Written by 10:46 am রাজনীতি Views: 2

‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে, দেখো নাই?’— কেন লিখলেন মাহফুজ আলম

সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক পোস্ট ‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে’ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল বিতর্ক। কেন এই পোস্ট, কী বলছেন অন্যরা?

তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের একটি বক্তব্য সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনাকে আমরা ক্ষমতা থেকে হঠাতে চেয়েছি, কারণ তিনি ইনসাফ করেননি। পরবর্তী যে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে, সেটার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ইনসাফ। শত্রুর প্রতিও ইনসাফ থাকবে। শেখ হাসিনার প্রতিও আমাদের ইনসাফ থাকবে।’ এই ‘ইনসাফ’ তত্ত্ব এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে প্রচার হওয়া শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন—সব মিলিয়ে রাজনীতিতে কিছুদিন পরপর একটা আলাপ ওঠে। সম্প্রতি একটি সেমিনার ও তাতে অংশগ্রহণকারীদের কেন্দ্র করে নেটিজেনরা যখন বলছেন ‘এভাবেই ফিরে আসে আওয়ামী লীগ’, এমন প্রেক্ষাপটে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আবারও আলোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম! যদিও তিনি কেন এমন পোস্ট করেছেন—তা স্পষ্ট করেননি। কী লিখেছেন মাহফুজ আলম? কেন তিনি লিখছেন ‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে, দেখো নাই?’

মাহফুজ লিখেছেন, ‘লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে।’ কেন তিনি লিখছেন ‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে, দেখো নাই?’—এর জবাবে তিনি মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের আমল এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি লিখছেন—‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ২৪-কে ৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থীদের উত্থানের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের মজলুমগণ।’

এই মব জাস্টিস আর উগ্রবাদের উত্থান কীভাবে আওয়ামী লীগের ফেরার পথ সুগম করল, তার বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় মাহফুজের পোস্টে। তিনি লিখেছেন, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন নিয়ে মজলুমগণ চুপ ছিল। আবার আমরা দেখি, গ্লোবাল সুফি অর্গানাইজেশন বলছে—গত দুই বছরে অন্তত ৮০টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের মনে ডানপন্থার উত্থানের যে ভয় তৈরি হয়েছে, তার দায়ও তিনি চাপিয়েছেন বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপর। তাঁর মতে, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন সেকুলার মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষজন এ দেশে সরকার প্রযোজিত ডানপন্থার উত্থানে ভয় পেয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন মবস্টারদের এ দেশে হিরো বানানো হয়েছিল, উগ্রবাদীদের সেফ স্পেইস দেওয়া হইসিল।

ব্যর্থতার এই দায় থেকে তিনি ছাড় দেননি অন্তর্বর্তী সরকারকেও, যার অংশ তিনি নিজেও ছিলেন। সরকারের ভেতরে তৈরি হওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবকে দায়ী করে তিনি লিখেছেন, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ব্যবস্থা বিলোপের বদলে ন্যূনতম সংস্কার ও ঐকমত্য কমিশন নাম দিয়ে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করা হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে গেল আর বিএনপিকে ঠেকাতে জামায়াতকে কোলে নিল অন্তর্বর্তী সরকার। এমনকি যে ছাত্র ও যুবসমাজ এই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি ছিল, তাদের নৈতিক স্খলন নিয়েও তিনি সমানভাবে সরব হয়েছেন। মাহফুজ লিখেছেন, ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ছাত্ররা বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব আর মবে রূপ নিয়েছিল।’ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন মিডিয়া আর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা প্রযোজিত হলো।

একই সঙ্গে ক্ষমতার অলিন্দে ভর করা সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এবং ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ প্রথাকে আক্রমণ করে তিনি লিখেছেন, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তর্বর্তী সরকার পলিটিক্যাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হলো এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হলো—‘যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামায়াত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল’, লিখেছেন মাহফুজ আলম। মাহফুজ বলছেন—তাদের কাছে জুলাই মানে ছিল, নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা। এর বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের বদলে সংঘতন্ত্র জয়ী হওয়া, নতুন মিডিয়া অনুমোদনে কিচেন ক্যাবিনেটের একজোট হয়ে বাধা দেওয়া কিংবা জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদের প্রক্রিয়া আমলাতন্ত্র ও ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাগুলোকেও তিনি আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের জ্বালানি হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন বাম-শাহবাগী পিটাইলে আনন্দ পেয়েছিল মজলুমগণ।’

সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তা নিয়ে মাহফুজের মন্তব্য আরও কড়া। তিনি লিখেছেন, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন এ দেশে কাওয়ালি বা ইনকিলাবি কালচারের মতন রিগ্রেসিভ কালচার–ব্যবস্থা দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মোকাবেলার মহারম্ভ হয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন নির্বাচনি বাঁটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচারকে কম্প্রোমাইজ করা হলো এবং বিএনপি-জামায়াতের বার্গেইনিং টুল বানানো হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কমিশন, ট্রাইব্যুনাল, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকে একটি আদর্শের লোকদের মাধ্যমে ক্ষমতারোহণের বার্গেইনিং টুলে পরিণত করা হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা জুলাইয়ে আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তাদের বাদ দিয়ে ‘জিরো কন্ট্রিবিউশন গুপ্তদের ক্ষমতায়িত করা হলো’।

মাহফুজের এই ভাইরাল পোস্টের পর সামাজিক মাধ্যমে তুমুল বিতর্ক ও পাল্টা সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ সামনে এনেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও বর্তমান জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আবু বাকের মজুমদার লিখেছেন, ‘উপদেষ্টাদের কারও কারও অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়টাই মিস গেছে ভাই। ওইটা যদি একটু অ্যাড করতেন।’ আবার ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর অপরাধে জেল খেটে সদ্য মুক্ত হওয়া সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি মন্তব্য করেছেন, ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করসে, যেদিন ৩২ ভাঙতে গেসিলা। লীগ সেদিনই ব্যাক করসে যেদিন এনসিপির কারণে গোপালগঞ্জে ৫ খুন হয়। এই দুইটা পয়েন্ট বাদ পড়সে।’

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ। তিনি লিখেছেন, ‘যে ইন্টেরিমের সমালোচনা এখন করছেন, তখন যখন আপনি নিজেও এই সরকারের অংশ ছিলেন, আপনি পদত্যাগ করেন নাই কেন—এইটার জবাবও কিন্তু পাওনা। যখন দেখলেন ইন্টেরিম উগ্র ডানপন্থীদের পেট্রন করছে, তখন তো আটকাতে না পারার ব্যর্থতা নিয়েই সততার সাথে ইন্টেরিম থেকে সরে যেতে পারতেন। সেটা না করে আপনি আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাইছেন।’ অন্যদিকে এনপিএ-র নূমান আহমাদ চৌধুরী যখন মন্তব্য করেন যে ক্ষমতাচ্যুতদের ‘মুজিববাদী বাম’ ট্যাগ দিয়ে নিধনযোগ্য করার মাধ্যমে লীগকে ফেরানো হয়েছে, তখন তার জবাবে মাহফুজ স্পষ্ট করে বলেন, ‘মুজিববাদ বাস্তব, ভেইগ কিছু না। আর মুজিববাদী বাম মানে বাকশালী বাম, সেটাও রিয়ালিটিই। লীগ ব্যাক করলে মুজিববাদী বাম আর কট্টর ডানের মিতালিতেই ব্যাক করবে।’

মাহফুজের এই পোস্টের পর আওয়ামী লীগের ফেরা প্রসঙ্গে সাবেক আসিফ নজরুল অবশ্য কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করে লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি, তারা ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।’ আবার সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদের দীর্ঘ পোস্টের মূল্যায়ন ছিল এই যে, লীগ হয়তো ব্যক্তি বা দল হিসেবে ফেরত আসবে না, কিন্তু যে পুরোনো ফ্যাসিবাদের বন্দোবস্তকে মানুষ মরিয়া হয়ে হঠাতে চেয়েছিল, মানুষগুলোকে দাবার ঘুঁটি বানিয়ে সেই পুরোনো বন্দোবস্তই আবার ফেরত এসেছে। তিনি লিখেছেন—‘যারা লীগ ফিরিয়ে আনার দায় দিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন পরস্পরের দিকে, তারা আসলে বন্দোবস্তের সাংস্কৃতিক দিকটা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। এর গভীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভিত্তিভূমিটার দিকে তাদের কোনো মনোযোগ নাই। থাকার কথাও না। এরা বিপ্লবের অতটুকু চায়নি, চেয়েছিল ঢের বেশি কম। একটু ঠিকাদারি, একটু বদলি বাণিজ্য, একটু ভূমি অফিসের পাওনা, কিংবা পুরনো লুটেরাদের সঙ্গে ভাগবাঁটোয়ারা—এইটুকুই শুধু চেয়েছিল’, লিখেছেন ফিরোজ আহমেদ।

পোস্টটি নিয়ে বিতর্কের মুখে পরের দিন মধ্যরাতে আরেকটি পোস্টের মাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন মাহফুজ আলম। দ্বিতীয় পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘যারা আগের পোস্টকে পর্যালোচনা হিসেবে পাঠ করেছেন, তাঁদের জন্য বলছি। আমাদের এখনকার কাজ হলো—সব নিপীড়নের বিরুদ্ধে, নিপীড়িতের পক্ষে থাকা। দল-মত-ধর্মনির্বিশেষে বাংলাদেশের সব নাগরিকের মানবাধিকারের পক্ষে থাকা। হঠকারী, উগ্রবাদী এবং অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করা।’ এই ব্যাখ্যায় তিনি সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থীদের ওপর হামলার বিচারের দাবি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারকে প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

‘গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী যে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে, সেটার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ইনসাফ’—প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের এই বক্তব্য অনুযায়ী কি আসলেই ‘ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? কিংবা মাহফুজ আলম ফেসবুক পোস্টে অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পথচলার যে অমসৃণ রাস্তার বিষয়গুলো সামনে আনলেন—তা কি দেখাচ্ছে যে ‘ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?

Visited 2 times, 1 visit(s) today
Close