Written by 8:55 am নগরজীবন Views: 5

যাদের শ্রমে সচল শহর, তাদের ঘরের খবর কী?

ঢাকা শহর সচল রাখেন যে ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবী মানুষ, তাদের নিজেদের বাসস্থান কেমন? পরিসংখ্যান ও নীতিমালা বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে সাশ্রয়ী আবাসনের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক।

ধরুন, আপনি বা আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম বাড়ির টেমপোরারি দুই গৃহকর্মীর কেউ আসেনি। একজনের বাড়ি হয়তো বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে। আরেকজনের হয়তো বাচ্চা টিনের চালের ঘরে গরমে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। সারাদিনের প্ল্যান কিন্তু ওলটপালট হয়ে গেল। কোনোভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে হয়তো টের পেলেন, রিকশা ধর্মঘট চলছে। এই গরমে হাঁটতে শুরু করলেন। ভাবুন তো, এই মানুষগুলো আমাদের জীবনে কত গুরুত্বপূর্ণ! অথচ, এই সস্তা শ্রমের বিপরীতে তাদের উপার্জন, সেই উপার্জন দিয়ে কেমন ঘরে তারা বাস করেন, আপনি আমি কি জানি?

যাদের শ্রমে চলমান থাকে এ শহর, হোক কোভিডের সময় বা ২০২৪ এর আন্দোলনের উত্তাল সময়ে, তাদের এ শহরে স্থান কোথায়? বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। ঢাকায় এই পরিসংখ্যান প্রায় সমান। এর মধ্যে পড়ে আমাদের গৃহকর্মী, ড্রাইভার, দারোয়ান, নির্মাণ শ্রমিক, হকার এবং আরো অনেকে। শ্রমিক হিসেবে তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা, কর্মস্থলের পরিচয়পত্র তো নেইই, নূন্যতম সম্মানজনক, নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু পর্যন্ত নেই।

১৮৯৫ সালে এইচ জি ওয়েলসের লেখা বিখ্যাত সাইন্স ফিকশন বই ‘টাইম মেশিনে’ ভবিষ্যতের সেই অদ্ভুত নগরীর কথা মনে আছে আপনাদের? সেখানে মাটির ওপরে থাকে এক জনগোষ্ঠী যারা শ্রমের সাথে সংযুক্ত নয়। দীর্ঘদিনের শ্রমহীন, আয়েসী জীবনে প্রতিটি মানুষের দেহাবয়ব হয়ে গেছে কোমল, ছোট। কিন্তু মাটির নিচে বসবাস করে এক অদ্ভুত সম্প্রদায়, মোরলক, যাদের শ্রমের কারণে পুরো শহরটা চলমান থাকে। টাইম মেশিন বইটির প্রকাশনার প্রায় ১২৪ বছর পর, ২০১৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়াতে মুক্তি পায় ‘প্যারাসাইট’ নামক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জয়ী এক চলচ্চিত্র যেখানে আমরা দেখতে পাই এক শ্রেণীবিভক্ত সমাজ যারা স্থানিকভাবেও বিভক্ত। একটি প্রান্তিক পরিবার যাদের বসবাস বেসমেন্টে, ঠিক মোরলকদের মতো। ঢাকার অব্যবহৃত জমির পরিমাণ হয়তো এখনো এ শহরের নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীদের পাতালে বা বেসমেন্টে থাকতে বাধ্য করছে না। কিন্তু এ শহরও বিভাজিত, segregated. আর এই মানুষগুলো, যাদের শ্রমের চাকা থেমে গেলে থমকে যাবে আমাদের জীবন, তাদের আমরা বড়জোর প্যারাসাইটের মতোই গণ্য করি। তাদের বসবাসের জায়গা ‘বস্তি’ যা কিনা একটা প্রচলিত গালিও।

চলুন দেখি বাস্তবিক পরিস্থিতি কি। চার বছর আগের একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে স্থপতি ইকবাল হাবিব উল্লেখ করেন, ঢাকায় প্রায় ৪৪ লাখ মানুষ বস্তিতে বসবাস করে। প্রতি বর্গফুটের জন্য তারা ৪৪ থেকে ৪৮ টাকা ভাড়া দেন। যেখানে উচ্চবিত্ত মানুষরা ২১-২৮ টাকা পার বর্গফুটে বাসা ভাড়া পায়। গুলশান বনানীতেও এই রেট ৩২ টাকার উপরে যায় না, যেখানে জনঘনত্ব মাত্র ১০০ থেকে ২০০ জন পার একর। অথচ ঠিক তার সংলগ্ন কড়াইলে প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ৬০ টাকা। অথচ জনঘনত্ব ১০০০ জন/একর। কিন্তু শুধু কি বস্তিতে থাকে এই বিপুল পরিমাণ শ্রমজীবী মানুষ? না। এ শহরের পরিকল্পিত এলাকার ভাঁজে ভাঁজে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত, অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ আবাসনেও ঠাই নিতে হয় তাদের। একপাশে হাতিরঝিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে যখন গাড়ি চালিয়ে যান, তখন আরেকপাশে দেয়ালের ওপারের টিন ও কাঠের তৈরি নড়বড়ে ভয়ংকর ঘরগুলোও নিশ্চয়ই নজরে পড়ে। ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী ঢাকার প্রায় অর্ধেক অধিবাসীর এই নিম্নমানের বাসার খরচ মেটাতে আয়ের অর্ধেক ব্যয় করতে হয়। আবাসনের বিপুল ব্যয় মেটাতে অন্যান্য খাত থেকে খরচ বাঁচাতে বাধ্য হন তারা। তারপরও ঢাকার মাত্র দুই থেকে পাঁচ শতাংশ আবাসন নিম্ন মধ্যবিত্তদের আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অথচ, সাশ্রয়ী আবাসন Sustainable development goals গুলোর মধ্যে একটি অন্যতম টার্গেট। কাগজে কলমে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক নির্বাচিত সরকারের ইলেকশন ম্যানিফেস্টো এবং ২০২২ এ গেজেটেড ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে সাশ্রয়ী আবাসনের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে দেখা গেছে। বলা হয়েছিল, নিম্নবিত্ত ও বস্তিবাসী মানুষদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবসম্মত, বহুমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে সাশ্রয়ী আবাসন সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু নির্বাচনী স্বপ্নের বুদবুদ বাস্তবায়নের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য, বাস্তব রোডম্যাপের কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

সাশ্রয়ী আবাসনের কথা বলা হয়েছে ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান ও ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান উভয় পরিকল্পনা নীতিমালায়। কিন্তু সাশ্রয়ী আবাসনের বিষয়ে বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা ২০০৪ এ কোন বাধ্যবাধকতা নেই। উপরন্তু সাশ্রয়ী আবাসন সংক্রান্ত নীতিমালাগুলো অত্যন্ত অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে, অসম্পূর্ণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য নয়। যেমন সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য ঢাকার বেশ কিছু স্থানে কিছু কাল্পনিক সাইট দেখানো হয়েছে ড্যাপে, যেন নিয়ম রক্ষার্থে। সেই এলাকাগুলোর আশেপাশে কর্মসংস্থান আছে কিনা, সুলভ পরিবহন ব্যবস্থা আছে কিনা, সেখানকার land economy সাশ্রয়ী আবাসন করার জন্য সুবিধাজনক কিনা, এসব আলাপ অনুপস্থিত। আরো কিছু বিভ্রম—যেমন ড্যাপে প্রস্তাব করা হয়েছে ব্লক ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে মোট অ্যাপার্টমেন্ট ইউনিটের ২৫ শতাংশ সাশ্রয়ী আবাসন হলে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বোনাস এফ.এ.আর প্রণোদনা পাওয়া যাবে। প্রণোদনার লোভের পরও জমির মালিকরা নিজস্ব কম্পাউন্ডের ভেতর নিম্ন আয়ের মানুষদের সাথে সহাবস্থানে রাজি নাও হতে পারেন। এছাড়াও, আয়ভিত্তিক শ্রেণীভাগ, ভর্তুকি বা অর্থায়ন ব্যবস্থা, এবং দীর্ঘমেয়াদী সাশ্রয়ী ভাড়ার কাঠামো সংক্রান্ত কোন নীতি খুঁজে পাওয়া যায় না। বাস্তবে, নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালে সাশ্রয়ী আবাসন পৌঁছানোর কোন নিশ্চয়তা দিচ্ছে না এসব নীতিমালা।

আমরা কি কিছু ভাবতে পারি? যেমন, প্রথমত, পৃথিবীর যে সব দেশে এমআরটির মতো public transport corridor আছে, সেখানে ট্রানজিট করিডোরকে ভিত্তি করে ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (TOD) করা হয় যার উল্লেখ DAP এ পাওয়া যাচ্ছে। TOD ধারণার একটা অন্যতম শর্ত হচ্ছে স্টেশন এরিয়ার পাঁচ থেকে দশ মিনিটের হাঁটার দূরত্বের মধ্যে সাশ্রয়ী আবাসন থাকতে হবে। যুক্তিটা খুব সহজ। যারা প্রাইভেট গাড়ি খরচ করতে পারে না, সেসব নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষেরা যেন সুলভ পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সবচেয়ে কাছাকাছি, হাঁটা দূরত্বের মধ্যে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাসা খুঁজে পায়। সাশ্রয়ী আবাসনের সেই কাল্পনিক সাইটগুলোকে কি আমরা TOD পরিকল্পনার সাথে সমন্বয় করে চিন্তা করতে পারি? দ্বিতীয়ত, ব্লক ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সাশ্রয়ী আবাসন সংযুক্ত করা প্রণোদনার লোভভিত্তিক না রেখে, বাধ্যতামূলক করা যায় কিনা, ভেবে দেখা দরকার।

পরিশেষে বলি, আবাসন সংকটের ধোঁয়া তুলে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে যে বিপুল কন্সট্রাকশনের যজ্ঞ আমরা দেখি, তা মাত্র ৩৩ শতাংশ। কারন, ড্যাপের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকার দুই থেকে পাঁচ তলা বাড়ির সংখ্যা ২৫ শতাংশ এবং ছয় তলার উপরে বাড়ির সংখ্যা মাত্র ৮ শতাংশ। তার মানে, আমাদের রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক এবং আপনার আমাদেরও চিন্তার পুরোটা জুড়ে শহরের উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তরা এবং তাদের ৩৩ শতাংশ দালানে আবাসন।

২০২৬ এ দাঁড়িয়ে, দৃষ্টি ও চিন্তার আড়ালে থাকা, ঐ বাকি ৬৭ শতাংশ দালানে বসবাসকারী মানুষদের নিয়ে একটু ভাবি। প্রশ্ন তুলি, যে শহরে ৮৫ শতাংশ মানুষই এ ধরনের শ্রমজীবী, তাদেরকে বাদ দিয়ে শহর নিয়ে ভাবি কিভাবে? তাদের স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সুন্দর আবাসনের বন্দোবস্ত না করে কিভাবে গোটা শহর গোছানোর কথা ভাবি? কিভাবেই বা সমতাভিত্তিক, বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখি?

Visited 5 times, 1 visit(s) today
Close