Written by 10:41 am জাতীয় Views: 6

সংসদের যেসব ভাষা না জানলে বিপদ!

সংসদের কার্যক্রম বোঝার জন্য জানা প্রয়োজন এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা— ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে শুরু করে ফ্লোর ক্রসিং, কোরাম, গিলোটিন পর্যন্ত সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

শুধু জনপ্রতিনিধিরাই নন, যারা ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচন করেছেন সেই সাধারণ মানুষের মধ্যেও সংসদের কাজ কীভাবে চলে তা নিয়ে ব্যাপক কৌতুহল আছে। সংসদে কীভাবে আইন প্রণয়ন হয়, কীভাবে বিতর্ক পরিচালিত হয় কিংবা সংসদের ভেতরে কোনো সংকট তৈরি হলে কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, এসব বোঝার জন্য প্রচলিত টার্ম বা পরিভাষাগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলুন জানি  সংসদের প্রচলিত সেই সব শব্দমালার ব্যখ্যা।

প্রথমেই আসা যাক‘ট্রেজারি বেঞ্চ’প্রসঙ্গে। সংসদ কক্ষের স্পিকারের ডান দিকে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্য ও সরকারি দলের এমপিরা যেখানে বসেন, তাই ট্রেজারি বেঞ্চ। মূলত সরকার পক্ষ  এই আসনে বসে রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতি নির্ধারণের আলোচনা করেন। এটি মূলত সরকারি দলের শক্তি ও অবস্থানকে নির্দেশ করে।

‘ফ্লোর’ পাওয়া বা নেওয়া 

সংসদীয় আলোচনায় প্রায়ই শোনা যায়‘ফ্লোর’ পাওয়া বা নেওয়া। সংসদে কোনো সদস্য স্পিকারের অনুমতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেলে তাকে ‘ফ্লোর পাওয়া’ বলে। স্পিকার যাকে ফ্লোর দেবেন, শুধু তিনিই কথা বলবেন। ফ্লোর পাওয়া সদস্যকে অন্য কেউ বাধা দিতে পারবেন না, যদি না নিয়মতান্ত্রিক কোনো প্রশ্ন ওঠে। 

‘ফ্লোর ক্রসিং’

সংসদীয় গণতন্ত্রে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং গুরুত্বপূর্ণ টার্ম হলো ‘ফ্লোর ক্রসিং’।যখন কোনো সংসদ সদস্য তার নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অন্য দলের পক্ষে ভোট দেন বা নিজের দল ত্যাগ করে অন্য দলে যোগ দেন, তখন তাকে ফ্লোর ক্রসিং বলা হয়।বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ফ্লোর ক্রসিং করলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়।

‘কোরাম’

সংসদ অধিবেশন সচল রাখার প্রাথমিক শর্ত হলো ‘কোরাম’। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, ৩০০ আসনের এই জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অন্তত ৬০ জন সদস্য উপস্থিত না থাকলে কোরাম পূর্ণ হয় না। কোরাম না থাকলে স্পিকার অধিবেশন শুরু করতে পারেন না কিংবা মাঝপথে কোরাম সংকট দেখা দিলে স্পিকার অধিবেশন স্থগিত করতে বাধ্য হন।

‘নোটিশ’

সংসদীয় কার্যক্রমের একদম প্রাথমিক একটি ধাপ হলো ‘নোটিশ’। কোনো সংসদ সদস্য সংসদে প্রশ্ন করতে, প্রস্তাব আনতে বা বিল উত্থাপন করতে চাইলে আগেভাগে স্পিকারকে লিখিতভাবে জানাতে হয়। একেই নোটিশ বলে। এই নোটিশের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হয় কবে কোন বিষয়ে আলোচনা হবে।

‘প্রশ্নোত্তর পর্ব’

সংসদে জনগণের কথা বলার অন্যতম প্রধান সুযোগ হলো‘প্রশ্নোত্তর পর্ব’। এখানে দুই ধরণের প্রশ্ন থাকে—‘তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন’ এবং ‘তারকা চিহ্নবিহীন প্রশ্ন’। যদি কোনো সদস্য তার প্রশ্নের উত্তর মৌখিকভাবে সংসদের ফ্লোরে পেতে চান, তবে তিনি সেই প্রশ্নে একটি তারকা চিহ্ন যুক্ত করেন। আর যদি তিনি কেবল লিখিত উত্তর চান, তবে সেটি হয় তারকা চিহ্নবিহীন প্রশ্ন। 

‘সম্পূরক প্রশ্ন’

মন্ত্রীর উত্তরের পর যদি কোনো সদস্য মনে করেন যে তথ্যটি অসম্পূর্ণ বা আরও গভীরে যাওয়া প্রয়োজন, তবে তিনি ‘সম্পূরক প্রশ্ন’ বা সাপ্লিমেন্টারি কোশ্চেন করতে পারেন।  স্পিকারের অনুমতি নিয়ে মূল প্রশ্নের সাথে প্রাসঙ্গিক এই অতিরিক্ত প্রশ্নটি করা হয়। এর মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ের লুকানো তথ্য বের করে আনা সম্ভব হয়। .

‘বেসরকারি সদস্য বিল’

সংসদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্ম ‘বেসরকারি সদস্য বিল’।সাধারণত সরকার বা মন্ত্রীদের আনা বিল হচ্ছে সরকারি বিল । কিন্তু কোনো সাধারণ সংসদ সদস্য, যদি কোনো নতুন আইন বা বিদ্যমান আইনের সংশোধনী প্রস্তাব আনেন, তবে তাকে বেসরকারি সদস্য বিল বলা হয়। যার  মাধ্যমে একজন বিরোধী দলীয় সদস্যও দেশের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায়  ভূমিকা রাখেন।

‘পয়েন্ট অব অর্ডার’

সংসদীয় বিতর্কের শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যবহৃত শব্দ হচ্ছে ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’। সংসদের নিয়মকানুন বা কার্যপ্রণালী ভঙ্গ হচ্ছে মনে হলে কোনো সদস্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এটি উত্থাপন করেন। এর জন্য আগে থেকে নোটিশ লাগে না। তবে এতে শুধু সভার নিয়মভঙ্গ সংক্রান্ত বিষয়েই কথা বলা যায়। 

‘ছাঁটাই প্রস্তাব’

বাজেট বা অর্থ বরাদ্দের সময় যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, তা হলো ‘ছাঁটাই প্রস্তাব’ বা কাট মোশন। কোনো মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় বা বরাদ্দের বিরোধিতা করে বিরোধী দল এই প্রস্তাব আনে। 

‘এক্সপাঞ্জ’ 

সংসদ অধিবেশনের শালীনতা বজায় রাখতে স্পিকারের হাতে একটি বিশেষ ক্ষমতা থাকে, যাকে বলা হয়‘এক্সপাঞ্জ’। কোনো সদস্য সংসদে অশালীন, কুরুচিপূর্ণ বা অসংসদীয় শব্দ ব্যবহার করলে স্পিকারের নির্দেশে তা রেকর্ড থেকে মুছে ফেলা হয়। একেই এক্সপাঞ্জ বলে। এক্সপাঞ্জ হওয়া কথা সরকারি নথিতে থাকে না এবং কোনো মাধ্যমে তা প্রকাশ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। 

‘ওয়াকআউট’

এরপর যে শব্দটি বর্তমান সংসদে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তা হলো‘ওয়াকআউট’। কোনো বিল, রাষ্ট্রপতির ভাষণ বা স্পিকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে সংসদ কক্ষ থেকে সদস্যদের প্রতীকীভাবে বেরিয়ে যাওয়াকে ওয়াকআউট বলে। সংসদীয় গণতন্ত্রে অসন্তোষ ও ভিন্নমত প্রকাশের এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

‘মুলতবি প্রস্তাব’

সংসদের কাজ স্থগিত করে জরুরি কোনো বিষয়ে আলোচনার নামই হলো ‘মুলতবি প্রস্তাব’বা অ্যাডজার্নমেন্ট মোশন। যদি দেশে কোনো আকস্মিক বড় দুর্ঘটনা বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, তবে সংসদের স্বাভাবিক কাজ থামিয়ে সেই বিষয়ে আলোচনার জন্য এই প্রস্তাব আনা হয়।  

‘গিলোটিন’ 

সংসদে আলোচনার সময় ফুরিয়ে গেলে ব্যবহৃত হয় ‘গিলোটিন’নামক শব্দ। যখন বাজেট বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিলের ওপর অনেকগুলো সংশোধনী বা ছাঁটাই প্রস্তাব জমা পড়ে কিন্তু সময় কম থাকে, তখন কোনো আলোচনা ছাড়াই সব প্রস্তাব একত্রে ভোটে দেওয়া হয়। 

‘কণ্ঠভোট’

সবশেষে আসা যাক ‘কণ্ঠভোট’ প্রসঙ্গে। সংসদে কোনো বিলে স্পিকার যখন ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলতে বলেন, তখন তাকে কণ্ঠভোট বলে। কণ্ঠভোটে জয়-পরাজয় অস্পষ্ট হলে শুরু হয় বিভক্তি ভোট। তখন সদস্যরা লবিতে গিয়ে নাম সই করে ভোট দেন, ফলে প্রতিটি ভোট আলাদাভাবে গোনা যায় এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।

Visited 6 times, 1 visit(s) today
Close