বাণিজ্য চুক্তির ভিত্তি হওয়ার কথা পারস্পরিক স্বার্থ ও ভারসাম্য। কিন্তু বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক “Agreement on Reciprocal Trade” ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, তা শুধু অর্থনীতি নয়—রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও।
আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি বাণিজ্য চুক্তি। কিন্তু এর শর্তগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি অনেক বেশি একতরফা বাধ্যবাধকতার দলিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক চাপই তৈরি করবে না; বরং জ্বালানি ক্রয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অংশীদার নির্বাচন পর্যন্ত বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকেও সীমিত করতে পারে। অর্থাৎ, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো ক্রমশ ওয়াশিংটনের স্বার্থ বিবেচনা করেই নিতে হতে পারে।
প্রথমেই আসা যাক সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়—শুল্ক বৈষম্যে। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে আমেরিকার ৬ হাজারেরও বেশি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে। বিপরীতে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে। অর্থাৎ বাংলাদেশ কার্যত মার্কিন পণ্যের জন্য নিজের বাজার উন্মুক্ত করছে, কিন্তু সমপরিমাণ প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না। এর ফলে ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোও একই সুবিধা দাবি করতে পারে, আর তা না দিলে ডব্লিউটিওর এমএফএন নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠতে পারে।
জ্বালানি খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন গ্যাস আমদানির বাধ্যবাধকতায় যেতে হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার যাচাই করে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি কেনার স্বাধীনতা সংকুচিত হবে।
একইভাবে খাদ্যশস্য আমদানিতেও বড় ধরনের বাধ্যবাধকতা এসেছে। আগামী পাঁচ বছর প্রতি বছর ৭ লাখ টন গম এবং বছরে ২৬ লাখ টন সয়াবিন আমেরিকা থেকে কিনতে হবে। অথচ এতদিন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে কম দামে এসব পণ্য সংগ্রহ করত। অর্থাৎ বাজার নয়, এখন চুক্তিই ঠিক করবে কোথা থেকে কিনতে হবে।
ওষুধ ও মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত ধারাগুলোও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। চুক্তির ফলে মার্কিন ওষুধ কোম্পানিগুলো বিশেষ সুবিধা পাবে এবং মেধাস্বত্ব আইন আরও কঠোর হবে। এর প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগের মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ওপর। জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, বাজারমূল্যও বাড়তে পারে বহুগুণ। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—এই চুক্তি শুধু বাণিজ্য নয়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতার ওপরও হস্তক্ষেপ করছে।
বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারবে না। মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর ডিজিটাল ট্যাক্স বসানোও নিষিদ্ধ। এমনকি দেশীয় শিল্প রক্ষায় ভর্তুকি দিতে হলেও আমেরিকাকে জানাতে হবে, এবং তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হলে সেই ভর্তুকি বন্ধের চাপ আসতে পারে। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজের শিল্পনীতি স্বাধীনভাবে নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
এই অসমতার সবচেয়ে প্রতীকী উদাহরণ লুকিয়ে আছে চুক্তির ভাষাতেই। ৩২ পৃষ্ঠার দলিলে ‘Shall’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১৭৯ বার—যা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক নির্দেশ বোঝায়। এর মধ্যে ‘Bangladesh shall’ ১৩১ বার, ‘US shall’ মাত্র ৬ বার। অর্থাৎ এটি পারস্পরিক সমঝোতার চেয়ে অনেক বেশি একতরফা বাধ্যবাধকতার নথি বলেই মনে হচ্ছে। তার ওপর, ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এত বড় অর্থনৈতিক চুক্তি ঘিরে এমন গোপনীয়তা এবং বাংলাদেশের এলডিসি সুবিধাগুলোর অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
শুল্ক কাঠামোতেও বৈষম্য স্পষ্ট
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড় শুল্ক প্রায় ১৯ শতাংশ। নতুন ব্যবস্থায় তা বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে। বিপরীতে বাংলাদেশে মার্কিন পণ্যের কার্যকর শুল্ক ২.২ শতাংশ থেকে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসবে। সিপিডির মতে, আগামী ১০ বছরে ৭ হাজার ১৩২টি মার্কিন পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, ফলে বাংলাদেশ বিপুল রাজস্ব হারাবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্য থেকে ১২৪ কোটি ডলার শুল্ক আদায় করেছে, যেখানে বাংলাদেশের আয় ছিল মাত্র ১৮ কোটি ডলার। নতুন চুক্তিতে এই বৈষম্য আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চুক্তির কিছু ধারা সরাসরি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত স্বাধীনতার সঙ্গেও জড়িত। বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বা ডিজিটাল চুক্তি করবে, কোথা থেকে জ্বালানি বা পারমাণবিক প্রযুক্তি কিনবে—এসব ক্ষেত্রেও মার্কিন স্বার্থ বিবেচনার চাপ তৈরি হতে পারে। এমনকি রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণেও ভবিষ্যতে মার্কিন অনুমোদনের প্রশ্ন উঠতে পারে।
কৃষি খাতেও প্রভাব কম নয়। মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোতে যোগ দেওয়ার চাপ ছোট কৃষকদের বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের স্বাধীনতা কমাতে পারে। উৎপাদন খরচ বাড়বে, নির্ভরতা বাড়বে বহুজাতিক কোম্পানির ওপর। পোশাক খাতেও বাস্তবতা খুব স্বস্তিদায়ক নয়। মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে কিছু সুবিধা থাকলেও এমএফএন শুল্ক বহাল থাকবে। অথচ বাংলাদেশ বর্তমানে আফ্রিকা ও ব্রাজিল থেকে তুলনামূলক সস্তায় তুলা আমদানি করে। মার্কিন তুলা ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, আর সুবিধার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণও থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই।
সবশেষে আছে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার ঝুঁকি। ডব্লিউটিওর এমএফএন নীতি অনুযায়ী, এক দেশকে দেওয়া বিশেষ সুবিধা অন্য দেশকেও দিতে হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া শুল্ক সুবিধা অন্যদের না দিলে বাংলাদেশ আইনি চাপে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার—এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই সম্পর্কের মূল্য যদি হয় অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নীতিগত সার্বভৌমত্বের ক্রমাগত সংকোচন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই চুক্তি কি সত্যিই বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথ খুলে দেবে?
নাকি এটি এমন এক দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার কাঠামো, যেখানে “বাণিজ্য” নামের আড়ালে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে রাষ্ট্রের স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা?
