লিখেছেন: তাহমীদ চৌধুরী
চব্বিশের অভ্যুত্থান কি ডানপন্থীরা ছিনতাই করেছে?
জুলাই আন্দোলনের পর আজ প্রায় দুই বছর। এর মধ্যে উনিশ মাস অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ছিলাম, আর এখন আমরা আছি নির্বাচিত বিএনপি সরকারের পঞ্চম মাসে। দুই বছর কম সময় নয়। এই সময়ে একটা রাষ্ট্র বদলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বদলেছে কতটুকু?
আর এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবখানে — চব্বিশের অভ্যুত্থান কি আসলে ডানপন্থীরা সফল করেছিল, নাকি এই অভ্যুত্থানটাই ছিল ডানপন্থীদের? এই বয়ানটা কেন দিনদিন এত শক্তিশালী হয়ে উঠছে? এর উত্তর বুঝতে হলে আমাদের ফিরে দেখতে হবে গত চব্বিশ মাসে ঠিক কী কী ঘটেছে এই দেশে।
কাঠামো বদলায়নি, শুধু মুখ বদলেছে
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের হিসাব বলছে, নতুন সংসদের প্রায় ৭৯ শতাংশ সদস্যই কোটিপতি। যে সংসদ তৈরি হলো ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে, সেই সংসদেও ক্ষমতার আসল মালিক পুঁজি, রাজনীতি নয়। এটা কাকতালীয় কিছু নয়। এটা একটা প্যাটার্ন — খালেদা জিয়ার সংসদেও ছিল, এরশাদের সংসদেও ছিল। ফলে এ কথা বললে বাড়িয়ে বলা হয় না যে শুধু মুখ বদলেছে, কাঠামো বদলায়নি।
অথচ জুলাই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল কাঠামো বদলের — পুলিশ সংস্কার, প্রশাসন সংস্কার, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, ঔপনিবেশিক আমলের রাষ্ট্রকাঠামো থেকে বেরিয়ে আসা। এসব দাবি নিয়ে কাজ করার জন্য গঠিত হয়েছিল একাধিক সংস্কার কমিশন। প্রশ্ন হলো, সেই এগারোটা কমিশনের রিপোর্ট কোথায় গেল? কে বাস্তবায়ন করল? উত্তরটা আমরা সবাই জানি।
হেফাজতে মৃত্যু, দুর্বল কাঠামো
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব বলছে, ক্ষমতা বদলের পর এই দুই বছরে শতাধিক মানুষ মারা গেছে পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায়। সবচেয়ে অস্বস্তির জায়গাটা হলো, নির্বাচিত সরকার আসার পরও এই মৃত্যুর মিছিল পুরোপুরি থামেনি। যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগান দিয়ে, সেই সরকারের হেফাজতেও মানুষ মরছে।
মানবাধিকার কমিশন আইনের কাঠামো নিয়ে বছরের পর বছর সমালোচনা করেছিল যে বিএনপি, তারাই ক্ষমতায় এসে সেই একই দুর্বল কাঠামো বহাল রেখেছে। প্রশ্ন হলো, আপনি যদি একটা অন্যায় ব্যবস্থার সমালোচনা করেন, তাহলে ক্ষমতায় এসে সেই ব্যবস্থা বদলান না কেন? উত্তরটা অবশ্য সহজ — ব্যবস্থাটা তাদের কাছে অন্যায় ছিল না। ব্যবস্থাটা ছিল সুবিধাজনক, যতক্ষণ সেটা নিজেদের হাতে থাকে।
নারী কমিশন ও আক্রমণের ভাষা
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ৪৩৩টি প্রস্তাব সম্বলিত একটা প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। সেই সুপারিশের তীব্র বিরোধিতা করে ইসলামী দলগুলো — এবং গণতান্ত্রিক চর্চা হিসেবে বিরোধিতা করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এরপরের ঘটনাটাও আমাদের মনে আছে। মে মাসে ঢাকায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের একটি মহাসমাবেশে এক বক্তা নারী কমিশনকে আক্রমণ করতে গিয়ে অত্যন্ত অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেন, যেখানে নারীদের অধিকারের দাবিকেই কলুষিত করার চেষ্টা করা হয়।
যে আন্দোলনে নারীরা পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গুলি খেয়েছে, লাঠিচার্জ সহ্য করেছে, সেই নারীদেরই অধিকারের কথা বলার অপরাধে সবচেয়ে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে। এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই একটা বার্তা বহন করে — তোমাদের পাশে চেয়েছি আন্দোলনের স্বার্থে, কিন্তু নিজেদের অধিকারের কথা বলার অনুমতি তোমাদের দেওয়া হবে না।
মাজার হামলা থেকে পীর হত্যা
একই সময়ে আমরা দেখেছি মাজারে হামলা — শুধু বিশ্বাসের পার্থক্যের কারণে কবর থেকে তুলে লাশ পোড়ানো হয়েছে। এটা ঘটেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, যখন রাষ্ট্র ছিল দর্শকের ভূমিকায়। আর এখন নির্বাচিত সরকারের আমলে কুষ্টিয়ায় একজন পীরকে প্রকাশ্য দিবালোকে তার খানকায় পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হলো, খানকা পুড়িয়ে দেওয়া হলো। পুলিশ ঘটনাস্থলে থেকেও ঠেকাতে পারল না। দিনের পর দিন পার হয়ে গেল, গ্রেপ্তার নেই।
এটা কি একটা বিচ্ছিন্ন অপরাধ? নাকি একটা প্যাটার্ন, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র জেনেবুঝে চোখ বন্ধ রাখে, যখন হামলাকারীর পরিচয় একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘরানার দিকে ইঙ্গিত করে?
সংবাদমাধ্যমে আগুন, “দোসর” শব্দের রাজনীতি
গত বছর ১৮ ডিসেম্বর দেশের সবচেয়ে বড় দুইটা সংবাদপত্রের অফিস, প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার, আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। আটকে পড়া সাংবাদিকরা ছাদে আশ্রয় নিয়ে ফেসবুকে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিলেন। কেন এই হামলা? কারণ এই দুটো পত্রিকাকে মাসের পর মাস পরিকল্পিতভাবে “দোসর” ট্যাগ লাগানো হয়েছিল ফেসবুকে।
বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামলার আগের কয়েকদিনে হাজার হাজার পোস্ট ছড়িয়েছে, যেখানে সরাসরি অফিস পুড়িয়ে দেওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে, আর সেই পোস্টগুলোর প্রচার ও এনগেজমেন্ট ছিল স্বাভাবিক আলোচনার পোস্টের চেয়ে বহুগুণ বেশি। ফলে এই হামলা যে স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ ছিল না, বরং স্ক্রিপ্টেড ও সংগঠিত একটা আক্রমণ ছিল — আজ অনেকেই এমনটা মনে করেন। অনেকের অভিযোগ, এর নেতৃত্বে ছিল নির্দিষ্ট কিছু ফেসবুক পেজ আর প্রবাসী ইনফ্লুয়েন্সার। একই সময়ে “দোসর” ট্যাগ দিয়ে ভাঙচুর চালানো হয় ছায়ানট ভবনে, আগুন দেওয়া হয় উদীচী কার্যালয়ে।
“দোসর” শব্দটা এখানে লক্ষ করার মতো। যে কেউ প্রশ্ন তুললে, সমালোচনা করলে, ভিন্নমত পোষণ করলে, তাকেই এক শব্দে দোসর বানিয়ে দেওয়া হয় ফেসবুকে। হাজার হাজার বট আর সংগঠিত আইডি থেকে একযোগে ট্রেন্ড তৈরি হয়। এই বয়ান তৈরির কাজটা এখন একটা শিল্পে পরিণত হয়েছে — যারা এই কাজ করছে, তারা জানে জনমত কীভাবে তৈরি করতে হয়, কীভাবে একটা নির্দিষ্ট বিশ্বাস বা ভয়কে কাজে লাগিয়ে মানুষকে রাস্তায় নামানো যায়। একই সময়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের পতাকা, কালেমার পতাকার নামে মিছিলে উড়তে দেখা যাচ্ছে। যে জঙ্গিবাদ নিয়ে এতদিন কথা হতো ফিসফিস করে, সেটা এখন প্রকাশ্যে মাথা তুলছে — আর এখানেও প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্র দর্শকের চেয়ে বেশি কিছু হতে পারবে কি না।
ভাগ করো, শাসন করো: পুরনো কৌশলের নতুন রূপ
আঠারোশো সাতান্ন সালে ব্রিটিশরা এই উপমহাদেশে যে নীতি নিয়েছিল, তার নাম ছিল ডিভাইড অ্যান্ড রুল — অর্থাৎ ভাগ করো, শাসন করো। হিন্দু-মুসলিম বিভাজন উসকে দিয়ে তারা মূল প্রশ্ন থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে রেখেছিল, যেখানে প্রশ্নটা ছিল কার হাতে সম্পদ, কার হাতে ক্ষমতা।
বাংলাদেশের আজকের অলিগার্করাও একই কৌশল রপ্ত করে নিয়েছে, শুধু রূপ বদলেছে। ধর্মীয় উত্তেজনা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, কালচারাল ওয়ার — এগুলো এখন হয়ে উঠেছে মূল অস্ত্র। মজার ব্যাপার হলো, এই অস্ত্র চালানোর জন্য রাষ্ট্রের প্রশ্রয় সবসময় লাগে না, শুধু রাষ্ট্রের নীরবতা লাগে। যে পুলিশ প্রথম আলোর সামনে ট্রাফিক জ্যামের অজুহাত দেয়, যে পুলিশ কুষ্টিয়ায় ঘটনাস্থলে থেকেও হামলা ঠেকাতে পারে না — সেই নীরবতাই কি সবচেয়ে বড় প্রশ্রয় নয়?
চোখের আড়ালে যা ঘটছে
যখন আমরা ব্যস্ত থাকি পীরের হত্যাকাণ্ড নিয়ে ফেসবুকে তর্ক করতে, নারী অধিকার নিয়ে গালাগালি করতে, দোসর খুঁজে বের করতে — তখন চোখের আড়ালে কী ঘটছে? জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট আগের মতোই সক্রিয়, বৈদেশিক ঋণের বোঝা বাড়ছে, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠান আর দাতা সংস্থার হাতে।
এসব নিয়ে টকশোতে ঝড় নেই, ট্রেন্ডিং আলাপ হচ্ছে না। কারণ এসব নিয়ে আলোচনা হলে প্রশ্ন উঠবে ক্ষমতার মালিকদের দিকে, প্রশ্ন উঠবে সেই ৭৯ শতাংশ কোটিপতি সাংসদের সম্পদের উৎস নিয়ে। তার চেয়ে অনেক সহজ, অনেক নিরাপদ — মানুষকে একে অপরের সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যস্ত রাখা।
আসল প্রশ্ন কোনটা
যখন প্রতিটা ঘটনায় দেখা যায় ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথা তুলছে, নারীরা আক্রান্ত হচ্ছে, সাংবাদিকরা আক্রান্ত হচ্ছে, আর রাষ্ট্র প্রতিবার দুর্বল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে — তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে একটা ধারণা শক্ত হতে থাকে: এই অভ্যুত্থান আসলে ছিনতাই করে নিয়েছে একটা নির্দিষ্ট ডানপন্থী ঘরানা। এই বয়ান কেন শক্তিশালী হচ্ছে? কারণ প্রতিদিনের বাস্তবতা এই বয়ানকে প্রমাণ জোগাচ্ছে।
কিন্তু এখানেই ফাঁদটা লুকিয়ে আছে। যতক্ষণ আমাদের মনোযোগ আটকে থাকবে এসব বিতর্কে, ততক্ষণ আমরা প্রশ্ন করব না — কেন সংসদের ৭৯ শতাংশ কোটিপতি, কেন এগারোটা সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট ফাইলবন্দি, কেন হেফাজতে মানুষ মরে যাচ্ছে অবিরাম।
জুলাই আন্দোলন কোনো মতাদর্শের সম্পত্তি ছিল না। জুলাই আন্দোলন ছিল কাঠামো ভাঙার আন্দোলন। সেই কাঠামো আজও দাঁড়িয়ে আছে, সেই বৈষম্য আজও টিকে আছে, শেখ হাসিনার সময়ের রাজনীতিই যেন পুনরাবৃত্তি হচ্ছে — শুধু সামনে বসেছে নতুন মুখ। আর যতদিন আমরা আটকে থাকব সাম্প্রদায়িক তর্কে, ধর্মীয় বিভাজনে, দোসর খোঁজার নেশায়, ততদিন আসল প্রশ্নগুলো অন্ধকারেই থেকে যাবে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কোন প্রশ্নটা করব — কে কোন মতাদর্শের, নাকি কার পকেটে যাচ্ছে আমাদের টাকা। উত্তর আমাদের হাতেই।
