Written by 11:29 am বিশ্লেষণ Views: 3

ইরান বিপ্লব কিভাবে গেল অসংগঠিত আলেমদের দখলে?

১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবে সুসংগঠিত বামপন্থীদের হটিয়ে কীভাবে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে আলেমরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলেন — সেই অসাধারণ ইতিহাসের বিশ্লেষণ।

পহেলা এপ্রিল। ক্যালেন্ডারের পাতায় এটা অবশ্য খুব সাধারণ কোনো তারিখ নয়। পশ্চিমাদের চোখে চোখ রেখে এই দিনে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল পারস্য সভ্যতা। ১৯৭৯ সালের এই দিনে জন্ম নিয়েছিল এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা—‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান’।

‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান’ ঘোষণার কদিন আগেও সেখানে পশ্চিমা সংস্কৃতির জোয়ার বইছিল। যেখানে রাজতন্ত্রের শিকড় ছিল আড়াই হাজার বছরের পুরোনো, সেখানে হঠাৎ করেই ধসে পড়ল পাহলভি বংশের সিংহাসন। আকাশ কাঁপিয়ে গর্জে উঠল লাখো মানুষের কণ্ঠস্বর। অনেকে ভেবেছিলেন, এটি কেবল একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ বিদ্রোহ, কিন্তু শেষমেশ দেখা গেল, এটি ছিল আধুনিক সমাজতত্ত্বের সব সেক্যুলার সূত্রকে ভুল প্রমাণ করে দেওয়া এক ‘আধ্যাত্মিক বিস্ফোরণ’।

কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব হলো? কীভাবে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই করা তুদেহ পার্টির মতো সুসংগঠিত বামপন্থীদেরও হটিয়ে শেষ হাসি হাসলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী? কীভাবে কারবালার আদি-চেতনা আর ইউরোপীয় মহাদেশীয় দর্শনের এক অদ্ভুত রসায়ন বদলে দিল পারস্যের মানচিত্র?

বিপ্লবের আগে প্রায় ৩৮ বছর ইরান শাসন করেছিলেন পাহলভি বংশের শেষ সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ। তাঁর শাসন ছিল আধুনিকতার চাকচিক্যে মোড়ানো এক নিঃছিদ্র একনায়কতন্ত্র। তাঁর কুখ্যাত গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’-এর অমানবিক পেষণে জনগণ ছিল অতিষ্ঠ। শাহ চেয়েছিলেন ইরানকে দ্রুতগতিতে পশ্চিমা ধাঁচে সাজাতে, যাকে তিনি বলতেন ‘শ্বেতবিপ্লব’। কিন্তু এই গতির আড়ালে ছিল সাংস্কৃতিক বিযুক্তি। সাধারণ ইরানিদের কাছে এটি ছিল তাদের হাজার বছরের যাপিত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সত্তার ওপর এক সরাসরি ঔপনিবেশিক আঘাত।

এখানেই একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দিক আছে। ইরানের সাধারণ মানুষ পাহলভির ক্ষমতা দখলকে ঐতিহাসিকভাবে হজরত আলী (রা.)-এর পুত্র ইমাম হুসাইন (রা.)-কে হত্যা করে ইয়াজিদের ক্ষমতা দখলের সমান্তরাল মনে করত। শিয়া-প্রধান ইরানি জনমানসে শাহের এই শাসন ছিল অনৈতিক ও কারবালার ট্র্যাজেডির মতো এক ‘অধর্মীয়’ আধিপত্য। এই সুপ্ত ধর্মীয় ক্ষোভের লাভাস্রোতই বিপ্লবের আগ্নেয়গিরিকে জীবন্ত করে তুলেছিল।

১৯৭৯ সালের জানুয়ারি। রাজপথে তখন মানুষের উত্তাল সমুদ্র। নির্বিচার গুলি চালিয়েও যখন গণজাগরণ থামানো যাচ্ছিল না, তখন শাহ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন—যাকে ইতিহাসবিদরা বলেন ‘অনিচ্ছুক রাজার চিরবিদায়’। ঠিক তার পরপরই নাটকীয়ভাবে দীর্ঘ ১৫ বছরের নির্বাসন শেষে প্যারিস থেকে ফিরলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী। মেহরাবাদ বিমানবন্দর থেকে বেহেশত-ই-জাহরা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে তাঁর সময় লেগেছিল ৬ ঘণ্টা; কারণ পুরো ইরান তখন রাস্তায় নেমে এসেছিল।

কিন্তু এই বিপ্লব কেন অন্য সব বিপ্লবের চেয়ে আলাদা? ইতিহাসে ধর্মীয় সংস্কার অনেক হয়েছে। জার্মানিতে মার্টিন লুথারের প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কার বা ফ্রান্সে হিউগেনোদের বিদ্রোহ ছিল মূলত সামাজিক বিবর্তনের অনুষঙ্গ। এমনকি নিকারাগুয়ার সান্দিনিস্তা বিপ্লব ‘মুক্তির ধর্মতত্ত্ব’ থেকে অনুপ্রেরণা নিলেও শেষমেশ তার রাশ ছিল মার্ক্সবাদীদের হাতে। কিন্তু ইরান ছিল এক মহাবৈপ্লবিক ব্যতিক্রম। এখানে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতাকে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রধান কারিগরি ও দার্শনিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি ধর্মীয় নেতৃত্ব রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেছে—এমন বিশুদ্ধ গণজাগরণমূলক উদাহরণ আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দ্বিতীয়টি নেই।

অনেকে মনে করেন, এই বিপ্লব ছিল কেবল আলেমদের। কিন্তু এর আদর্শিক ভিত গড়ে তোলায় ইউরোপীয় দার্শনিক চিন্তার এক অদৃশ্য কিন্তু বিশাল ভূমিকা ছিল। এখানে তিনটি ধারার এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। প্রথমটি খোমেনীর ‘বেলায়েত-ই-ফকিহ’ বা ইসলামি রাষ্ট্রভাবনা। দ্বিতীয়টি ছিল ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদ—যার প্রবক্তা ছিলেন জাঁ-পল সার্ত্র ও হাইডেগারের মতো দার্শনিকরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ইউরোপীয় দর্শনকেই জালাল আল-ই-আহমাদ এবং ড. আলী শরীয়তির মতো চিন্তাবিদরা ‘শিয়া লিবারেশন থিওলজি’ হিসেবে রূপান্তর করেন—এই ধারণায় যে, ধর্মই হতে পারে শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার।

বিপ্লবী আন্দোলনে তুদেহ পার্টির মতো সোভিয়েতপন্থী বাম দলগুলো ছিল কৌশলগতভাবে সবচেয়ে নিপুণ। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে দেখা গেল, বামপন্থীদের সব ডায়ালেকটিক্যাল মেটেরিয়ালিজমকে নস্যাৎ করে দিয়ে অসংগঠিত আলেমরাই পুরো আন্দোলনের ‘হেজেমনি’ নিয়ে নিলেন। এটি আধুনিক সমাজতাত্ত্বিকদের সেই তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করল যে আধুনিক সমাজে ধর্মের আবেদন ফুরিয়ে যাবে। ইরান দেখালো, আধুনিকতার সংকটের ভেতর থেকেই ধর্মের রাজনৈতিক পুনরুত্থান সম্ভব।

ইরান বিপ্লবের আরও একটি বিস্ময়কর দিক হলো এর ব্যাপকতা। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিল জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ। ১৯১৭ সালের রুশ বলশেভিক বিপ্লবেও পরিসংখ্যানটি ছিল কাছাকাছি। কিন্তু ইরানে? অবিশ্বাস্যভাবে দেশটির মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ সরাসরি রাজপথে নেমে এসেছিল। কেবল তেহরানেই ২০ লাখ মানুষ বিক্ষোভ করেছিল। শান্তিপূর্ণভাবে এত বিপুল পরিমাণ মানুষের সংহতি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক সুন্নি-প্রধান জনপদে প্রায়ই গোষ্ঠী-সন্ত্রাস বা মিলিশিয়া তৎপরতা দেখা যায়, সেখানে শিয়া আধ্যাত্মিকতায় এই সুশৃঙ্খল ‘মাস মোবিলাইজেশন’ বা গণজাগরণ আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে এক রহস্যময় পাঠ।

ক্ষমতায় এসেই খোমেনী একা চ্যালেঞ্জ করলেন তৎকালীন দুই পরাশক্তিকে—যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে। তিনি ঘোষণা করলেন—‘না প্রাচ্য, না পাশ্চাত্য’। তাঁর কাছে এই দুই শক্তিই ছিল মানবতার শত্রু। এই বিপ্লবের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘পরাশক্তি’র দম্ভ কেবল ধূলিসাৎই হয়নি, বরং তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট ওয়াশিংটনের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছিল। অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের বীজও যেন এখানেই বোনা হয়েছিল; কারণ ইরানের এই ‘ঈশ্বরমুখী’ বিপ্লব নাস্তিক্যবাদী কমিউনিস্ট সাম্রাজ্যের নৈতিক ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

আজ ৪৭ বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেই বিপ্লবের অনেক প্রতিশ্রুতিই হয়তো পূরণ হয়নি—হয়তো ভিন্ন নামে ফিরে এসেছে। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের এই বিপ্লব আজও এক অমীমাংসিত মহাকাব্য। এটি কি কেবলই আধুনিকতার বিচ্যুতি, নাকি পেছনের দিকে হেঁটে এক নতুন ভবিষ্যতের দিকে অগ্রযাত্রা? ইতিহাসের পাতায় ইরান বিপ্লব একটি আকস্মিক এবং ধ্রুপদী ‘স্পিরিচুয়াল রিভল্ট’ হিসেবেই অমর হয়ে থাকবে।

Visited 3 times, 1 visit(s) today
Close