Written by 11:46 am বিশ্লেষণ Views: 2

কলোম্বাসের ভাইরাস: উপনিবেশবাদের অদৃশ্য উত্তরাধিকার

কলোম্বাসের জাহাজ শুধু সৈন্য আনেনি, এনেছিল এক দীর্ঘস্থায়ী উপনিবেশবাদের ভাইরাস। ইতিহাসের আড়ালে থাকা সেই অন্ধকার অধ্যায় আজও কতটা প্রাসঙ্গিক?

স্কুলে পড়ানো হয়—“কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন।” কিন্তু এই এক বাক্যের অন্তরালে লুকিয়ে আছে কতশত অন্ধকার অধ্যায়, সেগুলো কি স্কুলে পড়ানো হয়?

কলোম্বাস তার নোটবুকে লিখেছিলেন, “এরা খুব শান্ত স্বভাবের, ভদ্র ও বিশ্বাসী। তাই এদের দাস বানানো সহজ।” এই একটা বাক্যের ভেতরেই তলিয়ে যায় হাজার বছরের আদিবাসী ইতিহাস, যা উপনিবেশবাদের পায়ের তলে পিষে নিঃশেষ হয়ে গেছে। অপরদিকে, ১৯৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলোম্বাসের ১৪৯২ সালের যাত্রার ৫০০ বছর পূর্তিকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ র‍্যালিতে বিভিন্ন ব্যানারে দেখা যায়, “500 Years of Resistance”, “No Celebration on Stolen Land” ইত্যাদি। কী বুঝলেন? ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড জিন বলেছিলেন, রাষ্ট্রীয় ইতিহাস প্রায়ই বিজয়ীদের স্মৃতিকে “স্বাভাবিক সত্য” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু কীভাবে?

১৪৯২ সাল। আটলান্টিকের অন্ধকার জলের ওপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তিনটি জাহাজ—নিনিয়া, পিন্টা, সান্তা মারিয়া। দূরে সবুজ দ্বীপ। তীরে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। তারা জানে না, দিগন্তে দেখা ওই পালগুলো শুধু জাহাজ নয়; ওগুলো এক নতুন পৃথিবী ব্যবস্থার আগমন। ওগুলোর সঙ্গে আসছে এমন এক সভ্যতা, যে নিজেকে “মানবিক” বলবে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, দাসত্ব আর উচ্ছেদের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের আধুনিকতা গড়ে তুলবে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—পরে সেই ঘটনাকেই ইতিহাসে লেখা হবে “আবিষ্কার” নামে। যেন সেখানে আগে কোনো মানুষ ছিল না। কোনো ভাষা ছিল না। কোনো সংস্কৃতি ছিল না। স্মৃতির কোনো চিহ্ন ছিল না। এটাই উপনিবেশবাদের সবচেয়ে বড় কৌশল—প্রথমে মানুষকে অদৃশ্য করে দাও, তারপর তার ভূমি দখল করো, শেষে সেই দখলকেই “সভ্যতা” বলে প্রতিষ্ঠা করো।

ক্রিস্টোফার কলোম্বাস যখন ক্যারিবীয় অঞ্চলে পৌঁছান, তখন সেখানে তাইনো ও আরাওয়াক জনগোষ্ঠীর মানুষ শত শত বছর ধরে বাস করছিল। তাদের নিজস্ব কৃষিব্যবস্থা ছিল, সমাজ ছিল, ধর্ম ছিল, সমুদ্রজ্ঞান ছিল। কিন্তু ইউরোপীয় চোখে তারা “সভ্য মানুষ” ছিল না। কারণ তখন ইউরোপ এমন এক মানসিকতায় ঢুকে গেছে, যেখানে পৃথিবীকে দুই ভাগে দেখা হয়—সভ্য ও অসভ্য, শাসক ও শাসিত। আর এই বিভাজনই পরে লুণ্ঠন ও সহিংসতার পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। কবি ও দার্শনিক এমে সেজ্যার লিখেছিলেন, উপনিবেশবাদ মানুষের মানবিকতাকেই শর্তাধীন করে তোলে; কে মানুষ, কে না মানুষ, সেটা ক্ষমতা ঠিক করে। ভেবে দেখুন ব্যাপারটা—একদিকে তারা বাইবেল হাতে “মানবতা” শেখাচ্ছে, অন্যদিকে স্বর্ণের জন্য পুরো দ্বীপ উজাড় করে দিচ্ছে। একদিকে তারা ঈশ্বরের কথা বলছে, অন্যদিকে মানুষের শরীরকে শ্রমের যন্ত্রে পরিণত করছে। এ যেন ধর্ম, বাণিজ্য আর সাম্রাজ্যের এক ভয়ংকর জোট।

কলম্বাসের জাহাজ শুধু সৈন্য আনেনি। সঙ্গে এনেছিল গুটিবসন্ত, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, দাস-শ্রম, আর এমন এক অর্থনীতি—যেখানে মানুষকেও সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। ইতিহাসবিদ তসভেতান তদোরভ বলেছিলেন, কলম্বাস আদিবাসীদের মানুষ হিসেবে বোঝার চেষ্টা করেননি; তিনি তাদের নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার উপাদান হিসেবে দেখেছিলেন। অর্থাৎ “অন্যকে বোঝা” নয়, “অন্যকে নিজের কাঠামোয় ঢুকিয়ে নেওয়া”ই ছিল মূল যুক্তি। এখানেই উপনিবেশবাদের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য লুকিয়ে। যা শুধুমাত্র কোনো ভূখণ্ড দখল করে না; এটা মানুষের আত্মপরিচয় দখল করে, স্মৃতি মুছে দেয়, এমনকি মানুষকে নিজের চোখেই ছোট করে ফেলে। একটা জাতিকে বারবার বলা হয়—“তোমরা অসভ্য”, “তোমাদের কোনো ইতিহাস নেই”, “তোমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস—সবই নিম্নমানের।” আর দীর্ঘদিন এই কথাগুলো শুনতে শুনতে একসময় মানুষ নিজের শেকড় নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করে। উপনিবেশবাদ ঠিক এখানেই সবচেয়ে সফল হয়—যখন নিপীড়িত মানুষও শাসকের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখতে শুরু করে।

এটা হলো চেতনার দখল। একটা জাতির শিকড় উপড়ে ফেলে তাকে ইতিহাসহীন করে তোলার প্রক্রিয়া। আর সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটা হলো—যে আধুনিক পৃথিবীকে আমরা আজ “সভ্যতার বিজয়” বলে দেখি, তার ভিতের নিচে চাপা পড়ে আছে অসংখ্য অদৃশ্য জীবন। আমরা আধুনিকতা বললে বিজ্ঞান, যুক্তি, মানবাধিকার, গণতন্ত্রের কথা বলি। কিন্তু খুব কম মানুষ বলে—এই আধুনিকতার বন্দরগুলো তৈরি হয়েছিল দাসজাহাজের বাণিজ্যে। ইউরোপের ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় শক্তি ফুলে উঠেছিল উপনিবেশের লুণ্ঠিত সম্পদে। ক্যারিবীয় দ্বীপের দাসশ্রমনির্ভর আখচাষ ব্যবস্থা থেকে যে সম্পদ বের হতো, তার ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছিল বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভিত্তি। অর্থাৎ আধুনিকতার আলো একা ফুটে ওঠেনি; তার পেছনে ছিল এক বিশাল, গভীর অন্ধকার। একদিকে ইউরোপ “মানবতা”র ভাষা তৈরি করেছে, অন্যদিকে একই সময়ে আফ্রিকার মানুষদের শিকলে বেঁধে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। একদিকে স্বাধীনতা ও যুক্তির কথা বলেছে, অন্যদিকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নাম তাদেরই ভূমি থেকে মুছে দিয়েছে। এই দ্বিচারিতাই উপনিবেশিক আধুনিকতার আসল মুখ। বাইরে মানবতার ভাষা, ভিতরে দখল আর শোষণের যন্ত্র।

নৃতত্ত্ববিদ জ্যাক ডি. ফোর্বসের ভাষ্যমতে, উপনিবেশবাদ শুধু শারীরিক নির্যাতন বা সম্পদের শোষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী আদর্শিক আগ্রাসন। আর এই আগ্রাসন সবচেয়ে সূক্ষ্মভাবে কাজ করে ইতিহাসের ভাষায়। আর এই কারণেই কলম্বাসের গল্প শুধু অতীতের গল্প নয়; এটা এখনো চলমান এক ধারা। আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ে আদিবাসীরা ভূমি দখল, উচ্ছেদ ও নানামুখী নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তোলে। সমতলে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের জমিতেই অনিরাপদ হয়ে পড়ে। উন্নয়ন, নিরাপত্তা, পর্যটন—নতুন ভাষায় পুরোনো দখলদারিই ফিরে আসে। প্রথমে বলা হয়—“এই জমি রাষ্ট্রের জন্য দরকার।” তারপর বলা হয়—“ওরা ব্যাকডেটেড। অসভ্য।” ফলাফল দাঁড়ায়, মানুষ নিজের ভূমিতেই পরবাসী হয়ে যায়।

কলম্বাসের জাহাজ হয়তো আর সমুদ্রে ভাসে না, কিন্তু তার ছড়ানো সেই উপনিবেশবাদের ভাইরাস এখনো বেঁচে আছে। তাই মানুষ আজও হাঁসফাঁস করে একটা বৈষম্যহীন সুন্দর পৃথিবীর আশায়।

Visited 2 times, 1 visit(s) today
Close