বাংলাদেশে এখন বিদ্যুৎ নেই—কথাটা পুরো সত্য নয়। সত্য হলো, বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, সক্ষমতাও আছে; কিন্তু ঠিক সময়ে জ্বালানি নেই, ডলার সংকটে আমদানি আটকে যায়, বিল বকেয়া থাকে, আর গ্রিডে চাহিদার সময়ে বিদ্যুৎ পৌঁছায় না। সাম্প্রতিক গরমে আমরা সেটাই দেখেছি—চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদন সেই অনুপাতে বাড়েনি। কিছু সময়ে সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট উঠলেও উৎপাদন ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৭১২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ এক সন্ধ্যাতেই ঘাটতি দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এই ঘাটতি শুধু একটি সংখ্যা নয়; এই ঘাটতি মানে কারও ফ্রিজের খাবার নষ্ট হওয়া, গার্মেন্টসের সেলাই মেশিন বন্ধ হওয়া, চাষের জমিতে পানি না পাওয়া।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব বলছে, দেশে এখন প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে। BPDB-এর তথ্য অনুযায়ী, এর বড় অংশ গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র প্রায় ৪৩ শতাংশ, কয়লা প্রায় ২৭ শতাংশ, ফার্নেস অয়েল প্রায় ২০ শতাংশ। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গ্যাসভিত্তিক সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, কয়লাভিত্তিক সক্ষমতা ৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, আর ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রও বড় অংশ দখল করে আছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে হলে জ্বালানি লাগবেই। গ্যাস বা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চাপের মুখে পড়বে। ফলে চাহিদা যখন ১৭ হাজার মেগাওয়াটের কাছে ওঠে, তখন বাস্তব উৎপাদন ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসতে পারে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো, আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়েছি, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা বানাইনি। গ্যাসের ঘাটতি হলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র কম চলে। কয়লার জাহাজ দেরি করলে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র কম চলে। ডলার সংকট হলে এলএনজি, কয়লা, ফার্নেস অয়েল—সব আমদানিই চাপের মুখে পড়ে। আর এই চাপ সরাসরি গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ঘরে, গ্রামের বাজারে, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে, স্কুলের ক্লাসরুমে, ক্ষুদ্র কারখানার উৎপাদনে।
আরেকটি চাপ হলো আর্থিক দায়। বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রের জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হয়। আবার জ্বালানি আমদানির বিল, ভর্তুকি, বকেয়া পাওনা—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতের ওপর বড় ঋণের বোঝা তৈরি হয়। যখন সরকার সময়মতো টাকা দিতে পারে না, তখন জ্বালানি আমদানিতেও জট লাগে।
এর সঙ্গে আছে বিতরণ ব্যবস্থার সমস্যা। বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই কাজ শেষ নয়। বিদ্যুৎকে জাতীয় গ্রিড, সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার, তার, খুঁটি এবং বিতরণ কোম্পানির মাধ্যমে মানুষের ঘরে পৌঁছাতে হয়। অনেক লাইন পুরোনো, ট্রান্সফরমার দুর্বল, চাহিদা বেশি, রক্ষণাবেক্ষণ কম। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ থাকলেও স্থানীয়ভাবে মানুষ ঠিকমতো বিদ্যুৎ পায় না। তাই লোডশেডিং শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংকট নয়; এটি জ্বালানি, অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত সমস্যা। এই কারণেই দেশের বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু “উৎপাদন কম” বলে ব্যাখ্যা করলে পুরো সত্য বলা হয় না। আসল সমস্যা হলো, আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়েছি, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তাকে একইভাবে শক্তিশালী করতে পারিনি। ফলে কেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই; সক্ষমতা আছে, কিন্তু উৎপাদন নেই; চাহিদা আছে, কিন্তু সরবরাহ নেই। এই ফাঁকটাই মানুষের জীবনে লোডশেডিং হয়ে ফিরে আসে।
এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করা যায়। বেশ কয়েকটি পরীক্ষিত উপায়ের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি এই সংকট কমাতে পারে, তবে পরিকল্পনা ছাড়া নয়। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রধান ভরসা সৌরবিদ্যুৎ। SREDA-র সর্বশেষ ডাটাবেজ অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ প্রায় ১ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াট, জলবিদ্যুৎ ২৩০ মেগাওয়াট, বায়ুবিদ্যুৎ ৬২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ এখনও মোট ব্যবস্থার ছোট অংশ; কিন্তু সম্ভাবনা সবচেয়ে বড়।
কারণ এখানে সূর্যের আলো আমদানি করতে হয় না। কয়লার মতো জাহাজে আনতে হয় না। গ্যাসের মতো রিজার্ভ কমে যায় না। ফার্নেস অয়েলের মতো আন্তর্জাতিক বাজারের দামে কাঁপে না। একবার ভালো মানের সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, গ্রিড সংযোগ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক করলে দিনের বেলায় দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। বিশেষ করে সরকারি ভবন, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, গার্মেন্টসের ছাদ, রেলওয়ে ও অব্যবহৃত জমি—এসব জায়গা কাজে লাগালে জমি সংকট অনেকটা কমানো যায়।
কিন্তু সমস্যা হলো, শুধু সোলার প্যানেল বসালেই রাতের লোডশেডিং বন্ধ হবে না। কারণ সৌরবিদ্যুৎ দিনের বেলায় বেশি আসে। সন্ধ্যায় চাহিদা বাড়ে, সূর্য থাকে না। তাই দরকার ব্যাটারি স্টোরেজ, স্মার্ট গ্রিড, দ্রুত চালু করা যায় এমন ব্যাকআপ এবং শিল্পে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময়সূচি বদলানো। দুপুরে বেশি সৌরবিদ্যুৎ থাকলে সেচ, ঠান্ডা সংরক্ষণ, পানি পাম্প, কারখানার কিছু কাজ সেই সময় সরানো যায়। এতে সন্ধ্যার চাপ কমে।
এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে: নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও। যত বেশি বিদ্যুৎ দেশেই তৈরি হবে, তত কম বিদেশি জ্বালানি, বিদেশি মুদ্রা ও বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভর করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এখন বাস্তব লক্ষ্য হওয়া উচিত—২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৬ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করা। এর চেয়ে ভালো হবে ৮ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ, সঙ্গে ব্যাটারি এবং গ্রিড উন্নয়ন। কারণ বর্তমান ঘাটতি মাঝে মাঝে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটে ওঠে; তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে আগামী দশকের নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও বানাতে হবে।
সরকার ইতিমধ্যে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য বলছে। এই লক্ষ্য ভালো, কিন্তু লক্ষ্য ঘোষণা করলেই বিদ্যুৎ আসে না। দরকার স্বচ্ছ দরপত্র, দ্রুত জমি ও ছাদ বরাদ্দ, কম সুদের ঋণ, আমদানি শুল্ক কমানো, স্থানীয় মান নিয়ন্ত্রণ, নেট মিটারিং সহজ করা এবং সবচেয়ে বড় কথা—রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা। নবায়নযোগ্য খাতকে ফাইলের মধ্যে আটকে রাখলে লোডশেডিং কমবে না।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের শিক্ষা খুব পরিষ্কার। শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে নিরাপত্তা আসে না। নিরাপত্তা আসে কম খরচ, স্থানীয়, বহুমুখী এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি থেকে। গ্যাস থাকবে, কয়লা থাকবে, আমদানি থাকবে—কিন্তু সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখলে প্রতিবার সংকটে মানুষ অন্ধকারে পড়ে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সেই ঝুঁকি কমাতে পারে। এটি এক দিনে সব ঘাটতি পূরণ করবে না; কিন্তু সঠিক পরিকল্পনায় এটি লোডশেডিং কমাবে, আমদানি বিল কমাবে, কৃষি ও শিল্পকে স্থিতিশীল করবে, আর জলবায়ুর ক্ষতিও কমাবে।
অতএব প্রশ্নটা আর “সোলার লাগবে কি না”—এটা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কত দ্রুত, কত সৎভাবে এবং কত বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কেন্দ্রে আনতে পারব। কারণ আগামী গরমে মানুষ অজুহাত শুনবে না। মানুষ আলো চাইবে, কাজ চাইবে, পানি চাইবে, নিরাপদ বিদ্যুৎ চাইবে। আর সেই নিরাপত্তার পথে নবায়নযোগ্য শক্তি এখন আর বিকল্প নয়—এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ভবিষ্যতের অপরিহার্য ভিত্তি।
