আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে একটি পুরোনো প্রবাদ আছে— ‘এখানে কেউ স্থায়ী বন্ধু নয়, স্থায়ী শত্রুও নয়, কেবল স্বার্থটাই স্থায়ী।’ বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সম্পর্কের দিকে তাকালে এই কথাটির চেয়ে সত্য আর কিছুই হতে পারে না। সব সরকারের আমলেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কমবেশি উত্থান-পতন ছিল। আওয়ামী আমলে আমরা সেই সম্পর্ককে সোনালি অধ্যায় বলতে দেখেছি। সর্বশেষ সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখেছি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। সেই টানাপোড়েনে ছিল কূটনৈতিক গাম্ভীর্য আর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। কিন্তু নতুন সরকারের আমলে ভারতের সাথে যেন বরফ গলতে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের পাইপলাইন খুলে দিয়ে আসছে বন্ধুত্বের নতুন বার্তা। প্রশ্ন হলো, হঠাৎ এমন কী ঘটল যে দিল্লিকে ১৮০ ডিগ্রি ‘ইউ-টার্ন’ নিতে হলো? একটু খুঁজে দেখার চেষ্টা করি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে তখন থেকেই বলা যায় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে এক ধরনের বরফযুগ শুরু হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময় ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল তলানিতে। এই ১৮ মাস মোদী-ইউনূস বা ডোভাল-খলিল পর্যায়ের বৈঠকগুলো ছিল অনেকটা কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের মতো। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সাথে আনুষ্ঠানিক দেখা-সাক্ষাৎ পর্যন্ত এড়িয়ে চলেছেন। এমনকি গত বিজয় দিবসের সময় দুই দেশের হাই কমিশনারকে পাল্টাপাল্টি তলব করার ঘটনাও ঘটে। তখনও ভারতের ভাষা ছিল বেশ কঠোর।
গত বিজয় দিবসের আগে ‘জুলাই ঐক্য’ নামে একটি সংগঠন ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে ‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাই কমিশন’ নামে একটি বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল দূতাবাসের সামনে গিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করা। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরে তা আটকে দেয়। কিন্তু সেসময় ভারত বলেছিল, ঢাকায় কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী যেভাবে ভারতীয় দূতাবাসকে ঘিরে নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করেছে সেটাই রাষ্ট্রদূতকে তলব করার প্রধান কারণ। পাশাপাশি বাংলাদেশের কোনো কোনো রাজনীতিবিদ যেভাবে প্রকাশ্যে ভারত-বিরোধী মন্তব্য করেছেন, সেই ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানোও ছিল এই সমন পাঠানোর আরেকটি বড় কারণ। বাংলাদেশও ভারতের বিষয়ে বেশ অনমনীয় অবস্থানে ছিল। কারণ জুলাইয়ের পর দুই দেশের মধ্যে মূল দেয়াল হয়ে দাঁড়ান শেখ হাসিনা। তাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া এবং সেখান থেকে তার বিভিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে ঢাকার ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
যদিও ভারত এখন বুঝতে পারছে, হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ঢাকার সাথে সম্পর্ক বৈরী রাখা তাদের জন্য আত্মঘাতী হচ্ছে। কিন্তু তারা কি হাসিনাকে ফেরত দেবে? কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনাকে এখনই ঢাকার হাতে তুলে দেবে না। কারণ এতে তাদের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। তবে ভারত হাসিনাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে আর কোনো অস্বস্তিতেও ফেলবে না। অর্থাৎ, ভারত এখন শেখ হাসিনাকে একটি ‘পলিটিক্যাল লায়াবিলিটি’ বা রাজনৈতিক বোঝা হিসেবেই দেখছে। ফলে পর্দার আড়ালে শেখ হাসিনার সাথে ভারতের নীতিনির্ধারকদের দূরত্ব যে ক্রমশ বাড়ছে, তা স্পষ্ট। ভারত এখন ব্যক্তি হাসিনার চেয়ে রাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক মেরামতে বেশি আগ্রহী।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, হঠাৎ কেন সম্পর্ক সহজ করতে চায় ভারত? উত্তর হতে পারে— দিল্লির এই নমনীয় হওয়ার পেছনে কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি জড়িত। ভারতের এখন অনেকটা ‘পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার’ দশা।
এর প্রধান কারণগুলো হলো:
নেপাল ও চীনের প্রভাব: নেপালের নতুন প্রজন্ম ও বর্তমান সরকার ভারতের আগের মতো খবরদারি মানতে নারাজ। তারা ক্রমেই চীনের দিকে ঝুঁকছে।
পাকিস্তানের সাথে ঢাকার নৈকট্য: দীর্ঘদিনের তিক্ততা কাটিয়ে পাকিস্তান এখন বাংলাদেশের সাথে সরাসরি সমুদ্রপথে বাণিজ্য শুরু করেছে। ভিসা সহজীকরণের মতো পদক্ষেপ নিয়ে তারা ঢাকার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে।
সেভেন সিস্টার্স বা উত্তর-পূর্ব ভারত: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনীতি অনেকটাই বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ধস নামলে বা অস্থিরতা তৈরি হলে তার আঁচ সরাসরি ওই রাজ্যগুলোতে পড়বে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত যদি এখন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লি একা হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই কৌশলগত কারণেই ভারতকে এখন নমনীয় হতে হচ্ছে।
আমরা দেখেছি, বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোক ও শ্রদ্ধা জানাতে অনির্ধারিত সফরে ঢাকায় এসেছিলেন এস. জয়শঙ্কর। সাথে এনেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তাও। অনেকে বলছেন, ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু দিল্লির নীতিনির্ধারণী মহলে নতুন করে নাড়া দেয়। নরেন্দ্র মোদীর পাঠানো বিশেষ শোকবার্তা কেবল একটি সৌজন্য ছিল না, এটি ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সাথে দীর্ঘদিনের দূরত্ব ঘুঁচিয়ে ফেলার একটি ‘ডিপ্লোম্যাটিক গেটওয়ে’। এর পরপরই বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ যখন জ্বালানি সংকটের শঙ্কায়, ঠিক তখন ভারত পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহের আশ্বাস দেয়। মজার ব্যাপার হলো, এই জ্বালানি তেলের পাইপলাইন চুক্তিটি ২০২২ সালে শেখ হাসিনাই করেছিলেন। এখন সেই পুরোনো চুক্তির আওতাতেই ভারত নতুন সরকারের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর মাধ্যমে ভারত প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা বাংলাদেশের বিপদের সময়ের বন্ধু।
এই প্রেক্ষাপটে ৭ এপ্রিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পর এটি ছিল একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সফর। অনেকেই এই সফরকে সম্পর্ক পুনরায় শুরু করার ‘রিসেট বাটন’ হিসেবে দেখছেন। সফর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, ভারত সফর ‘ফলপ্রসূ’ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক যদি পজিটিভ দিকে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে আমরা কিছুটা ভালো প্রোগ্রেস করতে পারব। ওই দিক থেকে এটি ফলপ্রসূ সফর। ওখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে আমাদের মিটিং হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সাথে কথাবার্তা হয়েছে। দুটি মিটিংই ইতিবাচক।’ ১৩ এপ্রিল সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ শেষে হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
