Written by 12:07 pm জাতীয় Views: 4

সার যদি থাকেই, কৃষক পাচ্ছে না কেন?

সরকারি হিসাবে সার পর্যাপ্ত, কিন্তু আমন মৌসুমে কৃষক পাচ্ছেন না। গুদাম থেকে মাঠ পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় আটকাচ্ছে আসল সমস্যা?

বাংলাদেশে বছরে সারের চাহিদা প্রায় সত্তর লাখ মেট্রিক টন, এর মধ্যে সাড়ে ছাব্বিশ লাখ টনই ইউরিয়া। দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা এই চাহিদার ধারেকাছেও নেই, তাই প্রতি বছর আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট চাহিদার প্রায় তিরাশি শতাংশই এসেছে আমদানি থেকে। যেটুকু উৎপাদন সক্ষমতা আমাদের আছে, সেটাও ঠিকঠাক কাজে লাগানো যায় না। গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি, কাঁচামালের অভাব — এইসব কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো বছরের বড় একটা সময় বন্ধ থাকে।

এবার আমন মৌসুম শুরুর মুখে এই পুরনো দুর্বলতাগুলো একসঙ্গে সামনে চলে এসেছে। কিন্তু সরকার বলছে ঘাটতি নেই। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, দেশে এই মুহূর্তে তেরো দশমিক পঁয়ষট্টি লাখ টন সার মজুত আছে, আর আমদানির পাইপলাইনে আছে আরও দুই লাখ দশ হাজার টন টিএসপি, দুই লাখ আশি হাজার টন ডিএপি আর তিন লাখ পঁচাত্তর হাজার টন এমওপি। সার বিতরণ ও ডিলার নিয়োগ পর্যালোচনায় একটি মন্ত্রিসভা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু লালমনিরহাটে বলেছেন, বাস্তব সংকটের চেয়ে রটনা ছড়াচ্ছে বেশি।

তাহলে কি পুরোটাই গুজব? না। ব্যাপারটা হলো, জাতীয় পর্যায়ের হিসাবে হয়তো সারের অভাব নেই, কিন্তু সেই সার ঠিক কোথায় আছে, কার গুদামে আছে আর কোন দামে কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে — সমস্যাটা সেখানেই।

ধানের চারা তো আর কৃষকের সাথে দরকষাকষি করে বড় হয় না। এখন সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় চলছে, আমন মৌসুম প্রায় মাঝপথে। এই সময়ে সারের জোগান যদি পিছিয়ে যায়, সেটার প্রভাব পড়বে পরের কয়েক মাসের ফলনে। নির্দিষ্ট সময়ে সার না দিলে ফলনে টান পড়ে, মাত্র এক সপ্তাহের দেরিও অনেক সময় মাঠে টের পাওয়া যায়। ডিলারের দোকানের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও যে কৃষক সার পাচ্ছেন না, তার কাছে মজুত পর্যাপ্ত থাকার এই সরকারি কথার কি কোনো মূল্য আছে?

সরকার যে একেবারে বসে আছে, এমনও নয়। গত ৯ সেপ্টেম্বর সংসদে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানিয়েছেন, দেশের চৌষট্টি জেলাতেই এখন একটি করে সার মনিটরিং সেল কাজ করছে, প্রতিটির তদারকিতে আছেন যুগ্মসচিব ও উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা; দেশের যেকোনো জায়গা থেকে অভিযোগ এলেই সেই সেল ব্যবস্থা নেবে। তার কয়েক দিন পর কৃষি মন্ত্রণালয় একটি আলাদা সার ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুম চালু করেছে, চলবে ১১ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই শিফটে; মাঠপর্যায়ের সমস্যা দ্রুত ধরতে কাজ করবে সাতাশটি আলাদা দল।

সরবরাহের দিক থেকেও একটি স্বস্তির খবর আছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় আমদানিতে যে সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, সেটা কাটতে শুরু করেছে। চলতি মাসেই আড়াই লাখ টন অ-ইউরিয়া সার নিয়ে সাতটি বড় জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা।

কিন্তু আলাপটা এখন অন্য জায়গায়। সরকার বলছে অনিয়মকারী ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এই ঘোষণা কৃষকের হাতে সার পৌঁছে দিচ্ছে না।

তাহলে প্রশ্নটা এখন কী দাঁড়ায়? মনিটরিং সেল হচ্ছে, কন্ট্রোল রুম হচ্ছে, জাহাজও আসছে — কিন্তু এই পদক্ষেপগুলো কি ডিলারের দোকানের সামনে কৃষকের লাইনটা ছোট করতে পারবে? কেননা কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানোর সঙ্গে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার সম্পর্ক আছে। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লে চালের দামও বাড়ে, আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের রান্নাঘরে।

প্রতিটি উপজেলায় কতটুকু সার এলো, কোন ডিলার কতটুকু পেলেন, কতটুকু বিক্রি করলেন — এই হিসাবটা যদি নিয়মিত প্রকাশ্যে পাওয়া যেত, তাহলে কি ডিলারের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষকের মনে এত সহজে সন্দেহ জন্ম নিত?

কৃষক কেন রাগ করছেন, কেন দোকানের সামনে ভিড় করছেন — এই প্রশ্নের জবাব তাকে সন্দেহ করে বা দোষারোপ করে মিলবে না।

Visited 4 times, 1 visit(s) today
Close