মার্কিন কোম্পানি বোয়িং থেকে নতুন করে আরও এগারোটা আর ইউরোপীয় কোম্পানি এয়ারবাস থেকে দশটা বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। এসব কেনাকাটা নিয়ে সরকারের বক্তব্য হলো, বাংলাদেশকে ইন্টারন্যাশনাল এভিয়েশন হাব বানানো হবে। যে দেশের জাতীয় বিমান সংস্থার বহরে মোটে উনিশটা উড়োজাহাজ আছে, তার মধ্যে আবার দুইটা অচল, অর্থাৎ বাস্তবে অপারেশনে কাজে লাগানো যায় সতেরোটা। যাদের যাত্রীদের নব্বই ভাগই মধ্যপ্রাচ্যগামী রেমিট্যান্স যোদ্ধা, সেই দেশ হঠাৎ করে দুবাই কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো ট্রানজিট হাব কীভাবে হবে? বিমান বাংলাদেশ যেখানে বছরের পর বছর সময়মতো শিডিউল রক্ষা আর লাগেজ ফেরত দিতেই হিমশিম খায়, তারা এই শতকোটি ডলারের বিশাল ফ্লিট সামলাবে কীভাবে? আর দেশে যখন জ্বালানি সংকট এত তীব্র, মূল্যস্ফীতির সংকটও চলছে সমান তালে, সেই মুহূর্তে কেন এত বড় কেনাকাটা? কেনই বা এত তাড়াহুড়া?
২৯ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হলো, সরকার এয়ারবাসের সঙ্গে দশটি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করতে যাচ্ছে (The Bangladesh Monitor, 29 September 2026)। অক্টোবর মাসেই এই আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হওয়ার কথা জানালেন খোদ মন্ত্রী (BSS News, 29 September 2026)। এর মধ্যে থাকবে চারটি ওয়াইডবডি এ৩৫০-৯০০ আর ছয়টি ন্যারোবডি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ (The Daily Star, 29 September 2026)।
আমরা জানি, সেপ্টেম্বর মাসেই মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও এগারোটি বিমান কেনার চুক্তি সই হয় (The Business Standard, 29 September 2026)। মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, শুধু এই এগারোটা বোয়িংয়ের পেছনেই খরচ হচ্ছে প্রায় দুই দশমিক সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ৩৩,২১৬ কোটি টাকারও বেশি (The Bangladesh Monitor, 29 September 2026)। এর আগে চলতি বছর এপ্রিল মাসেও চৌদ্দটি বোয়িং কেনার প্রাথমিক সমঝোতা হয়। অর্থাৎ বোয়িংয়ের কাছেই বিমানের অর্ডার পাইপলাইনে রয়েছে পঁচিশটি উড়োজাহাজ (UNB, 29 September 2026)। এবার তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে এয়ারবাসের দশটি। তার মানে সব মিলিয়ে নতুন উড়োজাহাজের মোট সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে পঁয়ত্রিশে। বোয়িংয়ের বিমান ডেলিভারি শুরু হবে ২০৩১ সাল নাগাদ, তবে সরকার চেষ্টা করছে ২০২৭ বা ২০২৮ সালের মধ্যেই অন্তত একটা বিমান বুঝে পেতে (The Bangladesh Monitor, 29 September 2026)।
তো, এই বিপুল কেনাকাটার পক্ষে সরকারের ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা হলো: এভিয়েশন হাব। অবশ্য এভিয়েশন হাবের আলাপ নতুন না। ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাবে পরিণত করার স্বপ্ন ২০২৩ সালের ২২ মার্চ আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সামিটে শেখ হাসিনাও দেখিয়েছিলেন (bdnews24.com, 28 September 2026)। এরপর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের সফট ওপেনিংয়ে তিনি আবার একই কথা বলেন। তখনও এই কথার জেরে সমালোচনা হয়, কারণ অনেকেই ভাবেন, এ রকম দোহাই দিয়ে সরকারগুলো বিভিন্ন সমঝোতা করে, যার খেসারত দিতে হয় জনগণের পয়সা দিয়ে (Dhaka Tribune, 7 October 2023)।
আচ্ছা, এবার আমরা একটু বুঝতে চেষ্টা করি, এভিয়েশন হাব জিনিসটা কী? ইন জেনারেল আমরা ভাবতে পারি, একটা চকচকে কাঁচঘেরা টার্মিনাল বানালাম আর ডজনখানেক নতুন বিমান রানওয়েতে নামালাম, ব্যস, হাব হয়ে গেল! ব্যাপারটা কি এত সহজ? না। গ্লোবাল এভিয়েশনে দুবাই, দোহা বা সিঙ্গাপুরকে যে আমরা হাব বলি, তারা নিজেদের দেশের লোকাল যাত্রীদের ওপর ভর করে চলে না। তাদের আশি থেকে নব্বই ভাগ ব্যবসাই ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার। এক দেশ থেকে এসে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে আরেক দেশের কানেক্টিং ফ্লাইটে উঠে যাওয়া। বিমানের সাবেক পরিচালক এবং এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম গণমাধ্যমে এ ব্যাপারে বলেছেন, একটি চমৎকার টার্মিনাল ভবন হাবের একটা অনুষঙ্গ হতে পারে, কিন্তু শুধু একটা সুন্দর বিল্ডিং দিয়ে হাব তৈরি অসম্ভব (bdnews24.com, 28 September 2026)। হাব হতে গেলে লাগে সুপারফাস্ট গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ফিফথ ফ্রিডম ট্রাফিক রাইটস, অন অ্যারাইভাল ট্রানজিট ভিসা এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একটা হোম ক্যারিয়ার।
এবার রিয়েলিটি চেক করি। ঢাকার আন্তর্জাতিক রুটের প্যাসেঞ্জার কারা? আমাদের ট্রাফিকের সিংহভাগই হলো পয়েন্ট টু পয়েন্ট। অর্থাৎ আমাদের প্রবাসী শ্রমিক ভাইয়েরা সৌদি, কাতার কিংবা মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন, অথবা যুক্তরাজ্য ও কানাডা থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে আসছেন। অথবা চিকিৎসা ও ব্যবসার কাজে আমরা কলকাতা, ব্যাংকক বা গুয়াংঝু যাচ্ছি। এখন প্রশ্ন হলো, একজন ইউরোপীয় বা অস্ট্রেলীয় ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার কেন তার কানেক্টিং রুটে দুবাই, কাতার বা সিঙ্গাপুরের মতো বিশ্বমানের এয়ারলাইন্স ছেড়ে ঢাকায় এসে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করবেন? আমাদের বিমানবন্দরের লাগেজ খালাস আর ইমিগ্রেশনের যে চিত্র, সেখানে বিদেশি ট্রানজিট ট্রাফিক আকৃষ্ট করার মতো কী সুবিধা আমরা দিতে পারব?
দ্বিতীয় বড় সমস্যা মেইনটেন্যান্স ও টেকনিক্যাল জটিলতা। বিমানের বহর শুরু থেকেই বোয়িংকেন্দ্রিক। তাদের বহরে ৭৭৭ আছে, ড্রিমলাইনার ৭৮৭ আছে, ৭৩৭ আছে। এখন এই বোয়িং ফ্লিটের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে এয়ারবাস। এভিয়েশন পরিভাষায় যাকে বলে মিক্সড ফ্লিট। বিভিন্ন তথ্য ঘাঁটাঘাঁটি করে যা দেখলাম, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিক্সড ফ্লিট শুনতে খুব আধুনিক মনে হলেও মিক্সড ফ্লিট চালানো একটা অপারেশনাল দুঃস্বপ্ন। কারণ বোয়িং আর এয়ারবাসের টেকনোলজি একদম আলাদা। ফলে আপনাকে দুই সেট আলাদা পাইলট তৈরি করতে হবে, আলাদা লাইসেন্সধারী গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার রাখতে হবে, একদম আলাদা ফ্লাইট সিমুলেটর বসাতে হবে এবং কোটি কোটি ডলার খরচ করে দুইটা আলাদা কোম্পানির স্পেয়ার পার্টসের ইনভেন্টরি মেইনটেইন করতে হবে।
ফাঁকে, একটা ইন্টারেস্টিং ইনফরমেশন শেয়ার করি। ২০২৪ সালের মে মাসে বিমানের টেকনো ফিনান্সিয়াল ইভ্যালুয়েশন কমিটির অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এয়ারবাসের এ৩৫০ বিমান কেনা কোনোভাবেই আর্থিকভাবে লাভজনক নয় (The Business Standard, 27 May 2024)। সেই মূল্যায়ন কমিটি হিসাব করে দেখিয়েছিল, চড়া সুদ এবং বিনিয়োগের খরচের কারণে পরবর্তী পঁচিশ বছর ধরে এই বিমানের নেট ক্যাশ ফ্লো নেতিবাচক থাকবে (The Business Standard, 27 May 2024)। প্রশ্ন হলো, যে কেনাকাটাকে বিমানের নিজস্ব বিশেষজ্ঞরা দুই বছর আগে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করেছিলেন, সেই একই বিমান কেনার সিদ্ধান্ত এখন কোন নতুন সমীক্ষার ভিত্তিতে নেওয়া হলো?
আরেকটা ইস্যু হলো, বাংলাদেশে বিমানের প্রধান জ্বালানি অর্থাৎ জেট ফুয়েল সরবরাহ করে রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা অয়েল। তাদের একচেটিয়া ব্যবসার কারণে ঢাকায় জেট ফুয়েলের দাম কলকাতা কিংবা ব্যাংককের চেয়ে সবসময়ই অনেক বেশি। আবার বিমানবন্দরের অ্যারোনটিক্যাল চার্জও অনেক বেশি (bdnews24.com, 28 September 2026)। তো, যেখানে দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই তেল আর চার্জের খরচে টিকতে পারে না, সেখানে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো ঢাকাকে ট্রানজিট হাব বানিয়ে তেল কিনতে আসবে কেন?
সবশেষে টাকার অঙ্ক আসবে, এটাই স্বাভাবিক। দেখেন, স্বাভাবিকভাবে এভিয়েশন হাব হলো বিশ থেকে ত্রিশ বছরের মেগা প্ল্যান। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, কয়েক মাসের ব্যবধানে শতকোটি ডলারের চুক্তি সই করার তাড়া। শুধু এগারোটা বোয়িং কিনতেই যেখানে খরচ হচ্ছে দুই দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার (The Bangladesh Monitor, 29 September 2026), সেখানে দশটা এয়ারবাসসহ পঁয়ত্রিশটা উড়োজাহাজের মোট দায় দাঁড়াবে বহু বিলিয়ন ডলারে। তো, যখন দেশের মানুষ মূল্যস্ফীতিতে নাকাল, ডলারের অভাবে কয়লা আর গ্যাস আমদানির দেনা পরিশোধে সরকারকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার শর্ত মানতে হচ্ছে, তখন এই বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণের গ্যারান্টার আল্টিমেটলি কে হবে?
আমাদের আলাপটা যদি এক জায়গায় করি, তাহলে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর এই মুহূর্তে জরুরি:
আমরা কি বাস্তবমুখী বাণিজ্যিক চাহিদার ভিত্তিতে এভিয়েশন হাব বানাতে যাচ্ছি, নাকি ওয়াশিংটন আর প্যারিসের মধ্যকার কূটনৈতিক টানাপোড়েনে দুই পক্ষকেই খুশি রাখার একটা ব্যয়বহুল জিওপলিটিক্যাল খেলা খেলছি?
একটা এভিয়েশন হাবের ভিত্তি যেখানে সাশ্রয়ী জ্বালানি, উন্নত গ্রাউন্ড সার্ভিস, দক্ষ ট্রানজিট নেটওয়ার্ক আর ওপেন স্কাই পলিসি, সেখানে এই মৌলিক ত্রুটিগুলো রেখে শুধু শতকোটি ডলারের নতুন উড়োজাহাজ কেনার কারণ কী?
আমাদের জাতীয় বিমান সংস্থা প্রতি বছর নিয়মিত হজের মৌসুমে অথবা যাত্রীচাপের দিনে বিমান লিজ না এনে যেখানে চলতে পারে না, তারা হঠাৎ করে এই পঁয়ত্রিশটি ওয়াইডবডি আর ন্যারোবডি বিমানের অপারেশনাল ও মেইনটেন্যান্স খরচ নিজেদের পকেট থেকে জোগাবে কী করে?
একটা এভিয়েশন হাব মানে তৃতীয় দেশের ট্রানজিট যাত্রী ঢাকায় নামবে এবং কানেক্টিং ফ্লাইটে অন্য কোথাও যাবে। সেই আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ঢাকায় টেনে আনবে কোন এয়ারলাইন? ট্রানজিট ভিসা সহজ করা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খরচ কমানো কিংবা একটিমাত্র রানওয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা আছে কি?
বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স আর নতুন এয়ারবাসের আলাদা ইঞ্জিনিয়ার ও খুচরা যন্ত্রাংশের লজিস্টিক অবকাঠামো কে তৈরি করছে, কবে নাগাদ প্রস্তুত হবে? দুটি ভিন্ন প্রস্তুতকারকের মিশ্র বহর পরিচালনার বিপুল বাড়তি খরচের হিসাব কে করেছে?
দেশে যখন ডিজেল ১৩৫ টাকা, মূল্যস্ফীতি আটের ওপরে এবং বিপিসির লোকসান ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি, তখন বিমান কেনার এই বিপুল আর্থিক দায় দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে কোথাও মিলিয়ে দেখা হয়েছে কি?
- 0
- 0
- 0
- 0
