একটি দেশের আসল শক্তি কী? পারমাণবিক বোমা, অত্যাধুনিক মিসাইল, নাকি ভয়ংকর কোনো যুদ্ধাস্ত্র? ইরান বারবার প্রমাণ করেছে, তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো অস্ত্র নয়, বরং তাদের দেশের সাধারণ মানুষ।
৮ এপ্রিল। ইরানের রাজপথে নেমেছে লাখো মানুষের ঢল। ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর ৪০তম দিন বা ‘চেহলাম’। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন তিনি। এরপর তাঁর ছেলে মোজতাবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিলেও তিনি এখনো জনসম্মুখে আসেননি।
আলি খামেনির মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভেবেছিল এক ভিন্ন সমীকরণ। তারা ভেবেছিল, মোল্লাতন্ত্র আর সরকারের নানা নীতির ওপর বিরক্ত ইরানি জনগণ তাদের ত্রাণকর্তা বা বন্ধু হিসেবে মেনে নেবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টো। নিজেদের মধ্যে যতই মতভেদ থাকুক, বা সরকারের ওপর যতই ক্ষোভ থাকুক না কেন, বিদেশি আগ্রাসনকে ইরানের মানুষ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ছুড়ে ফেলেছে। আর কাকতালীয়ভাবে, এই চেহলামের দিনেই শুরু হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি। ইরান যে ১০ দফা দাবি দিয়েছিল, খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প তা ভিত্তি করেই এই যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছেন।
কিন্তু এই যুদ্ধবিরতির ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ৭ এপ্রিলের চিত্রটি ছিল আরও বিস্ময়কর এবং রোমাঞ্চকর। ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, মঙ্গলবার রাত ৮টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে তিনি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সব সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেবেন। তিনি একে ‘পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে’ ও ‘ব্রিজ ডে’ নাম দিয়ে ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
কিন্তু এর জবাবে ট্রাম্পের বোমার সামনে বুক পেতে দাঁড়াল ইরানের সাধারণ মানুষ। তেহরান, আহভাজ, তাবরিজসহ বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বুশেহরের পারমাণবিক চুল্লি, আহভাজের বিখ্যাত ‘সাদা সেতু’ এবং শহীদ রাজায়ীর মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চারপাশে তারা তৈরি করে এক অভেদ্য ‘মানবঢাল’ বা হিউম্যান চেইন। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। জাতিসংঘ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ট্রাম্পের এই হুমকিকে যুদ্ধাপরাধ বললেও, ইরানিরা কারও মুখাপেক্ষী হয়নি, নিজেরাই যেন নিজেদের দেশের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বছরের পর বছর ইরানের মানুষ প্রমাণ করেছে, সংকটের সময় তারাই দেশটির সবচেয়ে বড় অস্ত্র এবং সবচেয়ে মজবুত ঢাল। খামেনির শাসনামল নিয়ে সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ বা মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু যখনই দেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত এসেছে, তারা সব বিভেদ ভুলে এক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর পর পশ্চিমাদের ‘বন্ধু’ সাজার নাটক প্রত্যাখ্যান করা এবং ট্রাম্পের হুমকির মুখে নিজ দেশের স্থাপনা বাঁচাতে লাখ লাখ মানুষের মানবঢাল তৈরি করা—দুটি ঘটনাই প্রমাণ করে, ইরানের মাটি রক্ষার জন্য কোনো মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের চেয়েও সাধারণ মানুষের দেশপ্রেম অনেক বেশি শক্তিশালী। দেশের প্রতিটি বড় ক্রান্তিলগ্নে বাইরের কোনো অস্ত্র নয়, বরং এই সাধারণ মানুষগুলোই হয়ে ওঠে ইরানের সবচেয়ে বড় ঢাল।
