গণতন্ত্র নিয়ে আমরা খুব সিরিয়াস। সিরিয়াস হওয়া দরকারও। তো, সংসদীয় গণতন্ত্রে ইলেকশন হলো মেজরিটির রায় বোঝার উপায়, অর্থাৎ মেজরিটি কাদের সমর্থন করে, কারা সরকার চালাবে। কিন্তু ব্যাপারটা মনে হয় এত সরল না। মানে, বলতে চাচ্ছি যে পৃথিবীতে এই মুহূর্তে এক্সিস্টিং এমন কোনো ভোটিং সিস্টেম নাই, যেই সিস্টেম ভোটারদের শতভাগ ফেয়ারনেস এনশিওর করতে পারে। এইটা আমাদের ক্লেইম না; যার ক্লেইম, উনি এই ক্লেইম প্রমাণ করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তো, কেন কোনো ভোটিং সিস্টেমই পারফেক্ট না, চলেন এইটা বোঝার চেষ্টা করি।
প্রথমে আমরা একটু হিস্ট্রি দেখি, মানুষ ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচন করা শুরু করল কবে থেকে। হিস্ট্রি বলছে, প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স শহরে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে প্রথম এই ভোটাভুটির আইডিয়া চালু হয়। মানুষ একটা নির্দিষ্ট জায়গায় জড়ো হতো, জড়ো হয়ে হাত তুলে সমর্থন জানাইতো, অথবা নুড়িপাথর পাত্রে ফেলে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানাইতো। তো, দিন দিন যখন মানুষ বাড়তে থাকল, মানে জনসংখ্যা বাড়তে থাকল, তখন এই ডিরেক্ট ভোটিং আর পসিবল হচ্ছিল না।
সেখান থেকেই শুরু হলো রিপ্রেজেন্টেটিভ ডেমোক্রেসি, অর্থাৎ প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র। মানে, আমরা ভোট দিয়ে একজনরে নেতা বানাবো, সে আমাদের হয়ে ডিসিশন নেবে। তখন আসলো ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ ভোটিং সিস্টেম। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য, এইসব দেশে এখনো এই সিস্টেমটাই চলে। খুবই সোজা নিয়ম: যে ক্যান্ডিডেট সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে, সে-ই উইনার।
সবকিছু ঠিকঠাকই চলতেছিল, কিন্তু ফরাসি বিপ্লবের কয়েক বছর আগে, ১৭৮৫ সালে মার্কুইস ডি কন্ডরসেট নামের একজন ফ্রেঞ্চ ম্যাথমেটিশিয়ান দেখলেন, এই ভোটিং সিস্টেমে তো একটা বাগ আছে! মানে, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়! কী সেই বাগ? ধরেন, একটা ইলেকশনে তিনটা দল আছে—বিএনপি, আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টি। এখন ভোটারদের ভোটিং প্যাটার্ন অ্যানালাইসিস করে দেখা গেল, দেশের বেশিরভাগ মানুষ আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপিকে বেশি পছন্দ করে। আবার জাতীয় পার্টির চেয়ে আওয়ামী লীগকে বেশি পছন্দ করে। তাহলে সাধারণ লজিক কী বলে? যেহেতু বিএনপি আওয়ামী লীগ থেকে আগায়ে, আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি থেকে আগায়ে; তার মানে জনগণ অবশ্যই জাতীয় পার্টির চেয়ে বিএনপিকে বেশি পছন্দ করবে। কিন্তু কন্ডরসেট অংক করে বলতেছেন, প্র্যাকটিক্যাল ভোটিংয়ের ক্ষেত্রে এমন সিনারিও তৈরি হওয়া খুবই সম্ভব, যেখানে দেখা যাবে ওই একই ভোটাররা আবার শেষমেশ বিএনপির চেয়ে জাতীয় পার্টিকেই বেশি ভোট দিয়ে বসে আছে! মানে, অনেকটা ‘রক-পেপার-সিজর’ গেমটার মতো। পলিটিক্যাল সায়েন্সে যারে বলে ‘কন্ডরসেট প্যারাডক্স’।
তো, এই প্যারাডক্সের প্রায় দেড়শো বছর পর, কেনেথ অ্যারো নামের এক আমেরিকান ইকোনমিস্ট চিন্তা করলেন, আচ্ছা, এমন কোনো পারফেক্ট ভোটিং সিস্টেম কি বানানো সম্ভব, যেটা এই ধরনের সব ম্যাথমেটিক্যাল এরর থেকে মুক্ত? উনি ওনার পিএইচডি থিসিসে এইটা নিয়ে কাজ শুরু করলেন এবং ১৯৫১ সালে ‘সোশ্যাল চয়েস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়াল ভ্যালুজ’ নামের একটা বইয়ে উনি একটা থিওরেম দাঁড় করাইলেন, যেটার নাম ‘অ্যারোজ ইমপসিবিলিটি থিওরেম’। উনি সেখানে অঙ্ক করে দেখাইলেন যে ক্যান্ডিডেট যদি তিনটা পক্ষ বা তার বেশি হয়, তাহলে দুনিয়ার কোনো ভোটিং অ্যালগরিদমই একসাথে পাঁচটা বেসিক ফেয়ারনেসের শর্ত পূরণ করতে পারবে না। কোনো না কোনো জায়গায় ঘাপলা হবেই। তো, উনি বেসিক ফেয়ারনেসের জন্য যে পাঁচটা শর্ত দিচ্ছেন, সেই পাঁচটা শর্ত কী?
ধরেন, আপনি ভোটার। তো, একটা পারফেক্ট ভোটিং সিস্টেমের প্রথম শর্ত কী? প্রথম শর্ত হলো সবার মতামতের স্বাধীনতা বা ‘আনরেস্ট্রিক্টেড ডোমেইন’। তার মানে, ভোটার হিসাবে আপনি চাইলে আপনার ব্যালটে ফার্স্ট চয়েস বিএনপি, সেকেন্ড চয়েস আওয়ামী লীগ, থার্ড চয়েস জাতীয় পার্টি, এরকম দিতে পারবেন; আবার উল্টাটাও দিতে পারবেন। সিস্টেমকে আপনার এই র্যাংকিং এক্সেপ্ট করে একটা ক্লিয়ার রেজাল্ট দিতে হবে।
দ্বিতীয় শর্ত হলো ‘নন-ডিক্টেটরশিপ’। মানে, ইলেকশনের রেজাল্ট কখনোই কোনো একজন পাওয়ারফুল ব্যক্তির ওপর নির্ভর করবে না। কেউ একজন বলে দিল আর সেটাই রেজাল্ট হয়ে গেল, এমনটা হওয়া যাবে না।
তারপরে হলো তৃতীয় শর্ত ‘ইউনানিমিটি’ বা সবার সম্মতি। ধরেন, দেশের সব ভোটার জাতীয় পার্টির চেয়ে বিএনপিকে বেশি পছন্দ করে। তাহলে ফাইনাল রেজাল্টেও জাতীয় পার্টির চেয়ে বিএনপিকেই এগিয়ে থাকতে হবে। বেসিক। মানে, সবাই যেটা চাচ্ছে, ভোটিং সিস্টেম যদি অন্যকিছু দেয়, তাহলে তো আর সেটা ফেয়ার হলো না।
চার নম্বর শর্ত হলো ‘ট্রানজিটিভিটি’ বা যুক্তির ধারাবাহিকতা। ওই যে ফ্রেঞ্চ ম্যাথমেটিশিয়ানের কথা বললাম, তার সেই বাগের অপজিট। মানে, যদি ভোটিংয়ের পর দেখা যায় দেশের মানুষ জাতীয় পার্টির চেয়ে আওয়ামী লীগকে বেশি পছন্দ করে, আবার আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপিকে বেশি পছন্দ করে, তাহলে সিম্পল লজিক বলে যে মানুষ ডেফিনেটলি জাতীয় পার্টির চেয়ে বিএনপিকে বেশি পছন্দ করে। ভোটিং সিস্টেমকে অবশ্যই এই র্যাশনাল লজিকটা মেইনটেইন করতে হবে।
শেষ শর্তের নাম ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স অফ ইররেলেভেন্ট অল্টারনেটিভস’ বা আইআইএ (IIA)। নামটা একটু ভারি ভারি হইলেও, আমাদের দেশের ইলেকশনে এটা খুব চেনা দৃশ্য। ধরেন, কোনো একটা আসনে মূল ফাইট হচ্ছে বিএনপি আর আওয়ামী লীগের মধ্যে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, তবে ওই আসনের বেশিরভাগ মানুষ আসলে বিএনপিকে চাচ্ছে এবং সেই হিসেবে তাদেরই জেতার কথা। ঠিক এমন সময় ইলেকশনে এন্ট্রি নিল তৃতীয় একটা দল, ধরেন জামায়াতে ইসলামী অথবা চরমোনাই পীরের দল। এখন এই নতুন দলের আইডিওলজি বা ভোটব্যাংকের একটা বড় অংশ হয়তো বিএনপির সাথে মিলে যায়। ফলে যারা বিএনপিকে ভোট দিতো, তাদের একটা অংশ গিয়ে এই নতুন দলকে ভোট দিয়ে দিল। রেজাল্ট কী হলো? বিএনপি আর এই তৃতীয় দলের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হয়ে গেল আর মেজরিটির প্রথম পছন্দ না হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ওই আসন থেকে জিতে গেল! খেয়াল করে দেখেন, নিয়ম অনুযায়ী এই তৃতীয় অপশনটা অ্যাড হওয়ার কারণে কিন্তু মূল দুইটা দলের ভেতরের প্রেফারেন্স চেঞ্জ হওয়া উচিত ছিল না। কারণ নতুন দলটা তো আর জিততেছে না, সে খালি স্পয়লার হিসেবে কাজ করতেছে। আর এই স্পয়লারের কারণে রেজাল্ট উলটে যাচ্ছে। ফলে বেসিক ফেয়ারনেসের পাঁচ নম্বর শর্তটা এখানে ভেঙে যাচ্ছে।
তো, কেনেথ অ্যারো এই পাঁচটা শর্ত সামনে রেখে বলতেছেন, তিন বা ততোধিক ভোটিং অপশন থাকলে এই পাঁচটা শর্ত একসঙ্গে পূরণ করবে, এরকম কোনো ভোটিং সিস্টেমের অস্তিত্ব এই দুনিয়ায় থাকা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। যদি প্রথম চারটা শর্ত আপনি ঠিক রাখতে চান, তাহলে পঞ্চম শর্তটা নিশ্চিতভাবে ভেঙে পড়বে। আর যদি পাঁচটা শর্তই আপনি জোর করে ধরে রাখতে চান, তাহলে সিস্টেমটা পরিণত হবে ডিক্টেটরশিপে।
এখন আপনি ভাবতে পারেন, বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ ভোটিং সিস্টেমে যেহেতু সমস্যা আছে, আমরা অন্য কোনো দেশের সিস্টেম ট্রাই করি। ধরা যাক, ব্যালটে সিল না মেরে আমরা অস্ট্রেলিয়ার মতো ‘র্যাংকড চয়েস ভোটিং’ আনব, যেখানে ভোটাররা ১, ২, ৩, এইরকম ক্রমানুসারে তাদের পছন্দ জানাবে। অথবা জার্মানির মতো প্রোপোরশনাল বা আনুপাতিক হারে সিট ভাগ করব। ওকে, বাট… কেনেথ অ্যারো বলতেছেন, সরি ব্রো। আপনি যত পারফেক্ট অ্যালগরিদমই বানান না কেন, ভোট দেওয়ার অপশন যখন তিনটা বা তার বেশি হবে, তখন ফেয়ারনেসের এই পাঁচটা বেসিক কন্ডিশন একসাথে কখনোই মিলবে না।
তাহলে কি গণতন্ত্র জিনিসটাই একটা স্ক্যাম? আমরা কি ভোট দেওয়া ছেড়ে দিব? না, ব্যাপারটা এতটাও হতাশার না। অ্যারোর থিওরেম আমাদের বলতেছে না যে ডেমোক্রেসি ফালতু একটা জিনিস, আবার শুধু ভোটই তো আর ডেমোক্রেসি না। উনি জাস্ট দেখাইতেছেন যে ম্যাথমেটিক্যালি পারফেক্ট ভোটিং সিস্টেম একটা মিথ। প্রত্যেকটা ভোটিং সিস্টেমেরই কোনো না কোনো গাণিতিক দুর্বলতা আছে।
তাহলে আমাদের কনক্লুশন কী? কনক্লুশন হইলো, গণতন্ত্র একটা ম্যাথমেটিক্যাল ট্রেড-অফ। কাব্য করে বললে, গাণিতিক আপস। মানে, আমরা যখন একটা ভোটিং সিস্টেম ডিজাইন করি, তখন আমাদের ডিসাইড করতে হয়, কোন ফেয়ারনেসটা আমরা রাখতে চাই আর কোন লুপহোলটা আমরা মেনে নিব। এই আলাপটা আরও বিস্তারিত করতে পারলে ভালো হতো। আপনাদের আগ্রহ আছে কি না কমেন্টে জানান, তাহলে সামনে হয়তো আমরা আরেকটু ডিপ ডিগ করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করব। পোস্ট দেখুন, ভাবুন, করুন, থাকুন পোস্টের সঙ্গেই।
- 0
- 0
- 0
- 0
