Written by 11:35 am জাতীয় Views: 3

কন্যা শিশুদের জন্য নিরাপদ ভূমি, কে বানাবে?

রামিসার মৃত্যুর পর প্রশ্ন উঠছে—কন্যাশিশুদের জন্য এই দেশ কি আদৌ নিরাপদ? দেশি-বিদেশি পরিসংখ্যান ও বিচারহীনতার বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে এই লেখায়।

রেনেসাঁর একটি গানে আছে—“আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে, আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই।” কিন্তু আমরা কি সত্যিই সেই বাগান গড়তে পেরেছি?

রামিসার সেই মঙ্গলবার

মঙ্গলবারের সকালটা ছিল আর দশটা সাধারণ সকালের মতোই। সাত বছরের রামিসা স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ব্যাগ গুছিয়েছিল, জুতা পরেছিল, মায়ের তাড়া আর বোনের সঙ্গে নাস্তার সেই চেনা ছবি। দরজার কাছে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে একটি শিশু। কিন্তু সেই সকালটাই হয়ে উঠল গোটা বাংলাদেশের জন্য এক তীব্র বেদনার দিন। উদ্বিগ্ন মা পাশের বাড়ির দরজায় ধাক্কা দিতে থাকলেন। ভেতরে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না দরজা আটকে দাঁড়িয়ে রইল, স্বামীকে পালানোর সময় করে দিল। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে মা দেখলেন, তাঁর মেয়েটি আর নেই।

ফেসবুকজুড়ে এখন শুধু রামিসার ছবি—যেন ফুলের মতো ফুটে আছে সর্বত্র। মহীনের ঘোড়াগুলির সেই লাইন মনে পড়ে—এভাবে মেয়েরা সব একে একে ফুল হয়ে যায়। কেন আমাদের ফুলের মতো মেয়েদের এভাবে উপড়ে ফেলা যায়? রামিসার বাবা কেন জাতির বিবেকে পেরেক ঠুকে দিয়ে বলেন—“বিচার চাই না, কারণ তোমরা বিচার দিতে পারবে না”? কারণ এই দেশে বাস করা একজন বাবা অনেক আগেই জেনে গেছেন—এমনটাই হয়ে থাকে।

পৃথিবীজুড়ে একই কান্নার শব্দ

রামিসার যন্ত্রণা শুধু বাংলাদেশের একার নয়। এই কান্নার প্রতিধ্বনি সারা পৃথিবীতে। ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর, বিশ্ব কন্যাশিশু দিবসের প্রাক্কালে ইউনিসেফ প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, আজ পৃথিবীতে বেঁচে থাকা ৩৭ কোটিরও বেশি নারী ও মেয়ে—অর্থাৎ প্রতি ৮ জনে ১ জন—শিশুকালে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অনলাইন হয়রানির মতো অ-শারীরিক নিপীড়ন যোগ করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫ কোটিতে—অর্থাৎ প্রতি ৫ জনে ১ জন। আঞ্চলিক চিত্রটাও আঁতকে ওঠার মতো। ওশেনিয়ায় এই হার ৩৪ শতাংশ, সাব-সাহারান আফ্রিকায় ২২ শতাংশ, লাতিন আমেরিকায় ১৮ শতাংশ, এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়ও এই হার ১৪ শতাংশ। বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে কৈশোরে—বিশেষত ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল এই তথ্য প্রকাশের সময় বলেন, “শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা আমাদের নৈতিক বিবেকের উপর একটি কালিমা।” দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান আরও উদ্বেগজনক। Childlight-এর ‘Into the Light Index 2025’ প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি ৮ জনের ১ জন শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার। শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কন্টেন্ট (CSAM) পাওয়ার হারে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়—প্রতি ১০,০০০ জনসংখ্যায় ৬৪.১টি রিপোর্ট, যা পাকিস্তানের প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের ১১ লাখেরও বেশি ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোকে জানানো হয়।

বাংলাদেশ: সংখ্যা নয়, প্রতিটি একটি শৈশব

রামিসার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের মে মাসে বরিশালের বাবুগঞ্জে ৯ বছরের একটি কন্যাশিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা করে তার ৩০ বছর বয়সী আত্মীয়। মামলা হলো, গ্রেপ্তারও হলো—কিন্তু হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে বেরিয়ে গেল অভিযুক্ত। The Daily Star-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, পুলিশ এখনো ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পায়নি। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে মোট ৯,৯৭৭টি ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে—অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (ASK) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে ৩০৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি। এদের মধ্যে ৪৯ জনের বয়স শূন্য থেকে ছয় বছর, ৯৪ জনের বয়স সাত থেকে বারো বছর। শূন্য থেকে ছয়। যে শিশু “ধর্ষণ” শব্দের অর্থই বোঝে না, সে এই পৈশাচিকতার শিকার। বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে সারাদেশে ৭,০৬৮টি ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়েছে—যা ২০২৪ সালের ৫,৫৭০টির তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে শিউরে ওঠার তথ্যটি হলো: ২০২৫ সালে মোট ধর্ষণের শিকারদের প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল ১৮ বছরের নিচের মেয়ে। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স ২০২৫ সালের মার্চে এক বিবৃতিতে বলেন, জানুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত শুধু গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৫০টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। শুধু ১০ মার্চেই সাতটি শিশু নিহত হয় এবং ছয়টি সহিংসতার ঘটনা নিশ্চিত হয়। ‘State of Child Rights 2025’ শীর্ষক একটি গবেষণা বলছে, শিশু-সম্পর্কিত মোট নেতিবাচক সংবাদের ৬২.৬৬ শতাংশই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পাঁচ বছরের তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কমপক্ষে ১১,৭৫৮ জন নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৬,৩০৫টি ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের শিকারদের ৫৫ শতাংশেরও বেশি বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। রাস্তা, স্কুল, ঘর—কন্যাশিশুর জন্য কোথাও নিরাপদ আশ্রয় নেই।

গণমাধ্যম বলছে, বিচার বলছে না

দেশের প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো বছরের পর বছর ধরে এই সংকটের ছবি তুলে ধরেছে। যাদের মামলা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে, এবং শেষমেশ অভিযুক্তরা খালাস পেয়ে যায়। সরাসরি বলেছেন—তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, পারিবারিক চাপ এবং সামাজিক কলঙ্কের ভয় মিলে বেশিরভাগ মামলা বিচারের আলো থেকে দূরে থাকে। ২০২৫ সালের সাত মাসে ৩০৬টি মামলায় মাত্র ২৫১টিতে মামলা রুজু হয়েছে—৫৫টি ঘটনায় কোনো মামলাই হয়নি। ৫৫টি শিশু, যাদের জন্য রাষ্ট্র একটি কুটোও নাড়েনি। অপরাধের পরিণতি যখন শূন্য, তখন অপরাধীর সাহস কেবল বাড়ে। বিচারহীন প্রতিটি ঘটনা আরেকটি সোহেল রানাকে জন্ম দেয়—সে শেখে, এই সমাজে কন্যাশিশুর জীবনের কোনো মূল্য নেই। রামিসার বাবাও তা জানেন। তিনি নিজেই বলছেন—এই ঘটনা সর্বোচ্চ পনেরো দিন খবরে থাকবে, তারপর অন্য ঘটনায় চাপা পড়ে যাবে, তদন্ত ধামাচাপা দেওয়া হবে। এই নিরাশার জ্ঞানটাই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রবাহিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

অসুখটা কোথায়?

ধর্ষক কখনো শূন্যে তৈরি হয় না। একটি সামাজিক প্রেক্ষাপটে সে জন্ম নেয়, বড় হয়, ধর্ষক হয়ে ওঠে। সে যখন নারীদের উত্ত্যক্ত করে, অবমাননা করে, একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শেখে না—তখন কেউ তাকে থামায় না। এই ছোট ছোট বিচ্যুতিগুলো সে স্বাভাবিক বলে মনে করতে করতে বড় হয়। আস্তে আস্তে বড় অপরাধের সাহস আর ইচ্ছা তার মধ্যে গড়ে ওঠে। অথচ এই ধর্ষক পুরুষটি মূল অসুখ নয়—সে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা আর সামাজিক অসুস্থতার উপসর্গ মাত্র। আপনি যদি শুধু উপসর্গকে দোষ দেন, শুধু উপসর্গকে কেটে ফেলে দেন—অসুখ তো যাবে না। স্বপ্নার কথা ভাবুন—সোহেলের স্ত্রী, যে জানত ঘরের ভেতরে কী হচ্ছে, তবু দরজা বন্ধ রাখল। এটা একজন নারীর নৈতিক পতন নয়—এটা পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা এক মানুষের পরিণতি, যে শিখেছে পুরুষের অপরাধকে আড়াল করাই তার দায়িত্ব।

সমস্যাটা সমাজে

এটা কি শুধু আইনের দুর্বলতা? না। সমস্যাটা এই সমাজের রক্তে মিশে যাওয়া একটি বিশ্বাসে—কন্যাশিশুর শরীর ও জীবন পুরুষের ইচ্ছার অধীনস্থ। এই বিশ্বাস নীরবে প্রতিষ্ঠা পায় যখন যৌন অপরাধের পর প্রথম প্রশ্ন হয় “মেয়েটা কোথায় ছিল?”, যখন মামলা না করতে চাপ দেওয়া হয় “পরিবারের ইজ্জত”-এর নামে, যখন বিচার চাইতে গেলে বলা হয় “এভাবেই চলে।” বদলায় না সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা, যে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাঠায় না। বদলায় না সেই বিচারব্যবস্থা, যে অভিযুক্তকে জামিন দেয়। বদলায় না সেই সমাজ, যে কন্যাশিশুর শরীরকেই বিপদের কারণ মনে করে নিরাপত্তার দায় তার ঘাড়েই চাপায়।

রেনেসাঁর সেই গানে যে সাজানো বাগানের স্বপ্নের কথা আছে—সেই বাগান গড়তে হলে কেবল আইন বদলালে চলবে না। বদলাতে হবে সেই মানসিকতা, যে মানসিকতা একটি সাত বছরের শিশুকে নিরাপদ রাখতে পারে না তার নিজের পাড়ায়, নিজের ঘরের পাশে।

Visited 3 times, 3 visit(s) today
Close