উত্তর আমেরিকার সময় ৭ এপ্রিল রাত আটটার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দেওয়া হলে ইরানে এক প্রলয়ংকরী হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেন, “একটি সভ্যতার পুরোটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। এটি আর কখনো ফিরে আসবে না। আমি চাই না এমনটা হোক, কিন্তু কে জানে — সম্ভবত তাই হতে যাচ্ছে।”
ট্রাম্পের এই ঘোষণা কোনো সাধারণ ভাষায় ছিল না; প্রতিটি লাইনে ছিল চরম ঔদ্ধত্য ও অশোভন শব্দের ব্যবহার। বিবিসির নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদদাতা ফ্রাঙ্ক গার্ডনার তার এক বিশ্লেষণে বলেন, ইরান থেকে পুরো সভ্যতা মুছে দেওয়ার হুমকির চেয়েও বেশি হতবাক করার বিষয় হলো ট্রাম্পের ‘অ-রাষ্ট্রপতিসুলভ’ ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা।
কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস হলো, যাদের প্রতি ট্রাম্প এই কটু শব্দ ছুড়েছিলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের সঙ্গেই তাকে সমঝোতার টেবিলে বসতে হয়েছে। তাও আবার প্রতিপক্ষের বেঁধে দেওয়া শর্তের বেড়াজালে আটকে মেনে নিতে হয়েছে যুদ্ধবিরতি। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই হুংকার আদতে একটি বিশাল ‘ব্লাফ’ বা ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছুই নয়। এই হুমকি তাকে সেইসব খলনায়কদের কাতারেই দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, যারা মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক সভ্যতাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ইরান নীতি বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পার্সি মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে আসা ছাড়া ট্রাম্পের হাতে কোনো ‘ভালো বিকল্প’ ছিল না। আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ট্রাম্প মূলত এই চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে তা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকেই ধসিয়ে দিত। পার্সির মতে, ট্রাম্প বড় বড় বুলি আওড়ালেও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিভারসাম্য তিনি জানতেন। যদি ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হতো, তবে ইরানও পাল্টা আঘাত হানত জিসিসি বা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর। এতে বিশ্ব এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়ত, যা বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে কয়েক গুণ ভয়াবহ হতো। ট্রাম্প দিনের শুরুতে হুমকি দিয়েছিলেন কেবল একটি গুমোট আবহ তৈরি করতে, যাতে সন্ধ্যায় চুক্তিতে পৌঁছানোর পর প্রমাণ করতে পারেন যে এই যুদ্ধবিরতি তার নিজের শর্তেই হয়েছে।
বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। মার্চের শেষদিকে পাকিস্তানের মাধ্যমে ১৫ দফার এক শান্তি পরিকল্পনা পাঠিয়েছিলেন ট্রাম্প, যা ইরান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। উল্টো তারা হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সেই হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বই ট্রাম্পের গলার স্বর নরম করতে বাধ্য করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ট্রাম্প দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিত করতে রাজি হয়েছিলেন। এই যুদ্ধবিরতির পরিধি কেবল তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং লেবাননসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এটি কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে এখনকার ‘মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন’ হলো — ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাব কি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে? শুক্রবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনার টেবিলে ইরান যে দাবিগুলো রেখেছে, তার অনেকগুলোই ওয়াশিংটনের জন্য হজম করা কঠিন। ইরান তার সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব প্রটোকল ও আধিপত্য নিশ্চিত করতে চায়। পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব যুদ্ধকালীন ঘাঁটি ও সেনা সরিয়ে নেওয়ার দাবি আছে ইরানের। হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতিদের ওপর হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে বলেও জানিয়েছে তারা। এ ছাড়া সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়ার দাবিও রয়েছে। বিগত বছরের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং এই চুক্তিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করারও দাবি জানিয়েছে ইরান।
ইরান যে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে, তা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত কোনো সামরিক সংঘাতের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ক্ষতিপূরণ’ দেওয়ার রেওয়াজ রাখে না। জাপানের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারা পুনর্গঠনে সহায়তা দিলেও তা সরাসরি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ছিল না। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে ১৯৭৩ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তিতে ৩.২৫ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন সাহায্যের প্রতিশ্রুতি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র তা কখনোই দেয়নি। ইরাক ও আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে দেশ দখলের পর ‘দেশ গড়া’র নামে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করলেও তা সরাসরি ভুক্তভোগী রাষ্ট্রকে দেওয়া ক্ষতিপূরণ ছিল না; বলা যায়, তা ছিল মার্কিন কৌশলগত বিনিয়োগ। ফলে ইরানের এই ক্ষতিপূরণ আদায়ের শর্তটি শেষ পর্যন্ত কতটুকু বাস্তবায়নযোগ্য, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
তবুও, হরমুজ প্রণালির চাবিকাঠি যেহেতু ইরানের হাতে, তাই ট্রাম্পের মতো উদ্ধত নেতাকেও শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে নতিস্বীকার করতে হচ্ছে। এটিই বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা।
