Written by 10:50 am বিশ্লেষণ Views: 2

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারসাম্যের রাজনীতি, বাংলাদেশ কোন পথে?

ভারত-পাকিস্তান সংঘাত, মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি এবং চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগের মাঝে দক্ষিণ এশিয়ার বদলে যাওয়া ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ আসলে কোন কৌশলে এগোচ্ছে — সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা।

২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান একটা চার দিনের যুদ্ধে জড়িয়েছিল। আপনাদের মনে আছে, ট্রাম্প তখন দাবি করলেন আমি এই সংঘাত থামিয়েছি, পাকিস্তান বলল হ্যাঁ, কিন্তু ভারত বলল না। এটা একটা বিশেষ মুহূর্ত, যখন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির পুরোনো হিসাব বদলাতে থাকার একটা নজির আমাদের সামনে হাজির হলো। পাকিস্তানকে আমেরিকা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, সেই পাকিস্তান হয়ে উঠল ট্রাম্পের নতুন বিশ্বস্ত বন্ধু। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান হোয়াইট হাউসে লাঞ্চেও গেলেন। এই এপ্রিল ২০২৬-এ ইসলামাবাদে আমেরিকা আর ইরান সরাসরি বসল — পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়। অন্যদিকে, ভারত-আমেরিকার সম্পর্কে নানামুখি শীতলতা তৈরি হচ্ছিল, আমরা দেখছিলাম। ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করল ট্রাম্পের প্রশাসন। গত সপ্তাহে ট্রাম্প বেইজিং গেলেন, এবং সেটা ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানিয়ে। ওদিকে গত বছরের আগস্টে মোদিও সাত বছর পরে চীনে গেলেন। সেটাও ভারত-আমেরিকা শীতলতার একটা ছোট নজির।

যাই হোক, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এই যে বদল ঘটছে, তাতে লাভবান হচ্ছে কে? আমরা বলতে পারি, ছোট দেশগুলো। বড় শক্তিগুলো যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, তখন স্বাভাবিকভাবেই ছোট দেশগুলোর হাতে একধরনের কূটনৈতিক জায়গা তৈরি হয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই জায়গাটা কীভাবে ব্যবহার করছে?

আপনারা জানেন, নির্বাচনের তিন দিন আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই হলো আমাদের। সেই চুক্তিতে বলা আছে, চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করা যাবে না। আবার একই সঙ্গে নির্বাচনে বিএনপির স্লোগান ছিল “দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ।” সেই ধারায় বিএনপি ক্ষমতায় এলো। তারপরের প্রথম দুই-আড়াই মাসে আমরা দেখলাম, এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি সফর করলেন, মে-তে বেইজিং গেলেন, চীনকে তিস্তায় আমন্ত্রণ জানালেন, এবং এই মে-তেই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এলেন। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে গোয়েন্দা চুক্তি হলো। এরপর, সর্বশেষ গত ১৩ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নিউইয়র্কে গেলেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে ১৯৩টা দেশের সামনে নিজের পরিকল্পনা উপস্থাপন করলেন। জুনের ২ তারিখে ভোট।

এই ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ আসলে কী বলছে? একদিকে আমেরিকার চুক্তি বলছে চীনের সঙ্গে বড় চুক্তি করা যাবে না, কিন্তু ঠিকই চীনকে তিস্তায় আমন্ত্রণ দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই না, পাকিস্তানের সঙ্গে এমন সব চুক্তি হচ্ছে, যেখানে পাকিস্তান নিশ্চিতভাবেই চীনা প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করবে। এগুলো কি স্ববিরোধ? নাকি কৌশল? নাকি সংকটে পড়া একটা দেশ, যে আমেরিকার খাঁচায় ঢুকে পড়ার পর এখন বের হওয়ার রাস্তা খুঁজছে?

দক্ষিণ এশিয়ায় একটা পুরোনো নিয়ম ছিল — ভারত বড়, বাকিরা ছোট। ভারত বলবে, বাকিরা শুনবে। কিন্তু এই নিয়ম যে আর অক্ষত নেই, তা বলাই বাহুল্য। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের একটা বইয়ের কথা আপনারা জানেন, “The India Way”। সেখানে তিনি আমেরিকা, চীন, রাশিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছেন। কিন্তু সেই বইয়ে একটা বড় অনুপস্থিতি আছে — তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিবেশীদের নিয়ে আলোচনা করেননি। যেন প্রতিবেশীরা স্বাধীন রাষ্ট্র না, ভারতের সম্প্রসারণ মাত্র। খুব সম্ভবত, এই মনোভাবের ফলাফল এখন দেখা যাচ্ছে। ২০২৩-এ ভারতে সংসদ ভবন উদ্বোধনের পরে সেখানে “অখণ্ড ভারত” মানচিত্র টানানো হয়েছিল। যেখানে দেখানো হয়েছিল বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার — এগুলো ভারতের অংশ। জয়শঙ্কর বললেন এটা ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক দাবি না। কিন্তু প্রতিবেশীরা এটাকে হুমকি হিসেবেই পড়েছে।

গত বিশ বছরে বিএসএফের গুলিতে ১,২০০-র বেশি বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। ভারত বারবার বলেছে এটা বন্ধ হবে, কিন্তু হয়নি। মালদ্বীপে এর পরিণতি সরাসরি দেখা গেছে। ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে মুইজ্জু “India Out” স্লোগানের উপর দাঁড়িয়ে জিতলেন। ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি চীনে গেলেন। ফিরে এসে তিনি ভারতকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দিলেন, ১০ মে ২০২৪-এর মধ্যে সব ভারতীয় সেনা বের করে দেওয়া হবে। ভারতের ৮৯ জন সেনা মালদ্বীপে ছিল। ভারত মানতে বাধ্য হলো। ১০ মে ২০২৪-এর মধ্যে ভারতীয় সেনারা মালদ্বীপ ছেড়ে গেল। এবং যাওয়ার আগেই মালদ্বীপ চীনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি সই করল।

নেপালেও একই চিত্র। মার্চ ২০২৬-এ বালেন শাহ এলেন, যার বয়স ৩৬, তিনি ২৭৫ আসনের মধ্যে ১৮২টা আসনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি গত ১১ মে কাঠমান্ডু যেতে চেয়েছিলেন মোদির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক দাওয়াত দিতে। প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু বালেন সময় দিলেন না। সফর বাতিল হলো। এবং এই সময় না দেওয়ার ভাষাও খুব কঠিন ছিল।

এখানে একটা সূক্ষ্ম বিষয় আছে। বালেন শুধু ভারতকে না বলেননি। আমেরিকার বিশেষ দূত সার্জিও গর্কেকেও সময় দেননি। চীনের রাষ্ট্রদূতও গ্রুপ মিটিং ছাড়া সময় পাননি। বালেনের অবস্থান পরিষ্কার — পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের কেউ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদা বৈঠকে বসতে পারবেন না, এটা কূটনৈতিক প্রোটোকল। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টা শুধু প্রোটোকল না।

ঠিক ওই সময়ে ভারত আর চীন যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিল, কৈলাস মানসরোবর তীর্থযাত্রা এবার লিপুলেখ দিয়ে হবে। লিপুলেখ ভারত-নেপালের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ, নেপাল দাবি করে এটা তাদের ভূমি। নেপালকে জিজ্ঞাসাই করা হলো না — নেপাল এর প্রতিবাদ জানাল। The Diplomat গত বছরের ডিসেম্বরে লিখেছে, দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো এখন আর ভারতের দিকে ঝুঁকছে না, বরং আমেরিকা, চীন, ভারত — এদের সবার মাঝে ভারসাম্য খুঁজছে। এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা না, পুরো অঞ্চল জুড়েই একটা কাঠামোগত বদল ঘটছে। ভারতের “পরিচয়ভিত্তিক বাগাড়ম্বর” আর “নিরাপত্তাকেন্দ্রিক কূটনীতি” — এই দুটো কারণেই প্রতিবেশীদের আস্থা হারাচ্ছে ভারত। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ৬২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্ভাবনা আছে। কিন্তু প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাড়তে থাকা এই অবিশ্বাসের কারণে ভারত তার অর্ধেকও কাজে লাগাতে পারছে না।

যাই হোক, আমাদের মূল প্রশ্নে আসি — দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির এই বদলের মধ্যে বাংলাদেশ আসলে কীভাবে নিজেকে নির্মাণ করছে? পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নানামুখি দৌড়ঝাঁপ স্পষ্ট, কিন্তু এই দৌড়ঝাঁপের গন্তব্য আসলে কী, সেটা আমরা স্পষ্ট হতে পারছি না।

বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আমাদের আলাপ করার দরকার নেই। এই চুক্তিতে কী আছে, তা আমরা জানি। এবং আমরা এটাও জানি, নির্বাচনের আগে ১৬ জানুয়ারি তারেক রহমান সরাসরি আমেরিকান বাণিজ্য-প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন, যেখানে নিশ্চিতভাবেই এই চুক্তিতে বিএনপির সম্মতির কথা জানিয়েছিলেন। ফলে, মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির মধ্য দিয়ে আমরা আমেরিকার খাঁচায় প্রবেশ করেছি — এটা সার্বিক সত্য। এটা মিলছে। কিন্তু যেটা মিলছে না, সেই বাণিজ্যচুক্তির পরেও আমরা দেখছি, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে এবং ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেটা আবার বলে, আমেরিকার খাঁচার মধ্যে থেকেও বাংলাদেশের একটা কোট-আনকোট স্বাধীন ফরেন পলিসি আছে। সেটা কী? সেখানে কি পাকিস্তানই প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় — যার সঙ্গে চীন ও আমেরিকা উভয়েরই সম্পর্ক আছে, ফলে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে কেন্দ্রে রেখে তার কূটনীতি সাজাচ্ছে, যাতে আমেরিকা ও চীন উভয়ের জন্যই win-win হয়? নাকি বাংলাদেশ বাস্তবেই একটা স্বাধীন ভারসাম্য খুঁজছে, ফলেই এই দৌড়ঝাঁপ? নাকি বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হওয়ার চেষ্টাটাকেই সবার আগে রাখছে, সেজন্য নানান জায়গা থেকে সমর্থন সংগ্রহ করছে?

মে ৫-৭, খলিলুর রহমান বেইজিং গেলেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে তার বৈঠক হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা দেখলাম, চীনের পলিটিক্যাল ব্যুরোর স্থায়ী কমিটির সদস্যের সঙ্গেও তিনি আলাদা বৈঠক করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সফরে এই ধরনের বৈঠক সাধারণত হয় না। চীন সেই বৈঠকে একটা কথা জোর দিয়ে বলল, বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকে আমরা সমর্থন করি, তৃতীয় কোনো পক্ষ এই সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারবে না। কে এই তৃতীয় পক্ষ? নাম না বললেও আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না। চীন বলছে, আমেরিকার চুক্তি তোমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু আমরা তোমার পাশে আছি।

অন্যদিকে তিস্তার প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। ভারত ১৫ বছর ধরে তিস্তা প্রসঙ্গটা ঝুলিয়ে রেখেছে। এই সফরে চীনকে তিস্তা ব্যবস্থাপনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এটা শুধু পানির প্রশ্নই না। ভারতকে সরাসরি বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশ — তুমি যা দিতে পারোনি, অন্যজন তা দিতে রাজি। তিস্তার পানি শেষমেশ কে ম্যানেজ করবে সেটা এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু বাংলাদেশ যে এই কার্ডটা খেলেছে, সেটা পরিষ্কার। প্রশ্ন হলো, এই কার্ড খেলার সঙ্গে আমেরিকার সঙ্গে সই করা চুক্তির বিরোধ কতটুকু? কিন্তু এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটা আমেরিকা কীভাবে দেখবে, সেটা এখনো পরিষ্কার না।

পাকিস্তানের ঘটনাটাও গুরুত্বপূর্ণ। মে ৮-৯ তারিখে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি ঢাকায় এলেন। আনুষ্ঠানিক কারণ ক্রিকেট, নাকভি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডেরও চেয়ারম্যান। কিন্তু বিমানবন্দরে তাকে রিসিভ করলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব। কূটনৈতিক প্রোটোকলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে পররাষ্ট্রসচিব রিসিভ করেন না। ফলে এটা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃত সংকেত যে এই সফর খেলাধুলার চেয়ে অনেক বড়। যাই হোক, বৈঠকে হলো গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, পুলিশ একাডেমি বিনিময়, এবং Safe City Project-এ পাকিস্তানের সহযোগিতার প্রস্তাব। Safe City মানে নজরদারি প্রযুক্তি — সিসিটিভি, মুখ শনাক্তকরণ, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো, পাকিস্তানের নিজের Safe City প্রকল্প চলে চীনা প্রযুক্তিতে। লাহোর, করাচির Safe City — পুরোটাই চীনা অবকাঠামোতে তৈরি। ফলে আমেরিকার চুক্তি চীনের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে বিধিনিষেধ দিয়েছে, কিন্তু পাকিস্তানের কথা সেখানে নেই। ফলে পাকিস্তানের হাত দিয়ে চীনা প্রযুক্তি বাংলাদেশে এলে সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির লঙ্ঘন না, একপ্রকার চুক্তির ফাঁক। এটা কি বাংলাদেশের সচেতন কৌশল? নাকি কাকতালীয়? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ না। কিন্তু বিষয়টা আকর্ষণীয় — আমেরিকার চুক্তিকে সামনে রেখে, তার ফাঁক দিয়ে, চীনের সঙ্গে সংযোগ তৈরির পথ খোলা রাখা হচ্ছে। আবার একই সঙ্গে প্রশ্ন করা যায়, এই পুরো দৌড়ঝাঁপ কি বাংলাদেশের নিজের পরিকল্পনা, নাকি ওয়াশিংটন নিজেই জেনেশুনে করাচিকে ঢাকায় পাঠিয়েছে — কারণ পাকিস্তানের মাধ্যমে সীমিত চীনা সংযোগ আমেরিকা অ্যালাউ করবে?

গত মে ১৩ তারিখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিউইয়র্কে গেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে ১৯৩টা দেশের সামনে নিজের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন। জুন ২ তারিখে ভোট। বাংলাদেশ এই পদে শেষবার ছিল ১৯৮৬-৮৭-এ। চার দশক পরে আবার চাইছে। এই পদে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মতো ভেটো নেই, কাউকে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু সভাপতি আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করেন, কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই পদে থাকলে আপনি তত্ত্বগতভাবে কোনো একটা দেশের না, ১৯৩টা দেশের। খলিলুর রহমান যোগ্য প্রার্থী, আমরা বলতে পারি — জাতিসংঘে তার ৩০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এই মুহূর্তে তিনি, বা বাংলাদেশ, কেন এই পদটাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে?

খুব সম্ভবত, এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের অনেকগুলো না-বোঝা অঞ্চল বুঝতে সাহায্য করবে। একে তো, আমেরিকার চুক্তি বাংলাদেশকে দ্বিপাক্ষিকভাবে আটকেছে। চীনের সঙ্গে সরাসরি বড় চুক্তি নিষিদ্ধ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল। এই চাপের ভেতরে জাতিসংঘের সভাপতি পদটা সম্ভবত বাংলাদেশের জন্য বিশেষ আশ্রয়। এই পদে থাকলে কোনো দেশের পক্ষ না নিয়েও আন্তর্জাতিক মঞ্চে সক্রিয় থাকা যায়। আমেরিকার খাঁচার ভেতরে থেকেও “সবার সভাপতি” পরিচয়ে কথা বলা যায়। কার্যত, এই পদে ভোট বা সমর্থনের রাজনীতিটা যেহেতু প্রকাশ্যে না, লবিতে, ফোনে, চুপচাপ হয় — হয়তো খলিলুর রহমান সেই চেষ্টাটাই করছেন।

তবে বাংলাদেশ যে নানামুখি কার্ড খুলতে চাইছে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। হয়তো এটা বাংলাদেশের সচেতন কৌশল। বাংলাদেশ সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে, কাউকে পুরোটা না দিয়ে। ছোট দেশের জন্য এটা কার্যকর কৌশলও হতে পারে। অথবা হয়তো বাংলাদেশ যে কূটনৈতিক জালে ইতিমধ্যে আটকা পড়েছে, সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে — আমেরিকার চুক্তির ফাঁক দিয়ে হলেও চীনের সঙ্গে একটা সংযোগ, আবার জাতিসংঘের মঞ্চ দিয়ে দ্বিপাক্ষিক চাপের বাইরে যাওয়া। অথবা হয়তো এগুলো কোনো গভীর পরিকল্পনা না, সংকটে পড়া একটা দেশ নিছক টিকে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে। সবদিকে দৌড়ানো মানে আসলে কোনো দিকেই না দাঁড়ানো। নতুন নির্বাচিত সরকারের আমলে বাংলাদেশের কূটনীতি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে, সেটা বোঝার জন্যই আজকের এই আলোচনা। হয়তো শিগগিরই আমরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।

Visited 2 times, 1 visit(s) today
Close