Written by 11:44 am Uncategorized Views: 2

গ্যালিপলির বীর থেকে আধুনিক তুরস্কের জনক

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বীর মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক কীভাবে অটোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে আধুনিক তুরস্ক গড়লেন এবং তাঁর কামালিজম কেন আজ চ্যালেঞ্জের মুখে।

‘ঐ ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,

কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্ সে সামাল-সামাল তাই!

………………….

বল্ দেখি ভাই, বল হাঁ রে,

দুনিয়ায় কে ডর্ করে না তুর্কীর তেজ্ তলোয়ারে?’

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এক অপরাজেয় সৈনিক মোস্তফা কামাল পাশা। তিনি এলেন ঝড়ের মতো; বদলে দিলেন পুরো মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ভাষা। দুনিয়ায় তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দগদগে ঘা! আর ভারতীয় উপমহাদেশ উত্তাল খিলাফত আন্দোলনে। সাল ১৯২১। কাজী নজরুল লিখলেন এক বিখ্যাত কবিতা; উপমহাদেশের মানুষ পরিচিত হলো এক জাতীয়তাবাদী বীরের সঙ্গে। যদিও খিলাফত আন্দোলন এবং কামাল পাশার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর; তবুও কামাল পাশার শৌর্য, বীরত্ব ভরসা দিলো স্বাধীনতাকামী ভারতবাসীকে।

এদিকে, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় আর একের পর এক ভূখণ্ড হারিয়ে বিশ্বমুসলিমের আবেগের কেন্দ্রস্থল অটোমান সাম্রাজ্যের সূর্য তখন অস্তগামী। তেলহীন নিভু আলোয় জ্বলছিল সাম্রাজ্যের শেষ প্রদীপ। তবুও বলকান যুদ্ধে হারানো ভূখণ্ড উদ্ধারের শেষ চেষ্টা, রাশিয়ার আগ্রাসনের ভয়, অস্তিত্ব রক্ষার সর্বাত্মক আকাঙ্ক্ষা আর জার্মানির সঙ্গে গোপন সামরিক চুক্তি তাকে টেনে নিলো যুদ্ধের ময়দানে। সেইসঙ্গে যুক্ত হলো—বিপুল ঋণের বোঝা, আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ার শঙ্কা আর মুসলিম বিশ্বকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা। এমন প্রেক্ষাপটেই বিশ্ব ইতিহাসের মঞ্চে এলেন মোস্তফা কামাল। পরবর্তীতে তিনিই পরিচিত হয়েছিলেন ‘কামাল আতাতুর্ক’ বা তুর্কিদের পিতা হিসেবে।

১৮৮১ সালে স্যালোনিকা, বর্তমান গ্রিসের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া মোস্তফা কামাল গোপনে সামরিক স্কুলে ভর্তি হন। ইস্তাম্বুলের উসমানীয় মিলিটারি কলেজ থেকে ১৯০৫ সালে স্নাতক শেষ করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ক্যাপ্টেন হিসেবে। এরপর এলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ; অটোমান সাম্রাজ্যের চরম পরাজয়ের মধ্যেও গ্যালিপলি যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর অসামান্য রণকৌশলগত বিজয় তাঁকে জাতীয় বীরে পরিণত করে। ১৯১৫ সালের ২৫ এপ্রিল, আনজাক কোভেতে ব্রিটিশ-ফরাসি-অস্ট্রেলিয়ান বাহিনীর আক্রমণ কামাল পাশার ১৯তম ডিভিশন দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করে। তিনি উপাধি পান—‘ইস্তাম্বুলের ত্রাণকর্তা’।

গ্যালিপলির বিজয় ছিল কামাল পাশার উত্থানের প্রথম অধ্যায়। যুদ্ধ শেষে পরাজিত অক্ষশক্তির অংশ হিসেবে সেভরেস চুক্তির মাধ্যমে মিত্রবাহিনী তুর্কি ভূখণ্ডকে খণ্ড-বিখণ্ড করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ সময় সুলতানের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান কামাল। ১৯১৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় তুর্কি স্বাধীনতা যুদ্ধ। Lumenlearning-এর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ সূত্র বলছে—কামাল পাশা ইস্তাম্বুলে পরাজিত সুলতানের বিরুদ্ধে আঙ্কারায় জাতীয় মুক্তি আন্দোলন গড়ে তোলেন। গ্রিক আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, ব্রিটিশ-ফরাসি-ইতালীয় সৈন্যদের হটিয়ে দেন। কামাল পাশার দৃঢ় নেতৃত্বে ১৯২৩ সালে লোজান চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের সীমানা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় মিত্রশক্তি। একই বছরের ২৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হয় এবং মোস্তফা কামাল নির্বাচিত হন আধুনিক তুরস্কের প্রথম রাষ্ট্রপতি। ১৯৩৪ সালে তুরস্কের জাতীয় সংসদ তাঁকে ‘আতাতুর্ক’ বা ‘তুর্কিদের পিতা’ উপাধি দেয়।

মূলত প্রজাতন্ত্রবাদ, জাতীয়তাবাদ, জনতাবাদ, রাষ্ট্রবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সংস্কারবাদ—এই ছয় মূল নীতিকে ঘিরে কামাল আতাতুর্কের রাজনীতি আবর্তিত। ইতিহাসে এই নীতি ‘কামালিজম’ বা Six Arrows নামে পরিচিত। ক্ষমতায় এসেই ১৯২৪ সালে কামাল পাশা খিলাফত ব্যবস্থার অবসান ঘটান। তাঁর প্রধান অর্জন—একটি ধর্মভিত্তিক সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে সম্পূর্ণ আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্র গঠন। Washington Institute-এর বিশ্লেষণ বলছে, আধুনিক তুরস্কে কামাল পাশার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কেন্দ্র ধর্মনিরপেক্ষতা এবং পশ্চিমীকরণ। My Pluralist-এর বিশ্লেষণ বলছে—কামাল আতাতুর্ক ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মের তালিকা থেকে বাদ দেন। সুইজারল্যান্ডের দেওয়ানি আইন এবং ইতালির ফৌজদারি আইনের আদলে নতুন আইন কাঠামো প্রবর্তন করেন। ল্যাটিন অক্ষরের ওপর ভিত্তি করে নতুন তুর্কি বর্ণমালা চালু করে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন। তাঁর শাসনামলে হিজরি ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গৃহীত হয় এবং ঐতিহ্যবাহী তুর্কি ফেজ টুপি ও নারীদের হিজাব পরিধানের রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা দূর হয়। ১৯৩৪ সালে অনেক পশ্চিমা দেশের চেয়েও আগে নারীদের পূর্ণ ভোটাধিকার প্রদান করেন মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক।

কিন্তু কামাল পাশার এই বৈপ্লবিক সংস্কারই বিশ্বমুসলিমের সঙ্গে কামাল পাশার তীব্র দ্বন্দ্বের কারণ হয়। তাঁর অতি-ধর্মনিরপেক্ষ বা ‘লাইসিতে’ নীতি তৎকালীন রক্ষণশীল তুর্কি সমাজ এবং সামগ্রিক মুসলিম বিশ্বে তীব্র ক্ষোভ ও বিরোধের জন্ম দেয়। শতাব্দীকাল ধরে বিশ্ব মুসলিমের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঐক্যের প্রতীক মনে করা অটোমান খিলাফত বিলুপ্ত করায় ভারতীয় উপমহাদেশের খিলাফত আন্দোলনকারীসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। আরবি বাদ দিয়ে তুর্কি ভাষায় আজান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মাদারাসা ও সুফি তরিকা নিষিদ্ধ এবং শরিয়া আদালতের বিলুপ্তি ঘোষণার কারণে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা তাঁকে ইসলামের ঐতিহ্য ধ্বংসকারী হিসেবে দেখতে শুরু করে। একসময় যে মুসলিম বিশ্ব গ্যালিপলির বীরকে অভিবাদন জানিয়েছিল, তারাই খিলাফত বিলোপকারী কামালকে প্রত্যাখ্যান করল। কামাল পাশা মনে করতেন—বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত, দেউলিয়া এবং ক্ষয়িষ্ণু তুরস্কে খেলাফতের প্রাচীন কাঠামো দিয়ে পশ্চিমা আগ্রাসন ঠেকানো অসম্ভব। পাশাপাশি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে ধর্মীয় সংস্থাগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় উন্নতির পথে বাধা। ফলে তিনি জনগণের ওপর অনেকটা জোর করেই রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি চাপিয়ে দেন, যা দীর্ঘমেয়াদে জনগণের একাংশের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়। কামাল আতাতুর্কের কাছে যা ছিল উন্নয়নের অন্তরায়, সাধারণ মুসলমানের কাছে তা হয়ে উঠলো পরিচয় ও আস্থার ওপর আঘাত।

দশকের পর দশক কামালিজমের রক্ষাকর্তা ছিল তুরস্কের সামরিক বাহিনী। My Pluralist-এর বিশ্লেষণ সূত্র বলছে—কামাল পাশা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনী ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার মূল অভিভাবক। ফলে দেশটিতে ধর্মীয় দলগুলো ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করলেই সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করত। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই চিত্র বদলে যায়। কামালিজমের কট্টর ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির বিরুদ্ধে তুরস্কের সাধারণ মানুষের সুপ্ত ধর্মীয় অনুভূতি রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে। সেনাবাহিনীর কড়া নজরদারি, বারবার সামরিক অভ্যুত্থান সত্ত্বেও নাজমুদ্দিন এরবাকানের হাত ধরে তুরস্কে বপিত হয় রাজনৈতিক ইসলামের বীজ। ১৯৯৭ সালে ইসলামপন্থী প্রধানমন্ত্রী এরবাকানকে সেনা চাপে পদত্যাগ করতে হয়। কিন্তু সেটাই ছিল তুরস্কে কামালিজমের শেষ বিজয়।

২০০২ সালে তুরস্কের রাজনীতিতে ঘটে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। তুরস্কের সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা একেপি। আর এতেই বদলে যায় সমীকরণ। এরদোয়ানের হাতে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং জনপরিসরে ইসলামের ভূমিকার পুনর্জাগরণ। The Conversation-এর বিশ্লেষণ বলছে—একেপির এই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ‘কামালবাদী’ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অত্যন্ত বিপর্যয়কর এবং বড় পরাজয়। Washington Institute সূত্র বলছে—২০০২ সাল থেকে এরদোয়ান পদ্ধতিগতভাবে কামালবাদের উত্তরাধিকার মুছে ফেলতে শুরু করেন। তিনি হিজাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। আয়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তর এবং উসমানীয় ঐতিহ্যের গৌরব ফিরিয়ে আনার নীতি গ্রহণ করেন। কামালিস্ট এলিটদের কাছে উপেক্ষিত এসব নীতি তুরস্কের রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, আতাতুর্কের রাজনীতির এই আপাত পরাজয়ের পেছনে বিদ্যমান গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র সূত্র বলছে—কামাল পাশার রাজনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষতা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় জীবনকে ছুঁতে পারেনি। ফলে গভীর ধার্মিকতায় গড়া তুর্কি সমাজব্যবস্থায় কামালিজম শুধু খোলস হয়েই রয়ে গেছে। এছাড়া কামালিজম ছিল তুর্কি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া, যা তুরস্কের গ্রামীণ ও ধর্মপ্রাণ জনগণের মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে স্পর্শ করেনি। পাশাপাশি, দীর্ঘ ধর্মনিরপেক্ষ শাসনে এলিটরা যেভাবে ধর্মীয় অনুভূতির ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে, তা জনগণের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। এরদোয়ানের অধীনে তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে স্বাধীন ও শক্তিশালী আবির্ভাব তুর্কিদের জাতীয়তাবাদী অহংকারকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। My Pluralist-এর বিশ্লেষণ বলছে—যে ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় পরিচয়কে দমন করেছিল, সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভই এরদোয়ানকে ক্ষমতায় এনেছে। ফলে ব্যালট বাক্সে কামাল পাশার কট্টর ধর্মনিরপেক্ষ ধারাটি ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।

কামাল পাশার গল্প শুধু একজন মানুষ নয়, দুটি দ্বান্দ্বিক স্বপ্নের। একদিকে আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ, পশ্চিমমুখী তুরস্ক; অন্যদিকে ইসলামি পরিচয়ে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। গ্যালিপলির ময়দান থেকে আঙ্কারার রাজধানী পর্যন্ত এক অনন্য অভিযাত্রী কামাল পাশা। কিন্তু রাষ্ট্রের পরিচয় নির্মাণে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রশ্নের সমাধান করতে পারেননি। তিনি তুরস্কবাসীকে নিশ্চিত মানচিত্র বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচিয়ে আধুনিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছিলেন, সত্য; কিন্তু তাঁর অতি-ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কার তুর্কি সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনকে চিরস্থায়ী করেছে।

Visited 2 times, 1 visit(s) today
Close