১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাস। ইরানের রাস্তায় লাখো মানুষের ঢল। ৩৮ বছরের শাসন শেষে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন শাহ রেজা পাহলভি। পশ্চিমাপন্থী আধুনিকতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ, অর্থনৈতিক বৈষম্য আর রাজনৈতিক দমন-পীড়ন—সব মিলিয়ে বিস্ফোরিত হয় জনরোষ। এই সুযোগে সামনে আসেন এক ধর্মীয় নেতা, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। নির্বাসন থেকে ফিরে তিনি হয়ে ওঠেন বিপ্লবের মুখ।
গণবিপ্লব থেকে ইসলামি রাষ্ট্র
শাহের পতনের পর মানুষ আশা করেছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং ন্যায়বিচার। কিন্তু খুব দ্রুতই রাষ্ট্রের গতিপথ বদলে যায়। গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে ঘোষণা করা হয় ‘ইসলামিক রিপাবলিক’। নতুন সংবিধানে যুক্ত হয় ‘ভেলায়েত-ই-ফাকিহ’, যেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকে একজন ধর্মীয় নেতার হাতে। খোমেনি হয়ে ওঠেন সেই সর্বোচ্চ নেতা, যার হাতে বিচার, সামরিক এমনকি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণও কেন্দ্রীভূত হয়।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
বিপ্লবের পরপরই শুরু হয় বিরোধীদের সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া। বামপন্থী, উদারপন্থী এমনকি গণতন্ত্রপন্থীরাও ধীরে ধীরে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে বাদ পড়ে। গঠন করা হয় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড, যা শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়। গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয় কে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে, কে পারবে না। ফলে গণতন্ত্রের কাঠামো থাকলেও বাস্তবে ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে একক গোষ্ঠীর হাতে।
সামাজিক পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ
ইসলামি বিপ্লব শুধু রাজনৈতিক নয়, গভীর সামাজিক পরিবর্তনও নিয়ে আসে। নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাব, কঠোর পোশাকবিধি এবং ‘নীতি পুলিশ’ নাগরিকদের ব্যক্তিগত আচরণ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। এই নিয়ন্ত্রণের ভয়াবহ উদাহরণ মাহসা আমিনির মৃত্যু। তাঁর মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তোলে—এই বিপ্লব কি সত্যিই জনগণের স্বাধীনতা এনেছে?
অর্থনীতি ও বাস্তবতা
বিপ্লবের সময় যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল—ভূমি সংস্কার, শ্রম অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার—বাস্তবে তার বড় অংশই পূরণ হয়নি। ইরান-ইরাক যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতি—সব মিলিয়ে অর্থনীতি হয়ে পড়ে স্থবির। লাভবান হয় এক নতুন এলিট শ্রেণি, যারা ক্ষমতার কাছাকাছি।
প্রশ্ন হলো, কেন একটি গণবিপ্লব এমন পথে গেল?
প্রথমত, বিপ্লবের পর ক্ষমতার শূন্যতা দ্রুত পূরণ করেন ধর্মীয় নেতারা। দ্বিতীয়ত, বিরোধী শক্তিকে দমন করে একক মত প্রতিষ্ঠা করা হয়। তৃতীয়ত, ধর্মীয় বৈধতাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ী করা হয়। ফলে জনগণের আন্দোলন ধীরে ধীরে জনগণের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ইরানের ইসলামি বিপ্লব আমাদের শেখায়, সব বিপ্লবই স্বাধীনতার দিকে যায় না। কখনো কখনো বিপ্লবই নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদের জন্ম দেয়। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাষ্ট্রের কাঠামো যদি জবাবদিহিমূলক না হয়, তবে যেকোনো আদর্শই হয়ে উঠতে পারে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।
