Written by 11:53 am স্বাস্থ্য Views: 6

হামের প্রাদুর্ভাব ২০২৬: টিকা সংকটে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়

বাংলাদেশে হামের বিপজ্জনক প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যু বাড়ছে। টিকা সংকটের দায় কি শুধু আগের সরকারের, নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিব্যর্থতাও দায়ী?

বৈশ্বিক হামের প্রাদুর্ভাবের আঁচড় পড়েছে বাংলাদেশেও। প্রতিদিনই নতুন করে মৃত্যুর খবর আসছে, যা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। কিন্তু সব মৃত্যুর খবর কি গণমাধ্যমে আসছে? বিশেষ করে ৬ মাসের নিচের শিশুদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

পরবর্তীতে দেশের ১৮টি জেলায় হামের টিকা কার্যক্রম শুরু করে সরকার। পর্যায়ক্রমে টিকা দেওয়া হচ্ছে সারা দেশেও। কিন্তু হামের এই প্রাদুর্ভাবের কারণ কী? হাম-রুবেলার টিকা কার্যক্রম একটি নিয়মিত জাতীয় কর্মসূচি। দীর্ঘদিনের এই কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ একসময় ৯৫ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনের গৌরব অর্জন করেছিল। তাহলে সেই দুর্ভেদ্য সুরক্ষাবলয় হঠাৎ ছিদ্র হলো কীভাবে?

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন টিকা কার্যক্রম উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন, প্রতি চার বছর অন্তর হাম–রুবেলার টিকা দেওয়ার কর্মসূচি থাকলেও বিগত সরকার এ বিষয়ে অবহেলা করেছে। ২০২০ সালে শিশুদের জন্য হাম–রুবেলার টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকার সেটা না করে সারা দেশে শিশুস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর গতদিনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি এই পুরো সংকটের দায়ভার স্রেফ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কাঁধে ঠেলে দিয়ে নিজের হাত ধুয়ে ফেলতে চেয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য যাচাই করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ সালেই দেশব্যাপী অত্যন্ত সফলভাবে হামের টিকা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। তাহলে মন্ত্রী মহোদয় কি তথ্যের অভাবে ভুগছেন, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে জনস্বাস্থ্যকে মিথ্যার ওপর দাঁড় করাচ্ছেন?

অন্যদিকে একই সরকারের আরেক মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আঙুল তুললেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে। কক্সবাজারে টিকা কার্যক্রম উদ্বোধন করতে গিয়ে অনলাইনে যুক্ত হয়ে তিনি বলেছেন—হাম ও রুবেলা টিকা কার্যক্রমে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের মনোযোগ না থাকায় এই প্রাদুর্ভাব। একই মন্ত্রিসভার দুই সদস্যের এই দুই রকম বক্তব্য কি সরকারের অবস্থানকে স্পষ্ট করে, নাকি সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে? জনস্বাস্থ্যের মতো একটি গুরুতর জাতীয় সংকট মোকাবেলার সময় এমন রাজনৈতিক ‘ব্লেম-গেম’ সরকার সম্পর্কে কী ধারণা তৈরি করে?

পঞ্চম সেক্টর এইচএনপিএসপির কার্যক্রমের প্রস্তুতি শুরু হলেও অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাতিল করে দুই বছর মেয়াদের একটি ডিপিপি কর্মসূচি হাতে নেয়। এর অধীনে প্রথম বছরের জন্য ১৪৫১ কোটি টাকা বরাদ্দও করা হয়। কিন্তু সময়মতো সেই টাকা ছাড় হয়নি। ফলে টিকা কেনার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হয়। তৈরি হয় ‘ট্রানজিশনাল গ্যাপ’। তা যে একটা আত্মঘাতী ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল, তার প্রমাণ এখন আমরা পাচ্ছি। দাতা সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সদিচ্ছা তাত্ত্বিকভাবে মহৎ মনে হতে পারে, কিন্তু নিজের আর্থিক অবকাঠামোর সক্ষমতা না বুঝে হঠাৎ করে নিজস্ব অর্থায়নে টিকা কিনতে যাওয়ার যে উচ্চাভিলাষ দেখানো হয়েছে, তার খেসারত দিচ্ছে আজ এ দেশের সাধারণ মানুষ। এই যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর নীতিনির্ধারণী অদূরদর্শিতা—এর দায়ভার কে নেবে?

জনস্বাস্থ্যবিদরা বারবার সতর্ক করেছিলেন যে, পরনির্ভরশীলতা কমাতে হলে প্রয়োজন ধাপে ধাপে পরিকল্পনা। কিন্তু সংস্কারের নামে যে ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটা হয়েছে, তা আজ জনস্বাস্থ্যকে গুরুতর হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের দীর্ঘস্থায়ী দুর্নীতি, অনিয়ম ও জনবল সংকটের বোঝা এখনো স্বাস্থ্য খাত বয়ে বেড়াচ্ছে, এটা স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা দেখাতে তা খুব দ্রুত সংস্কার করতে গিয়ে যে নতুন প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্ম দেওয়া হলো, তার দায় থেকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারকে কি দায়মুক্তি দেওয়া যায়? বিশেষ করে টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি যে অভিযোগগুলো জোরালো হচ্ছে, সে বিষয়ে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারীর কোনো বক্তব্য না পাওয়া যাওয়াটা সন্দেহজনক। হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যে সরকার টিকার ব্যবস্থা করেছে। একটা নতুন সরকারের জন্য এই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রশংসিত হতেই পারে।

আবারও ফিরি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, কয়েক বছর বিলম্ব হওয়ায় হাম–রুবেলায় কিছু শিশু মারা গেছে। এটা গত সরকারের ভুল ছিল। তারা চার বছর পরেও এ টিকা দেয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই স্বাস্থ্য খাতে শিশুদের বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময় ইউনিসেফসহ কয়েকটি সংস্থার সহায়তায় এই ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য আসলে বিশ্লেষণ করা যায় কীভাবে? শতাধিক শিশুর মৃত্যুকে তিনি ‘কিছু শিশু মারা গেছে’ বলে লঘু করে দেখলেন, শতাধিক প্রাণ হারানো কি মন্ত্রীর কাছে কেবল একটি মামুলি সংখ্যা? তিনি দাবি করছেন, বর্তমান সরকারের প্রধান তারেক রহমানের ‘বিশেষ উদ্যোগে’ ইউনিসেফের সহায়তায় এই ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যদি পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় হয়ে থাকে যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হয়, তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রী গত দুই মাস কী করলেন? এমন প্রাদুর্ভাব হতে পারে—এই ‘প্রেডিকশন’ ন্যূনতম সক্ষমতা কি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেই? তারা কি জানতো না, টিকার মজুদ নেই, ফলে শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে? স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি তা জানতেন? নাকি, কবে, কখন টিকা দেওয়া হয়েছিল, তা যেমন জানতেন না, এ বিষয়টিকেও কি তিনি গুরুত্ব দেননি—এমন প্রশ্ন তুলছেন জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা? গুরুত্ব দিলে প্রধানমন্ত্রীকেই কেন এই ‘বিশেষ উদ্যোগ’ নিতে হলো?

যখন একটি দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানেন না অতীতে কখন টিকা দেওয়া হয়েছিল বা ভবিষ্যতে কখন মহামারি আসতে পারে, তখন সেই খাতের ভার প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে উদ্ধার পাওয়াটা কতটা কৃতিত্বের? মহামারি বেশিরভাগ সময়ই প্রাকৃতিক একটা কারণ, কিন্তু টিকার অভাব, বিজ্ঞানের এই আধুনিক কালে রোগের মনিটরিং না করা, কোনো মৃত্যুকে কি আর প্রাকৃতিক রাখে?

হামে আক্রান্ত একজন শিশু আরও অন্তত ১৮ জনকে আক্রান্ত করতে পারে, সারা দেশে এখন ঠিক কত শিশু সংক্রমিত, তা কি আমরা জানি? আক্রান্ত হয়ে বা উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে যেসব শিশু ভর্তি হয়েছে, প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সেসব শিশুদের কন্টাক্ট ট্রেসিং নিয়ে সরকার কি ভাবছে? শুধু টিকা কার্যক্রম হাতে নিয়েই কি হামের প্রকোপ ঠেকিয়ে রাখা যাবে? আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের যে অবকাঠামো, তার মাধ্যমে মহামারি ঠেকানো কতটা সম্ভব?

Visited 6 times, 1 visit(s) today
Close