Written by • 11:30 am• আন্তর্জাতিক, আর্টিকেল, ইতিহাস, পড়ুন • Views: 1

আব্দুল মালিক আল-হুতি কে? রহস্যময় হুতি নেতার উত্থান

জনসমক্ষে প্রায় আসেন না, তবু লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ আর মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে তাঁর প্রভাব বিশাল। হুতিপ্রধান আব্দুল মালিক আল-হুতির জীবন, রহস্য ও উত্থানের গল্প।

একজন রহস্যময় ব্যক্তি নেতৃত্ব দিচ্ছেন একটি যুদ্ধংদেহী বাহিনীর। যদিও টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর চেহারা খুব একটা দেখা যায় না। মাঝেমধ্যে প্রচারিত কিছু ভাষণে কোমরের বেল্টে ঐতিহ্যবাহী ইয়েমেনি খঞ্জর ‘জাম্বিয়া’ গোঁজা অবস্থায় দেখা যায় তাঁকে। বলছি আব্দুল মালিক আল-হুতির কথা। যিনি লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালির মতো বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রধান পথ আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, যাঁর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কাঁপিয়ে দিচ্ছে আঞ্চলিক পরাশক্তিদের! কিন্তু একটি পাহাড়ি উপজাতীয় গোষ্ঠীকে কীভাবে শক্তিশালী যুদ্ধক্ষম বাহিনীতে রূপান্তর করলেন তিনি? কে এই ব্যক্তিত্ব আব্দুল মালিক আল-হুতি?

ধারণা করা হয়, আব্দুল মালিক আল-হুতি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে উত্তর ইয়েমেনের সাদাহ গভর্নরেটে জন্মগ্রহণ করেন। ইয়েমেনের অনেক গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, আব্দুল মালিক ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাবা বদর আল-দিন আল-হুতির খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাবা ধর্ম, ধর্মতত্ত্ব এবং কবিতার ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষার বিষয়টি নিজে তদারকি করতেন।

ইয়েমেনি সংবাদমাধ্যম সুহাইল টিভি (Suhail TV) বলছে, আব্দুল মালিক আল-হুতির জীবনযাপন পরম রহস্যময়। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী যুদ্ধনেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো জনসমক্ষে আসেন না। এমনকি যেসব বিদেশি প্রতিনিধি বা কূটনীতিক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, তাঁদেরও সরাসরি তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ নেই।

যাঁরা তাঁর সাক্ষাৎ পান, তাঁদের অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্য দিয়ে হুতিদের শক্ত ঘাঁটি সানার গোপন আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ পর্যন্ত যাঁরা দেখা পেয়েছেন, একটি নিরাপত্তা কনভয় তাঁদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেত এবং কড়া নিরাপত্তা তল্লাশি চালাত। এরপর তাঁদের দোতলার একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হতো, আর আব্দুল মালিক আল-হুতি ভেসে উঠতেন একটি ডিজিটাল স্ক্রিনে! বিমান হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ভয়ে তিনি ক্রমাগত নিজের গোপন আস্তানা পরিবর্তন করেন। তাঁর মূল পরিচিত মুখ হিসেবে মিডিয়ায় কথা বলেন সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে, তবে নেপথ্যের পুরো কলকাঠি নাড়েন মালিক নিজেই।

আব্দুল মালিক আল-হুতি শিয়া ইসলামের একটি শাখা জায়দি সম্প্রদায়ের অনুসারী। তাঁর সংগঠনটি ছিল ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র জায়দি গোষ্ঠী, যারা শিয়া সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায় সশস্ত্র সংগ্রামে যুক্ত ছিল। কিন্তু হুতি আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন তাঁর আপন বড় ভাই হুসেন আল-হুতি, যিনি জায়দি শিয়াদের অধিকার রক্ষায় ‘সাবাব আল মুমিনিন’ নামের সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ২০০৪ সালে ইয়েমেনি বাহিনী আব্দুল মালিকের বড় ভাই হুসেন আল-হুতিকে হত্যা করে। ভাইয়ের মৃত্যুর পরও ভেঙে পড়েননি আব্দুল মালিক। উল্টো ২০০৬ সালে মাত্র ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সে পুরো আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং ভাইয়ের নামানুসারে এই গোষ্ঠীর নাম দেন ‘আল-হুতি’, আর এই হুতি গোষ্ঠীই আনসারুল্লাহ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তারপর?

তারপর থেকেই শুরু হয় হুতিদের একচ্ছত্র উত্থানের গল্প। যা আজ আমেরিকা, ইসরায়েল কিংবা তেলসমৃদ্ধ পরাশক্তি সৌদি আরবকে ঝাঁকুনি দিয়েছে। ইয়েমেনি বাহিনীর একাধিক অভিযান, এমনকি ‘অপারেশন স্কর্চড আর্থ’-এর মতো সর্বাত্মক হামলা সহ্য করেও টিকে আছেন আব্দুল মালিক আল-হুতি। ২০০৯ সালের এক বিমান হামলায় তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হুতি গোষ্ঠী এই দাবি অস্বীকার করে। পরে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক জোট গঠিত হলে এই পুরো সময়জুড়ে আব্দুল মালিক আল-হুতি বিভিন্ন টেলিভিশন ভাষণ ও বার্তার মাধ্যমে সৌদি নেতৃত্বাধীন হামলার নিন্দা জানান এবং সামরিক পাল্টা পদক্ষেপের হুমকি দেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যুদ্ধে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে তারা বাব আল-মানদেব বাণিজ্যপথ অবরোধের ঘোষণা দেয়, সৌদি জাহাজগুলোর ওপর হামলা চালায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের চলমান অভিযানের গতিপথও বদলে দিতে পারে হুতিরা।

আব্দুল মালিক আল-হুতি এক উপজাতীয় গোষ্ঠীকে রূপান্তর করেন ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং নিজস্ব অস্ত্রাগারে সজ্জিত সামরিক শক্তিতে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ, সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের পতন কিংবা সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বছরের পর বছর ধরে চালানো বিমান হামলা প্রতিহত করে হুতিরা আজ লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপথ নির্ধারণ করছে। তবে কি একসময় অবহেলিত ও কোণঠাসা জায়দি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই আজ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সামরিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে? প্রশ্ন হলো, কোমরে ‘জাম্বিয়া’ গোঁজা সেই রহস্যময় কমান্ডার আব্দুল মালিক আল-হুতির এই প্রভাব লোহিত সাগরের উত্তাল তরঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যকে কোন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

  • 0
  • 0
  • 0
  • 0
Visited 1 times, 1 visit(s) today
↑
Close