক্যাপিটালিজম’ তত্ত্বটা জোরালো আঘাত করে!
জিজেক বলছেন, আজকের দিনের ভিলেনরা আর আগের মতো চাবুক হাতে রক্তচোষা জমিদার সেজে আসে না। এরা এখন শোষণের কোটি টাকা থেকে দু-পাঁচ শতাংশ চ্যারিটিতে দেয়, সিএসআর করে। অর্গানিক গ্রিন টি খায়, ফেয়ার-ট্রেড শার্ট পরে নিজেদের পরিবেশবান্ধব সুশীল হিসেবে প্রমাণ করে। পার্ক পরিবারও ঠিক এই একই সাংস্কৃতিক ধান্দাবাজি নিখুঁতভাবে চালিয়ে যায় সিনেমায়।
এই রাজনৈতিক কমেডির বেলুনটা ফুটো হতে ‘প্যারাসাইট’-এ লাগে স্রেফ এক রাতের বৃষ্টি!
এক রাতের ভয়াবহ বন্যায় যখন নিম্নবিত্ত কিম পরিবারের আধা-বেসমেন্টের ঘর ড্রেনের নোংরা পানিতে ডুবে যায়, ঠিক তার পরদিন সকালে পার্ক পরিবারের কর্ত্রী কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ফোনে বলেন— “The rain was such a blessing. The sky is so clear today!”
আহা! কী রোমান্টিক আবহাওয়া, তাই না?
এই সামাজিক অসংগতিটা খেয়াল করেছেন? বং জুন-হো দেখিয়েছেন, শ্রেণিভিত্তিক সমাজে আবহাওয়াও নিরপেক্ষ থাকে না। সুবিধাভোগীদের জন্য যা আনন্দের বিষয়, সিস্টেমের শিকারদের জন্য তা-ই অস্তিত্বের সংকট।
এই চিত্র কি নিজের শহর আর দেশের রাজনীতিতেও চোখে পড়ে?
আমাদের এলিট শ্রেণির রাজনৈতিক অভিনয় ‘প্যারাসাইট’-এর পার্ক পরিবারকেও হার মানাবে! অফিসের সিইও সাহেব আপনাকে পিঠ চাপড়ে ‘ব্রো’ ডাকবেন, শুক্রবারে পিজ্জা পার্টি দিয়ে ‘কুল বস’ সাজবেন, আর দিনশেষে লিংকডইনে ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স’ নিয়ে আবেগী পোস্ট ঝাড়বেন।
কিন্তু ভুলেও কোনোদিন ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবি তুললেই?
সেকেন্ডের মধ্যে সেই কুল বস গায়েব হয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে তার বরফ-শীতল পাওয়ার প্লে। মুহূর্তে বুঝে যাবেন, ওই পিজ্জা আর ‘ব্রো’ ডাকাটা আসলে আপনার হাড়ভাঙা পরিশ্রম কম দামে কেনার সস্তা কৌশল ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
সিনেমায় মিস্টার পার্কের সেই সংলাপটা মনে আছে? “I cross the line sometimes, but I can’t stand people who cross the line.”
শুনতে ক্যাজুয়াল লাগে, তাই না? কিন্তু এই একটা লাইনের রাজনীতি কতটা বিষাক্ত, তা সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বোর্দিউ (Pierre Bourdieu)-এর তত্ত্বের সঙ্গে মেলালেই ধরা পড়ে। বোর্দিউ এটাকে বলছেন ‘কালচারাল ক্যাপিটাল’— শ্রেণির সেই অদৃশ্য সীমারক্ষক!
সহজ বাংলায় এই সীমার বার্তাটা কী?
বার্তা একদম পরিষ্কার— “তুমি আমার ড্রয়িংরুমের এসি সার্ভিসিং করবে, আমার কোটি টাকার গাড়ি চালাবে, কিন্তু নিজেকে আমার সমকক্ষ ভাবার ধৃষ্টতা দেখাবে না!”
আপনি থার্ড-ওয়েভ ক্যাফেতে বসে ওয়েটারকে ইংরেজি উচ্চারণে ‘থ্যাংক ইউ’ বা ‘প্লিজ’ বলে ভদ্রতার চূড়ান্ত প্রদর্শন করবেন, কিন্তু যেই মুহূর্তে কোনো রিকশাওয়ালা বা গার্মেন্টস শ্রমিক ন্যায্য মজুরির দাবিতে রাস্তায় নামবে, অমনি আপনার সুশীল মুখোশ খসে পড়বে! সেকেন্ডের মধ্যে সে হয়ে যাবে আপনার ‘উন্নয়নের পথের কাঁটা’ কিংবা ‘যানজটের অপরাধী’।
অর্থাৎ, আপনার এই বিনয় শুধুই তাদের জন্য, যারা নিজের সীমা মেনে চুপচাপ এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। এই শোষণের সংস্কৃতি কোনো একক মানুষের ভুল নয়, এটা পুরো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিখুঁত মাস্টারপ্ল্যান।
পার্ক পরিবার কোনোদিন কিম পরিবারের গায়ে হাত তোলেনি। তারা শুধু সহ্য করতে পারেনি কিমদের গায়ে লেগে থাকা সেই ‘দারিদ্র্যের গন্ধটা’— সাবওয়েতে চড়া মানুষের সেই চেনা সোঁদা গন্ধ।
ঠিক একইভাবে আমাদের শহরের সুশীলরা সিএনজি, বাসের কালো ধোঁয়া আর রিকশাওয়ালার ঘামের গন্ধ সহ্য করতে না পেরে টিন্টেড গ্লাস চড়িয়ে এসি ফুল করে দেন। আর বাড়ি ফিরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন— “এই অশিক্ষিত মানুষগুলোর জন্য পুরো শহর জ্যাম হয়ে থাকে! ফুটপাতে হাঁটা যায় না।” বাহ! সেবা নেবেন পুরোটা, কিন্তু মানুষের অস্তিত্বটুকু সহ্য করবেন না!
এই সুশীল মার্জিত ব্যবহার আর চ্যারিটির কাঁচের দেওয়ালে নিজেদের শোষক চেহারা আর কতদিন লুকিয়ে রাখবেন?
মনে রাখুন— ড্রয়িংরুমের ঝলমলে মেঝেতে যেদিন সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষুব্ধ স্রোত উপচে উঠবে, সেদিন সেই ছুরি কোনো সিনেমার ভিলেন বসাবে না— বসাবে এই তথাকথিত ‘ভদ্রতাই’। সেদিন কোটি টাকার এই “থ্যাংক ইউ” আর “সরি” কি সেই রক্তের তোড় থামাতে পারবে?
