আরব বিশ্বের মুসলমানদের জন্য দুই ঈদের মধ্যে কোরবানির ঈদ বেশি আনন্দের। কিন্তু বাংলাদেশে কোরবানির ঈদের চেয়ে রোজার ঈদ বড়। রোজার ঈদের আয়োজন বেশি, আড়ম্বর বেশি। এর পেছনের কারণটা ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক।
বাংলাদেশের কোরবানির ইতিহাসকে তিনটা অধ্যায়ে ভাগ করা যায়।
১. ১৬০০-১৯৪৭
২. ১৯৪৭-৯০
৩. ১৯৯০-বর্তমান
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মোটামুটি ১৬০০ সাল থেকে ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। ইসলাম গ্রহণের আরও ৩০০ বছর পর তারা ইসলাম চর্চা করতে শুরু করে। ফরায়েজী আন্দোলনের আগে দেশে ইসলাম ধর্মের প্র্যাকটিস ছিল না। কোরবানি দেওয়ারও প্র্যাকটিস ছিল না। অন্য আরেক কারণ হলো—নতুন ধর্মান্তরিত মুসলমানরা প্রায় সকলেই ছিলেন নিপীড়িত হিন্দু শূদ্র। তাদের কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। সংখ্যালঘু পাঠান, মোগল, কাশ্মীরি, আফগানি, তুর্কি বংশোদ্ভূত না হলে কোরবানি দেওয়ার ব্যাপারটা আর্থিকভাবে ছিল কল্পনাতীত।
আরেক বড় কারণ হলো জমিদারি প্রথা। প্রায় ৮৫% জমিদার ছিলেন হিন্দু। বাদবাকি ১৫% জমিদারি মুসলমানদের হলেও সেগুলোর আয়তন ছিল নগণ্য। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার আগ পর্যন্ত এ দেশের মানুষ প্রকৃত অর্থে কোরবানির ঈদ পালন করেনি। ১৬০০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত—এই সাড়ে তিনশো বছর ছিল পূর্ববঙ্গে কোরবানির ঈদের ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়।
২০০০-পরবর্তী বাংলাদেশের আসন্ন সময়গুলোতে (ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স অনুযায়ী) জনগণের কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য বাড়ার কথা ছিল। ঈদুল আজহাই আস্তে আস্তে প্রধান ঈদ হয়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু এখন ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাংলাদেশে বাড়ছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে (গিনি সূচকে ০.৮৪)।
ফলে কোরবানির ঈদ আবারও বড় শহরকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। শহরে কোরবানি দেওয়ার হার যে হারে বাড়ছে, সেভাবে গ্রামে এই হার বাড়ছে না।
পিপিপি হিসাবে সমগ্র এশিয়া মহাদেশে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম সবচেয়ে বেশি।
ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের হিসাবে, ২০২২ সালে মাংস বঞ্চিত থাকায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বুরুন্ডি। সেকেন্ড প্লেস পেয়েছে কঙ্গো আর থার্ড প্লেস বাংলাদেশ। ঢাকা ট্রিবিউনের হিসাবে, বাংলাদেশের মানুষ গড়ে দৈনিক ১১ গ্রাম মাংস খান। গড় মানে হলো, যেখানে আমার মতো সুবিধাভোগী রাজধানীবাসী সুন্নি মুসলমান পুরুষ মানুষ দৈনিক ৬০ গ্রাম মাংস পাই, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ফরিদা খাতুন হয়তো গত ২ মাসেও একবার মাংস খেতে পারেননি।
তাই কোরবানির ঈদ এই দেশের মানুষের জন্য আশীর্বাদ। বাংলাদেশের মানুষ প্রতি বছর মাথাপিছু ৪ কেজি মাংস খায়। যার মধ্যে ২ কেজি শুধু কোরবানির মৌসুমেই খায়। কোরবানির ঈদ না থাকলে দেশের বৃহত্তর জনসংখ্যা কখনো গরুর মাংস চোখেও দেখতে পারত না।
১৯৯০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে মাথাপিছু কোরবানির মাংস ভোগের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। মধ্যবিত্তের জনসংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু ২০১৮-১৯ সাল থেকে সরকারের অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় (বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভর করে পদ্মা সেতু করা), কর্ণফুলী টানেলসহ নানা অপ্রয়োজনীয় খরচ করা, ও ব্যাংক লুট করা, ব্যাপক দুর্নীতি করার সরাসরি ফলাফল অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়েছে; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল কোভিড মহামারি। ফলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মধ্যবিত্ত কমতে শুরু করে। লক্ষ লক্ষ মানুষ মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত হয়। নিম্নবিত্তরা হয় হতদরিদ্র।
ভারত সরকারের গরু রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং এসব অর্থনৈতিক কারণগুলো ১৯৯০ সালের পর প্রথমবার কোরবানির সংখ্যা কমিয়ে দেয়। দেশে মাংস ভক্ষণের ধারাবাহিক উন্নয়নে ভাটা পড়ে। এই ভাটা পড়ার জন্য মোদি সরকারের চেয়ে হাসিনা সরকারের দায় বেশি। ২০১৪ সালে যখন মোদি সরকার গরু রপ্তানি বন্ধ করে, তখন মাংস কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ২০১৮-১৯ সালের মুদ্রাস্ফীতির পর মাংস এক লাফে ১০০ টাকা বেড়েছিল। তিন বছরের ব্যবধানে মাংসের দাম ২৫০ টাকা বেড়ে যায়। ফলে বাংলাদেশে কোরবানি ঈদের ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায় শেষ হয়।
২০২২-২৩ সালে দেশীয় ব্যাংকগুলোর অবস্থা সর্বোচ্চ খারাপে পৌঁছায়। ভয়াবহ ইনফ্লেশনে জনগণের নাভিশ্বাস উঠে। কোনো ডকুমেন্টে সত্যিকারের মুদ্রাস্ফীতির অঙ্কটা না আসলেও এটা ছিল অন্তত ৪০%। অন্য সকল খাদ্যপণ্যের তুলনায় মাংস সর্বোচ্চ পর্যায়ের লাক্সারি গুডসে পরিণত হয়।
বাংলাদেশে কোরবানির ঈদের সংস্কৃতিতে এটা একটা প্রতিষ্ঠিত প্রথা যে মাংস তিন ভাগ হবে। লোকে সালাফি হোক, সুফি হোক বা মডারেট অশিক্ষিত মুসলমানই হোক—সকলেই মাংস তিন ভাগ করত। এক ভাগ দিত গরিবদের। এক ভাগ আত্মীয়দের। আরেক ভাগ নিজেদের।
এই ভাগ করার দুদিন পর আবার সাধারণত মানুষের মনে পড়ে—আরে! অমুককে, তমুককে মাংস দেওয়া হয়নি। তখন আবার নিজেদের ভাগ থেকেই আত্মীয়দের একটা অতিরিক্ত অংশ দেওয়া হতো। মোটা দাগে এই ছিল সারা বাংলাদেশে কোরবানির সংস্কৃতি।
কিন্তু ২০২২ সালে একজন হুজুর জানালেন, এই তিন ভাগ করার রীতির কোনো দালিলিক ভিত্তি নেই। কেউ করতে চাইলে করুক। তবে সওয়াবের উদ্দেশ্যে করলে এটি হবে বিদআত।
মাংসের কাঙাল বাঙালি মুসলমান এই ফতোয়াটা লুফে নিল। সারা বাংলাদেশেই বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর পর্বে লোকে বারবার হুজুরদের এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে থাকল। বেচারা হুজুররাও সত্যটা বলতে বাধ্য যে আসলেই তিন ভাগের কোনো ভিত্তি নেই। ফলত বাঙালি মুসলমানের জন্য নামেমাত্র মাংস দান করার টোকেন বাদে সত্যিকারের মাংস দানের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকল না।
ডিপ ফ্রিজ কেনার হার বাড়ল। কিছু কিছু পরিবারের জন্য কোরবানির ঈদ হয়ে উঠল অল্প দামে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিজেদের জন্য সারা বছরের মাংস সিন্ডিকেট করার স্ট্র্যাটেজি।
এখন মাংসের বাজারমূল্য অনেক বেশি। কোনো আত্মীয় বা ফকিরকে ১ কেজি মাংস দেওয়ার আগে কারও কারও মাথায় আসে—১ কেজি মাংস দিচ্ছি মানে ৮৫০ টাকা দিয়ে দিচ্ছি। এই মাংসটা ডিপ ফ্রিজে থাকলে সামনের ৬ মাস মাংস কেনা লাগবে না। দাওয়াতে-টাওয়াতে বের করে খাওয়ানো যাবে, সংসারের খরচ কিছুটা লাঘব হবে। ইত্যাকার চিন্তায় পূর্ববঙ্গের কোরবানির ঈদের ইতিহাসের চলমান চতুর্থ অধ্যায় মেরুকরণে বিভক্ত।
বাঙালি মুসলমানের খাসলত, সামাজিক মেরুকরণ, বৈষম্য, স্যাঁতস্যাঁতে বৃষ্টি, অস্বাস্থ্যকর ঘরোয়া এন্তেজামে গরু কাটা, কোরবানির ঈদকে একটা আনন্দের দিন হিসেবে উদযাপন না করে প্রতিটা বাড়িতে সকাল থেকে বাপ-চাচাদের মেজাজ আসমানে উঠে থাকা, বাপ-চাচাদের ধমকে বাড়ির মা-চাচীদের সারাক্ষণ ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকা এবং কসাইদের মাংস কাটার অদক্ষতা মিলিয়ে এই দেশে পালিত হয় বাংলাদেশের ইউনিক নিজস্ব ঈদুল আজহা।
