হামের টিকা ইস্যুতে খোদ ইউনিসেফ গ্লোবালের সাথেই ইউনিসেফ বাংলাদেশের তথ্য মিলছে না। সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রানা ফ্লাওয়ার্স নিশ্চিত করেন, টিকার সংকট ছিল। টিকার আসন্ন সংকট মোকাবিলায় তারা ইন্টেরিমকে ৫–৬টা চিঠি দিয়েছেন। নির্বাচনের দু’দিন আগে চিঠি পাঠিয়ে তারা লিখেছেন—ওপেন টেন্ডারে টিকা কিনবেন না। আমাদের মাধ্যমে কিনুন।
এ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউনিসেফ টিকা কিনে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের কাছ থেকে ৭% ফি নেয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু সূত্র বলছে—ইউনিসেফ অল্প দামে আগে থেকেই গ্লোবালি টিকা কিনে রাখে। ওয়ার্ক অর্ডার পাওয়ার পর এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলোতে বিক্রি করে। ততদিনে দামের বেশ হেরফের ঘটে। ইউনিসেফ নিজে কোনো টিকা উৎপাদন করে না। টিকা কেনার জন্য কোনো অর্থসহায়তাও দেয় না।
তাহলে একটু জানি, টিকার অভাবের বিষয়টি কোথা থেকে আসলো?
প্রথমত—বাংলাদেশ সরকারের “টিকাদান কর্মসূচি”-র দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান কর্মকর্তা হাসানুল মাহমুদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকার কোনো অভাব ছিল না। যদিও এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই বলে ফেলেছিলেন, “হামের একটি টিকাও আমাদের হাতে ছিল না।” ফলে একটা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত—ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেলথ ম্যানেজার ডাক্তার রিয়াদ মাহমুদ গণমাধ্যমকে ৫টা কারণের কথা বললেও সেখানে টিকার ঘাটতির বিষয়টি সরাসরি বলেননি।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে টিকা কেনার টাকাটা দেয় গাভি বা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (Global Alliance for Vaccines and Immunization)। ইউকে, ইউএস, চীন, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, বিল গেটস, টিকটক, গুগল ইত্যাদি রাষ্ট্র ও কর্পোরেশন মিলে গাভিকে টিকা কেনার টাকা দেয়।
গাভির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, টিকার সংকটের তথ্যটা আসলে ভুল। অন্তর্বর্তী সরকার—স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী দায়িত্ব পালন করা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ডাক্তার সায়েদুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, টিকার সংকট ছিল না।
এডিবি ও দাতা সংস্থাসমূহ: বাংলাদেশে টিকা কার্যক্রম পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টগুলোর একটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ সরকার, যুক্তরাষ্ট্র সরকার, ইউনিসেফ, নাইট্যাগ, বিল গেটস ফাউন্ডেশন, ব্র্যাক, কানাডা সরকারসহ এক ডজন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও মেকানিজম এই টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত।
ইউনিসেফের নিজস্ব ড্যাশবোর্ড বলছে, ২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ হামের টিকা কিনেছে বাংলাদেশ সরকার। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সরকার ৬ গুণ বেশি টিকা কেনে, যার পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ১৯ লাখ ডোজ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে রুটিন টিকার চাহিদা বছরে ৪৯ লাখ ২০ হাজারের মতো। তার বিপরীতে ইন্টেরিম ২০২৫ সালে আড়াই কোটি ডোজ বেশি কিনেছে। প্রশ্ন হলো—এই রেকর্ড পরিমাণ টিকা কেন কেনে সরকার? কেন অন্তর্বর্তী সরকার হামের টিকার জন্য ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট অর্থাৎ ১০২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করে?
১. এ পর্যন্ত রুটিন ও ক্যাম্পেইনের এই টিকা কেনা হতো ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট পদ্ধতিতে। অর্থায়ন করত গ্লোবাল ভ্যাক্সিন এলায়েন্স আর টিকা কিনে দেওয়ার ব্যবস্থাপনায় ছিল ইউনিসেফ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পোস্টকে জানিয়েছেন, টিকা কিনে দেওয়ার ফি হিসেবে ইউনিসেফ ৭% হ্যান্ডেলিং চার্জ আদায় করত। যে আইনবলে এই টিকা কেনা হতো, তা কেবল জরুরি অবস্থার জন্য প্রযোজ্য ছিল। প্রতি বছর জরুরি অবস্থার আইনবলে এই টিকা কেনার পদ্ধতি আইনসম্মত ছিল না। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, বার্ষিক চাহিদার জন্য যে ৫০ লাখ টিকা প্রয়োজন, তার পুরোটাই সরকার ইউনিসেফের কাছ থেকে কিনবে। কিন্তু পাশাপাশি নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে সরকার আরও কিছু টিকা কিনবে, যেন ২০২৯ সালে দরিদ্র দেশের স্ট্যাটাস থেকে গ্র্যাজুয়েশনের পর সরকার নিজেদের সক্ষমতায় কম মূল্যে টিকা কিনতে পারে।
মূলত এই সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই সরকার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টিকা কেনে। প্রয়োজনীয় টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে এবং অতিরিক্ত কিছু টিকা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে।
ঠিক এই জায়গাটিতেই লেখক ও গবেষক ইরফান শেখ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশ ইউনিসেফের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা। বাংলাদেশ ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে টিকা কিনতে শুরু করলে তা ইউনিসেফের স্থায়ী আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াত কি? এ কারণেই কি নির্বাচনের মাত্র ২ দিন আগে ইউনিসেফ স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ করে?
এটাই কোন ঘটনা ইউনিসেফকে শঙ্কিত করে তুলেছিল? যে এই পাইলট প্রজেক্ট সফল হলে ইউনিসেফ তার অন্যতম বৃহৎ গ্রাহক বাংলাদেশকে হারাবে? শুধু হাম-রুবেলা না, আরও ১১টা ভ্যাক্সিনও আস্তে আস্তে বাংলাদেশ ওপেন টেন্ডারে কিনতে শুরু করবে। তাছাড়া জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাকস পোস্টকে জানিয়েছেন, জাতিসংঘের লজিস্টিক পার্ট মূলত দেখে ইউনোপস। হামের টিকার বাণিজ্য কে করবে, তা নিয়েও ইউনোপস-ইউনিসেফের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা আছে। ইউনোপস ২০২৫ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কম দামে টিকা এনে দেওয়ার অফারও করে। ২০২৫ সালে ওপেন টেন্ডার হয়ে গেলে ইউনোপস বা দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালসের যে কেউ প্রতিযোগিতামূলক বিড করতে পারত। তাই ইউনিসেফের শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল।
যদিও বাংলাদেশ ইউনিসেফকে এই ওপেন বিডে আসার অনুরোধ করেছিল, তবে শর্ত ছিল—এবার দামে প্রতিযোগিতা করে আসতে হবে। দাম কমাতে হবে। ইউনিসেফের এই নতুন ওপেন টেন্ডার পদ্ধতি ভালো লাগেনি। রানা ফ্লাওয়ার্সের আমলে ইউনিসেফ তার অন্যতম বৃহৎ টিকার বাজার বাংলাদেশকে হারিয়েছে। এই কলঙ্ক রানা তার সিভিতে লাগাতে চাননি। তাছাড়া বিদেশি শ্বেতাঙ্গ দাতা সংস্থা আমাদের সঙ্গে মিথ্যা বলবে—এমনটা দেখে আমরা অভ্যস্ত না।
ফাইনালি, ইউনিসেফ তার উদ্দেশ্যে সফল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সরকার আর কখনো ইউনিসেফ বাদ দিয়ে অন্য কারও কাছ থেকে টিকা কিনবে না। তাহলে হাম কেন ছড়িয়ে পড়লো?
গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনের স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান নিজাম আহমেদ বলেন, ২০২৩ সালের পর থেকেই অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিভিন্ন জটিলতায় টিকাদান কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা দেশে টিকার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পদের ৪০–৫০% পদই শূন্য। জনবলের অভাব টিকা কর্মসূচিকে ব্যাহত করেছে। এছাড়া মায়েদের টিকা নেওয়ার হার কমে যাওয়া, মায়েদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া, ব্রেস্ট ফিডিং কমে যাওয়ায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গেছে।
টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘটও দায়ী। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তারা পূর্ণ কর্মবিরতি শুরু করেন। এ সময় টিকার কভারেজে ধস নামে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হামের বৈশ্বিক প্রকোপ নিয়েও আলোচনা করছেন। সারা বিশ্বেই হামের প্রকোপ বেড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, হাম তার ভ্যারিয়েন্ট পাল্টেছে কি না। অনেকে আশঙ্কা করছেন, কোভিড মহামারির সময় টিকার কভারেজে কোনো গ্যাপ পড়ে গিয়েছিল কি না।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার ব্যাপকভাবে মপ-আপ টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত শিশুদের আইসোলেশন শুরু হয়েছে। তবে হাম মহামারির মাঝে পরিবারে শিশু সন্তান থাকলে তাকে নিয়ে বাসে, ট্রেনে বা লঞ্চে ভ্রমণ করা শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
- 0
- 0
- 0
- 0
