১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর ভারত রাষ্ট্রের সামনে ক্ষমতা হস্তান্তরের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সংকট ছিল ‘ভারত’ নামের ধারণাটিকেই টিকিয়ে রাখা। কারণ, ইউরোপের অনেক জাতিরাষ্ট্র যেখানে এক ভাষা, এক জাতিসত্তা বা এক ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, সেখানে ভারত ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা; শত শত ভাষা, অসংখ্য জাতিগত পরিচয়, গভীর বর্ণব্যবস্থা, ধর্মীয় বিভাজন এবং সদ্য ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দেশভাগের রক্তাক্ত স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভঙ্গুর ভূখণ্ড। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি জওহরলাল নেহেরুর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল এমন এক ‘আইডিয়া অব ইন্ডিয়া’ নির্মাণ করা, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে সাংবিধানিক নাগরিকত্ব বড় হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড় হবে, আর আবেগতাড়িত ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বদলে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক মানসিকতা ও আধুনিকতার ভিত্তিতে।
নেহেরু বুঝতেন, ভারতকে যদি কেবল হিন্দু সভ্যতার রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তাহলে এই রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে ভেঙে পড়বে। তাই তিনি একদিকে যেমন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র গড়তে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে সংসদীয় গণতন্ত্র, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রকে ভারতের ঐক্যের প্রধান ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ, নেহেরুর ভারত মূলত ছিল একটি রাজনৈতিক কল্পনা; যেখানে হাজারো বিভক্ত পরিচয়কে একটি সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। আর সেই প্রকল্পের প্রধান রাজনৈতিক বাহন ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু ইতিহাসের উপহাস হলো— যে কংগ্রেস একসময় ভারতের বহুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান ধারক ছিল, আজ সেই দলই ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটে। স্বাধীনতার পর কয়েক দশক ধরে কংগ্রেস শুধু একটি রাজনৈতিক দলই ছিল না; বরং সেটিই ছিল ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র, জাতীয়তাবাদের ভাষা, এমনকি বহু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সমার্থক। কিন্তু সময়ের সাথে ভারতের রাজনীতি বদলেছে। আঞ্চলিক জাতিগত রাজনীতি, বর্ণভিত্তিক সংহতিকরণ, অর্থনৈতিক উদারীকরণ, মিডিয়া-নির্ভর জনতুষ্টিবাদ এবং সর্বোপরি হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের উত্থান নেহেরুবাদী রাজনৈতিক কাঠামোকেই গভীরভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে।
আজকের ভারত আর নেহেরুর কল্পিত বহুত্ববাদী ভারত নয়; ভারত ক্রমশ রূপ নিচ্ছে এক উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে রাষ্ট্রীয় শক্তি, সামরিক আগ্রাসী ভাষা, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এবং মিডিয়া spectacle মিলেমিশে নতুন ধরনের রাজনৈতিক আবেগ তৈরি করছে। অন্যদিকে, স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা শক্তিশালী প্রাদেশিক দলগুলোও কংগ্রেসের পুরোনো এক ছাদের তলে থাকা রাজনীতিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। ফলে একদিকে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী কেন্দ্রীয় জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে অঞ্চলভিত্তিক শক্তিশালী রাজনীতির মাঝে পড়ে কংগ্রেস যেন নিজের ঐতিহাসিক ভূমিকা, রাজনৈতিক ভাষা এবং সাংগঠনিক ভিত্তি— সবই হারিয়ে ফেলছে।
দিল্লি থেকে কলকাতা, তামিলনাড়ু অথবা জম্মু-কাশ্মীর; হারিয়ে গেল কেন ঐতিহ্যবাহী দল কংগ্রেস? যে দলকে একসময় নেতৃত্ব দিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী; সেই দলের বর্তমান নেতৃত্ব ক্ষমতাসীন বিজেপির সাথে ন্যূনতম রাজনৈতিক লড়াইয়েও যেতে পারছে না। প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো, আর কংগ্রেস কীভাবে রাজনীতিতে কোণঠাসা হলো যে বিগত তিনটি লোকসভা নির্বাচনে শক্ত বিরোধী দলও হতে পারল না?
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হলো। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া দল বিজেপি প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়তে যাচ্ছে। উল্টোদিকে জাতীয় পর্যায়ে বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের প্রাপ্তি মাত্র দুটি আসনে জয়। সর্বশেষ ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে শাসনক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। তারপর থেকেই পতনের শুরু। ৩৪ বছরের বাম শাসন, আর এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে একসময়ের কংগ্রেস নেত্রী মমতার হাত ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান কংগ্রেসকে আর দাঁড়াতেই দেয়নি। এরপর তৃণমূলের টানা ১৫ বছরের শাসন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সমর্থন পেয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ ভোটারের। যদিও ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ৪২টি আসন। সেবার অবশ্য তৃণমূলের সাথে জোট করেছিল কংগ্রেস।
বিশ্লেষক শিখা মুখার্জীর মতে, “জাতীয় কংগ্রেস এখন পশ্চিমবঙ্গে এক অদৃশ্য রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাদের অস্তিত্ব কেবল টিভির টকশোতে সীমাবদ্ধ।” গত ১৫ বছরে যে দলটির আসনসংখ্যা ৪২ থেকে ২-এ নেমে এসেছে, সেই দলকে নিয়ে এমন মন্তব্য হয়তো যে কেউই করবে। কিন্তু কংগ্রেসের এই হাল কেন? প্রায় পাঁচ যুগ রাজ্যে ক্ষমতায় না থাকা ও গত প্রায় ১৩ বছর কেন্দ্রীয় ক্ষমতায়ও বিজেপির কাছে পর্যুদস্ত হওয়া কংগ্রেসকে বেশিরভাগ ভোটারই এখন বিকল্প হিসেবে দেখছেন না, ফলে কংগ্রেসের প্রতি মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, রাজ্যে কংগ্রেসের জনসমর্থন না থাকায় তৃণমূল তাদের জোটে রাখেনি, ফলে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস আরও একা হয়েছে। সিপিএমের সাথে জোট হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। কেননা সিপিএমের অবস্থা কংগ্রেসের চেয়েও করুণ।
এতটুকু গেল কেবল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। কিন্তু অন্যান্য রাজ্যে কি কংগ্রেস খুব ভালো অবস্থানে আছে বা রাজনৈতিক লড়াই করার অবস্থানে আছে? সর্বশেষ কেরালা বিধানসভা নির্বাচনে জয় পেয়েছে কংগ্রেস। এর বাইরে মাত্র তিনটি রাজ্যে ক্ষমতায় আছে দলটি। অর্থাৎ অন্যান্য রাজ্যেও অবস্থান খুব একটা ভালো নয়। কিন্তু কেন? সবচেয়ে বড় কারণ আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থান। বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় ইস্যু, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। যেমন তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (ডিএমকে) ও অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (এআইএডিএমকে), পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস, মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি), উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি), বিহারের আরজেডি ও জেডিইউ, পাঞ্জাবের শিরোমণি আকালি দল এবং অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি)। সাম্প্রতিক সময়ের বড় উদাহরণ হিসেবে বলা যায় থালাপতি বিজয়ের টিভিকের কথাও। একদিকে কেন্দ্রে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি মোকাবিলা করা, একই সাথে স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের পুরোনো অবস্থান টিকিয়ে রাখতে গিয়ে দুই দিকেই বিপদে পড়েছে কংগ্রেস। তবে এটা বলা যায়, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রসারের পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক জাতিগত রাজনীতিরও ব্যাপক প্রসার হয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো, বিজেপি ভারতের সীমান্তের ওপারে পাকিস্তান, চীন বা বাংলাদেশ নিয়ে যে আগ্রাসী ‘জাতীয়তাবাদী’ রাজনীতি হাজির করে, ভারতের বড় অংশের মানুষ কি সেই রাজনীতিই গিলছে? ভারতের ভোটারদের বড় অংশ এখন নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘মাসকুলার’ বা পেশিবহুল রাষ্ট্রনীতি পছন্দ করছে। বিজেপি যখন ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’র বয়ান হাজির করে, কংগ্রেসের ধ্রুপদী অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি সেখানে খেই হারিয়ে ফেলছে। জনমানসে এক ধরনের ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে কংগ্রেসের ‘নরম’ পররাষ্ট্রনীতি ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না। ফলে অসাম্প্রদায়িকতার যে বয়ান কংগ্রেস শত বছর ধরে বহন করে এসেছে, তা বর্তমানের ‘হাইপার-ন্যাশনালিজম’-এর তোড়ে খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে।
বিজেপি অত্যন্ত সুকৌশলে পাকিস্তান বা চীনের ভয় দেখিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফায়দা লুটছে। এমনকি বাংলাদেশের তিস্তা ইস্যু বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়েও তারা এমন এক বয়ান তৈরি করেছে, যেখানে ‘ভারত প্রথম’ নীতিটি উগ্রভাবে সামনে আসছে। কংগ্রেস এখানে কোনো বিকল্প টেকসই বয়ান হাজির করতে পারছে না। বিজেপি যখন প্রতি ৬০ জন ভোটারের জন্য একজন ‘পন্না প্রমুখ’ নিয়োগ করে তাদের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে, কংগ্রেস তখনও গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারের ওপর ভর করে টিকে থাকতে চাইছে। রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রা বা ‘মহব্বত কি দোকান’ স্লোগান কিছুটা রোমান্টিক আবহ তৈরি করলেও, তা শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তিতে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে। কংগ্রেসের বয়ান বর্তমান ভারতের তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার সাথে সংগতিপূর্ণ হতে পারছে না। ভারতের নতুন ভোটাররা কর্মসংস্থান ও ডিজিটাল সংযোগের যে স্বপ্ন দেখে, কংগ্রেসের পুরোনো ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র স্লোগান তাদের কাছে প্রায়শই সেকেলে মনে হয়। তারা পাকিস্তান বা চীন ইস্যুতে বিজেপির সেই ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’কেই নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
কংগ্রেস এখন বিজেপিবিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের রাজনীতি করছে। গত লোকসভা নির্বাচনে ইন্ডিয়া জোট কিছুটা চাপেও ফেলেছিল বিজেপিকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতার পরাজয় কি এবার ইন্ডিয়া জোটকেই চাপে ফেলল? নাকি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় এবার ইন্ডিয়া জোটকে আরও একাট্টা করবে? সেটাই এখন দেখার বিষয়।
