“আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না।” — এই কথাটি বলেছেন শিশু রামিসার বাবা। সাত বছরের একটি মেয়ের ধর্ষণ ও হত্যার পর এই উচ্চারণ শুধু একটি পরিবারের যন্ত্রণার কথা নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি বহু বছরের জমে ওঠা অবিশ্বাসের প্রতিধ্বনি। সোশ্যাল মিডিয়া এখন সরব — কেউ দায় দিচ্ছেন পোশাককে, কেউ পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে, কেউ দাবি করছেন শরিয়া আইন চালু হলেই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু আসল প্রশ্নটা কি সেখানে?
ধর্ষণের আলোচনায় বারবার উঠে আসে নারীর পোশাকের প্রসঙ্গ। কিন্তু রামিসার বয়স ছিল মাত্র সাত। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় — সাত বছরের একটি শিশুর পোশাক কীভাবে ধর্ষণের কারণ হতে পারে? আর যদি পোশাককেই কারণ ধরা হয়, তাহলে পুরুষ ও শিশু ছেলেরা কেন বলাৎকারের শিকার হচ্ছে? পোশাকের যুক্তি এখানে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ বলছেন, ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি “যে সিস্টেম ধর্ষক তৈরি করছে, সেই সিস্টেমকেও ভাঙতে হবে।” তিনি এই সিস্টেমের তালিকায় রাখছেন পর্নোগ্রাফি, অবাধ যৌনতা, নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন এবং বিনোদনের নামে যৌন-উস্কানিকে। তাঁর যুক্তি — পর্নোগ্রাফি দেখে মানসিকভাবে বিকৃত হয়ে পড়া ব্যক্তি সামনে যাকে পায় তাকেই আক্রমণ করে, তাই বৃদ্ধা বা শিশুও রেহাই পায় না। কিন্তু এই যুক্তিও সম্পূর্ণ নয়। কারণ মানসিক বিকৃতি এবং সুযোগ ও ক্ষমতার অপব্যবহার — দুটো আলাদা বিষয়। পরিবার, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান — সব জায়গায় যে ধর্ষণ ঘটছে, তার সবটাকে শুধু পর্নোগ্রাফি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
ধর্ষণের বিচার প্রসঙ্গে একটি বড় অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় শরিয়া আইন চালুর দাবি তুলছেন। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কটি শুরু হয়। ফেসবুকে “মানুষ কিশোর” নামের একজন সরাসরি বলছেন, “শরিয়া আইনে ধর্ষণের বিচার করা যায় না। ধর্ষককে শাস্তি দিতে হলে প্রাপ্তবয়স্ক চারজন প্রত্যক্ষ চাক্ষুষ সাক্ষী লাগবে। কোনো ধর্ষক কি চারজন সাক্ষী দাঁড় করিয়ে রেখে ধর্ষণ করে?” এই প্রশ্নটি অযৌক্তিক নয়।
দ্য ডিসেন্টের সম্পাদক কদরুদ্দিন শিশির আরও স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করেছেন — রামিসার ঘটনায় অপরাধস্থলে দুইজন অপরাধী ছাড়া আর কেউ ছিল না। প্রচলিত শরিয়া বিচার পদ্ধতি অনুযায়ী হদ (নির্ধারিত শাস্তি) আরোপ করতে হলে চারজন সাক্ষী অথবা স্বীকারোক্তি প্রয়োজন। তিনি বলছেন, “আধুনিক প্রযুক্তির কারণে স্বীকারোক্তি বা চার প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়াও ধর্ষণ সংগঠিত হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা সম্ভব। অর্থাৎ, রেপিস্টের অপরাধ প্রমাণ করতে এখনই প্রচলিত শরিয়া আইনের মানদণ্ডের বাইরে যেতে হচ্ছে।”
লেখক ও গবেষক পারভেজ আলম এই প্রসঙ্গে সৌদি আরবের উদাহরণ টেনেছেন। তাঁর মতে, সৌদি আরবে বাংলাদেশি গৃহকর্মীদের ধর্ষণকে ধর্ষণ হিসেবেও বিবেচনা করা হয় না। এ পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশি নারীর ধর্ষণ ও হত্যার বিচার হয়েছে সৌদি আরবে — তা খুঁজলেই সালাফি শরিয়াবাদীদের নৈতিকতার চিত্রটা স্পষ্ট হয়। জামাতি-কওমি তথা সালাফিদের কথিত শরিয়তের অধীনে অধিকাংশ ধর্ষণ ধর্ষণ হিসেবেই স্বীকৃত হবে না। মাদ্রাসায় ধর্ষণের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এদের তথাকথিত শরিয়তি নৈতিকতা কোনো কাজে আসে না।
লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট বাকী বিল্লাহ বলছেন, শরিয়া আইন চালু হলে ধর্ষণ হবে না — কথাটা একদিক থেকে ঠিকই আছে। কারণ এরা ধর্ষণের শিকার সকল নারীকে ‘দাসী’ ক্যাটাগরিতে ফেলে দেবে, ফলে তার বয়স সাত নাকি সতেরো — সেটা আর বিবেচ্য থাকবে না। তাঁর মতে, সৌদি শাসকদের আইনি কাঠামোর অপভ্রংশ থেকে আইসিস হয়ে যে শরিয়া আইন বাংলাদেশের একটি অংশের মাথায় গেঁথে আছে, তার সঙ্গে ইসলামের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।
বাংলাদেশের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। ধর্মীয় শিক্ষা, মসজিদ, মাদ্রাসা সর্বত্র বিস্তৃত। তারপরও ধর্ষণের ঘটনা থামছে না। এমনকি মাদ্রাসার ভেতরেও শিশু যৌন নিপীড়নের খবর আসছে। তাহলে শুধু শরিয়া আইনের নাম নিলেই কি সমাজ পরিবর্তন হবে? বাকী বিল্লাহ সতর্ক করছেন ভিন্ন দিক থেকেও। তিনি বিউটি হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ দিয়ে দেখাচ্ছেন, দ্রুত বিচারের চাপে প্রকৃত অপরাধী বেঁচে যেতে পারে আর নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি পেতে পারে। ২০১৮ সালে কিশোরী বিউটির হত্যা মামলায় যাকে সবাই ধর্ষক ভেবে ফাঁসির দাবি করছিল, পরে দেখা গেল বিউটিকে তার নিজের পরিবারই হত্যা করেছে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে।
নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান সমস্যাটা সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে বলেছেন — “আমাদের দেশে বিচার হয় না — এটা সত্য। কিন্তু সেটা আইনের স্বল্পতার কারণে যতটা, তার চেয়ে বেশি আইনের প্রয়োগ ও প্রক্রিয়া অনুসরণে লোকবলের অভাব এবং বিচার বিভাগকে দুর্বল করে রাখার রাজনৈতিক কারণই প্রধান।” বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচারের জন্য আইন আছে — নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সমস্যা আইনে নয়, সমস্যা প্রয়োগে। মামলা দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়, সাক্ষীকে ভয় দেখানো হয়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়।
সাংবাদিক শাহনাজ শারমিন লিখেছেন — তনু থেকে আছিয়া, এরপর রামিসা। আপনি কার কথা বলবেন? আছিয়াকে মনে রেখেছেন? মেয়েকে চার বছর বয়সে শেখাতে হয়েছে ভালো ও খারাপ স্পর্শের পার্থক্য। নিজের বাড়িতে থেকেও সিঁড়িতে একা নামতে দিই না। পাখির ছানার মতো ডানা দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। চাকরিজীবী মা হিসেবে তাই আরও সাবধান থাকি। বাসায় সিসি ক্যামেরা রাখি। আর কী করব বলুন, কন্যাশিশুটিকে সুরক্ষিত রাখতে? আমি, আমার মেয়ে, আপনার মেয়ে, বোন, বান্ধবী — এই দেশের নারীরা কি খুব বেশি কিছু চেয়েছিল রাষ্ট্রের কাছে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ — না, বেশি কিছু চাওয়া হয়নি। শুধু নিরাপদ থাকার অধিকার চাওয়া হয়েছে।
শরিয়া আইন বনাম প্রচলিত আইনের বিতর্কে একটা বিষয় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে — যে আইনই থাকুক না কেন, প্রয়োগ না হলে তা কাগজেই লেখা থাকে। আজ দরকার দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং নিশ্চিত শাস্তি। ধর্ষণকে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় এজেন্ডায় ব্যবহার না করে রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ করাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি কাজ।
