Written by 10:54 am আন্তর্জাতিক Views: 2

ইরান যুদ্ধ: নেতানিয়াহুর ফাঁদে পড়ে ত্রিমুখী চাপে ট্রাম্প

ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে ত্রিমুখী চাপে পড়েছেন ট্রাম্প। রণক্ষেত্রে ব্যর্থতা, নিজ দেশে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সরে যাওয়া — সব মিলিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জে মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ভূ-রাজনীতির নিষ্ঠুর দাবার চাল আর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বড় এক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন ইরানের ড্রোন আর মিসাইলের আঘাতে মার্কিন দম্ভ চূর্ণ, ঠিক তখন খোদ আমেরিকার ওয়াশিংটন থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত জ্বলছে জনরোষের আগুন। যে যুদ্ধের জয় নেই, যে যুদ্ধের শেষ নেই, সেই যুদ্ধে ট্রাম্পের একগুঁয়েমি তার নিজের সিংহাসনকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে।

ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে — না পারছেন ফেলতে, না পারছেন গিলতে। নেতানিয়াহুর কূটচালে পড়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর ফল হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে আমেরিকা ও ট্রাম্প প্রশাসন। হারের ভয়ে আবোলতাবোল কথা বলে বিভ্রান্তিও ছড়াচ্ছেন তিনি। কিন্তু এই সত্য এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে ইরান যুদ্ধে দখলদার আমেরিকা ও ইসরায়েলের মিলিত শক্তির জয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই; যা আছে তা কেবল ক্ষয় আর ধ্বংস। এই যখন অবস্থা, ঠিক তখনই খোদ আমেরিকার জনগণের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। ইরানে হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের শহরে শহরে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে ফেটে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

একে তো ইরানের পাল্টা হামলার তোড়ে খাবি খেতে হয়েছে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে, তার ওপর নিজ দেশেও পড়লেন তীব্র বিক্ষোভের মুখে। ইরানে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে আমেরিকার রাজপথগুলো হয়ে উঠেছিল লোকে লোকারণ্য। নিউ ইয়র্ক, শিকাগো এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের রাস্তায় আছড়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষের মিছিল। স্লোগান উঠছে — ‘নো কিং, নো ওয়ার’।

আমেরিকানদের এই ‘নো কিং’ আন্দোলন মূলত ট্রাম্পের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ। সাম্প্রতিককালে এত বড় সরকারবিরোধী জনসমাগম আমেরিকায় দেখা যায়নি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এপি এবং সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত রাজপথ যুদ্ধবিরোধী স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য — গণতন্ত্রে রাজার মতো একতরফা যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্লেষকরা বলেছেন, আমেরিকানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া এই ‘নো কিং’ আন্দোলন এখন ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স এবং ইপসোসের সাম্প্রতিক জনমত জরিপ বলছে, আমেরিকার প্রায় ৬০ শতাংশ জনগণ ইরান যুদ্ধের সরাসরি বিরুদ্ধে। সাধারণ মার্কিনিরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া মানেই মার্কিন অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া। সামরিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক জার্নালগুলোতে দাবি করা হচ্ছে যে, ইরানের অত্যাধুনিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেখানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের জয়লাভের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফলে মাঠ পর্যায়ের পরাজয় ঢাকতে ট্রাম্প প্রশাসন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেও সাধারণ মানুষ তা আর বিশ্বাস করছে না।

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এই যুদ্ধ ট্রাম্পকে ত্রিমুখী চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রথমত, ‘নো কিং’ আন্দোলনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার যে অভিযোগ উঠছে, তা ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। ফলে নিজ দেশেই তীব্র রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পড়েছেন তিনি। আর ইরান যেভাবে কৌশলগত ড্রোন ও মিসাইল হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে টার্গেট করেছে, তাতে আমেরিকার পরাশক্তির তকমায় পড়ছে দাগ। আল-জাজিরা এবং দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় যে চাপ তৈরি করেছে তা হলো ইউরোপীয় মিত্ররা ক্রমেই এই যুদ্ধে ট্রাম্পের পাশ থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে এই গণআন্দোলন এবং যুদ্ধের ব্যর্থতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের জন্য বড় পরাজয় ডেকে আনতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মার্কিন কংগ্রেস ও সিনেটেও ট্রাম্পের একচ্ছত্র ক্ষমতার পথ বন্ধ করে দিতে পারে। নিজ দেশে জনগণের ঘৃণা, রণক্ষেত্রে ইরানের শক্ত প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বন্ধুহীন হয়ে পড়া — সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধই কি তবে শেষ করছে আমেরিকার ট্রাম্প যুগ?

Visited 2 times, 1 visit(s) today
Close