Written by • 10:36 am• আন্তর্জাতিক, পড়ুন • Views: 0

জাতিসংঘের ব্যর্থতা: ভেটো ও অর্থের জালে বন্দি বিশ্বসংস্থা?

ভেটো ক্ষমতা ও পরাশক্তির অর্থের ওপর নির্ভরতায় জাতিসংঘ কেন আস্থা হারাচ্ছে, এবং ছোট দেশগুলোর জন্য সংস্থাটির সংস্কারের পথ কী, তা নিয়ে বিশ্লেষণ।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ছিল—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’। একটু থামুন! ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি।

জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যখন দাঁত বের করে হেসে হেসে ইরান ও ফিলিস্তিনে বোমা-গুলি আর মানুষ হত্যার পক্ষে বৈধতা তৈরি করছিলেন, হয়তো তখনই আমেরিকার উদ্ধত অস্ত্রের আঘাতে আহত কোনো ইরানির দম ফুরিয়েছে; অথবা ইসরাইলের বোমার আঘাতে নিষ্প্রাণ হয়েছে কোনো ফিলিস্তিনি শিশু। বুঝুন! মঞ্চটা জাতিসংঘের, যে সংস্থার জন্ম হয়েছে বিশ্বশান্তি রক্ষায়। অথচ কোনো অপরাধবোধ ছাড়াই সেই মঞ্চে রীতিমতো হুমকির ফুলঝুরি ছুটিয়েছে পরাশক্তি ও তাদের তাবেদাররা। অথচ জাতিসংঘ নিশ্চুপ! তার কোনো কার্যকর প্রতিক্রিয়া নেই!

জাতিসংঘের প্রধান আয়োজনের প্রতিপাদ্য যখন হয় ‘আস্থা পুনরুদ্ধার’ বা ‘সবার জন্য কার্যকর হওয়া’, তখন বুঝতে হয় সংগঠনটি সদস্যদের আস্থা হারিয়েছে, একই সঙ্গে হারিয়েছে সার্বজনীন কার্যকারিতাও। ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—কেন আস্থা হারাল, অপ্রাসঙ্গিক হলো জাতিসংঘ?

জাতিসংঘকে বুঝতে হলে ফিরতে হবে কিছুটা পেছনে। ১৯১৯ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার প্রেক্ষাপটে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জন্ম নেয় লীগ অব নেশনস। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে পারেনি সংস্থাটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর ব্যর্থ ‘লীগ অব নেশনস’-এর বিকল্প তৈরির তাগিদ দেখা দেয়। পরে ১৯৪১ সালের আটলান্টিক সনদ, ১৯৪২ সালের জাতিসংঘ ঘোষণা এবং ডাম্বারটন ওকস সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল সান ফ্রান্সিসকোয় ৫০ দেশ নতুন সংস্থা গড়তে বসে। সে বছরেরই ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে জাতিসংঘ নামের এই বিশ্বসংস্থা। সংস্থাটির মূল লক্ষ্য ছিল ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা’।

কিন্তু ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা’র অঙ্গীকারে জন্ম নেওয়া সংস্থার মূল কাঠামোতেই নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও পরাশক্তি খ্যাত আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স ঢুকিয়ে দেয় ‘ভেটো ক্ষমতা’ নামক এক মরণফাঁদ! ১৯৪৫ সালে ইয়াল্টা ও সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনে এই ‘বিগ ফাইভ’ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—ভেটো ক্ষমতা না দিলে তারা জাতিসংঘেই যোগ দেবে না। আর তখন থেকেই বিশ্বশান্তির নামে পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ সুরক্ষার আইনি লাইসেন্স হয়ে ওঠে এই ভেটো ক্ষমতা। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ১৪ জন ‘হ্যাঁ’ বললেও একজনের ‘না’-তে প্রস্তাব খতম!

এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত কেন মানবে দুনিয়ার স্বাধীন দেশগুলো? জাতিসংঘ সনদের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—আন্তর্জাতিক আইনের বিধান শুধু ছোট ও দুর্বল দেশগুলোর জন্যই বাধ্যতামূলক, পরাশক্তিদের জন্য তা কেবল কাগজের টুকরো। কী! বিশ্বাস হচ্ছে না? চলুন উদাহরণ দেখাই। ২০০৩ সালে জাতিসংঘের কোনো অনুমোদন ছাড়া, কোনো আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করেই আমেরিকা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আক্রমণ চালায় ইরাকে; ২০২২ সালে রাশিয়া আগ্রাসন চালায় ইউক্রেনে। অথচ জাতিসংঘের ভূমিকা আটকে থাকে কেবলই বিবৃতিতে।

আর পরাশক্তিগুলোর ভেটোর বহর তো আঁতকে ওঠার মতো! ১৯৮৬ সালে নিকারাগুয়া মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ে মার্কিন হামলাকে বেআইনি বলা হলেও আমেরিকা তা অগ্রাহ্য করে ভেটো দেয়। এমনকি গাজায় ইসরায়েলের বর্বর গণহত্যা বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদে আনা একাধিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আমেরিকা একাই ভেটো দিয়ে বাতিল করে দিয়েছে। রাশিয়ার ভেটোর কারণে নিরাপত্তা পরিষদ ইউক্রেনের জন্য কিছুই করতে পারেনি। আর জাতিসংঘের সর্বশেষ ব্যর্থতার প্রকাশ—ইরানে আমেরিকা-ইসরাইলের ভয়াল আগ্রাসন। ফলে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে আক্ষেপ করে বলতে হয়েছে—‘শীর্ষ পরাশক্তিগুলো যখন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, তখন অন্য দেশগুলোও ভাবে—তারা কেন আইন মানবে?’

জাতিসংঘের কার্যক্রম ও কর্মপন্থা বুঝতে সংস্থাটির অর্থনৈতিক কাঠামো বোঝা জরুরি। এই কাঠামো মূলত নির্ভরশীল সদস্য রাষ্ট্রের মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত বাধ্যতামূলক চাঁদা এবং স্বেচ্ছাসেবী অনুদানের ওপর। সংস্থাটির সাধারণ প্রশাসনিক বাজেট ও শান্তিরক্ষা মিশন পরিচালনার জন্য সদস্য দেশগুলোকে নির্ধারিত হারে বাধ্যতামূলক চাঁদা দিতে হয়। এখানে একক দেশ হিসেবে আমেরিকা সাধারণ বাজেটের সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ এবং শান্তিরক্ষা বাজেটের প্রায় ২৭ শতাংশ বহন করে। সূত্র বলছে, সংস্থার নিয়মিত বাজেটের ৪২ শতাংশই সরবরাহ করে আমেরিকা ও চীন।

হিসাবটা খুবই সরল—পুঁজি যার, আসলে ক্ষমতাও তারই। একটা প্রবাদ আছে—‘যে বাঁশি বাজায়, সুর তার নির্দেশেই ওঠে’। যেহেতু জাতিসংঘের আর্থিক কলকাঠি পরাশক্তিগুলোর হাতে বন্দি, সেহেতু চাইলেও অনেক কিছু করতে পারে না সংস্থাটি। ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—পরাশক্তির টাকায় চলা আর ভেটো ক্ষমতার জালে বন্দি জাতিসংঘের পক্ষে কি ছোট ও দুর্বল দেশগুলোর রক্ষাকবচ হওয়া সম্ভব? এর সরল উত্তর—না। ইতোমধ্যেই আমেরিকাসহ প্রধান দেশগুলো নিয়মিত বকেয়া পরিশোধ না করায় জাতিসংঘ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নগদ অর্থসংকটে ভুগছে। আর এই আর্থিক ব্ল্যাকমেইলের কারণে ২০২৬ সালের নিয়মিত বাজেট প্রায় ১৫ শতাংশ কমিয়েছে সংস্থাটি, বাতিল হয়েছে প্রায় ২,৯০০টি পদ। এর কুফল ভুগছে কোটি কোটি অসহায় মানুষ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে ৩১৮ মিলিয়ন মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে থাকলেও চরম অর্থভাবের কারণে তারা মাত্র এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১১০ মিলিয়ন মানুষকে খাদ্যসহায়তা দিতে পারছে। এমনকি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জরুরি ত্রাণেও তৈরি হয়েছে ১৪৭ মিলিয়ন ডলারের বিশাল ঘাটতি।

এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—যে যুদ্ধ ও আগ্রাসন থামাতে জাতিসংঘের জন্ম, তার ফল কি পেয়েছে বিশ্ব? যুদ্ধ কি কমেছে? পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (PRIO) ও ইউসিডিপি (UCDP)-র তথ্যমতে, রাষ্ট্র-জড়িত সংঘাতের সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডা গণহত্যায় ৮ লাখ মানুষ এবং ১৯৯৫ সালে সেব্রেনিৎসায় ৮ হাজার মুসলিম হত্যার সময় কিছুই করতে পারেনি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা। আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফগানিস্তান আক্রমণ, ইরাক আক্রমণ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা ফিলিস্তিনে চলমান গণহত্যা—কোনো অন্যায় আগ্রাসনই থামাতে পারেনি এই সংস্থা। যখনই কোনো পরাশক্তি বা তাদের মিত্ররা কোনো দেশে বেআইনি হামলা চালায়, তখনই নিরাপত্তা পরিষদে ঝুলে পড়ে ভেটোর খড়্গ। মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে ওয়াশিংটন ভেটো দেয়, আর রাশিয়ার স্বার্থে টান পড়লে মস্কো।

তবে জাতিসংঘের সবটাই অন্ধকার নয়। মুদ্রার অপর পিঠে জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থা (WFP), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ (UNICEF) এবং ৭০টিরও বেশি সফল শান্তিরক্ষা মিশন বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর আগ্রাসী রাজনীতির সামনে জাতিসংঘের এসব সামাজিক ও মানবিক সাফল্য ঢাকা পড়ে গেছে।

তাই আবারও প্রশ্ন—খুব করে চাইলেও কি পরাশক্তিদের ভেটো ক্ষমতা ও অর্থসাহায্য উপেক্ষা করে কার্যকর হতে পারবে জাতিসংঘ? বাস্তবতা হচ্ছে, বর্তমান জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী পরাশক্তিগুলোর সম্মতি ছাড়া ভেটো ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা বা সংস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনা একপ্রকার অসম্ভব। জাতিসংঘ সনদের ১০৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সনদ সংশোধন করতে গেলেও সেই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সম্মতি লাগবে! আর জাতিসংঘের অর্থের উৎস তো জানিয়েই দিলাম। ফলে জাতিসংঘ পরাশক্তিগুলোর ইচ্ছা ছাড়া কার্যত একটি ‘নখদন্তহীন বাঘ’, যার শুধুই আছে ‘হালুম’।

অনেক সীমাবদ্ধতার পরেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছোট ও কম শক্তিশালী দেশগুলোর নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও অধিকারের কথা বলার একমাত্র সর্বজনীন মঞ্চ কিন্তু এই জাতিসংঘই। যদিও শুধু বিবৃতিতে আটকে থাকা জাতিসংঘ নিয়ে অনেক বিশ্লেষক ও সমালোচকই প্রশ্ন তুলেছেন—এই ‘অপদার্থ’ জাতিসংঘ লইয়া বিশ্ববাসী কী করিবে? যেহেতু কোনো বিকল্প নেই, তাই লড়তে হবে ভেতর থেকে। গ্লোবাল সাউথ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ চাপের মাধ্যমে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার নিশ্চিত করাই এখন একমাত্র পথ।

  • 0
  • 0
  • 0
  • 0
Visited 1 times, 1 visit(s) today
↑
Close