গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার আপেল-মাল্টা কিনেছে। শুধু মাল্টায় একটি পরিবারের গড় খরচ ছিল ১,১৫০ টাকার বেশি, অর্থাৎ মাসে প্রায় ৯৬ টাকা। এই সেপ্টেম্বরে সেই ৯৬ টাকায় মিলছে আগের প্রায় অর্ধেক মাল্টা। আর দাম বেড়েছে ঠিক সেই মাসে, যখন ডেঙ্গু চূড়ায় ছিল। দামটা বাড়ল কীভাবে? বাজার দেখার দায়িত্ব যাদের, তারা কী করল? আর জ্বরের সময় দেশি ফল কেন বিকল্প হয়ে উঠছে না?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এ বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ২৪৫ জনের ১৪৮ জনই সেপ্টেম্বরের। একই মাসে চট্টগ্রামের ফল ব্যবসায়ীরা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, জ্বর ও ডেঙ্গুর রোগীর পরিবারে মাল্টা-কমলা কেনা বেড়েছে। ঠিক এই সময়ে দাম বাড়ছে কীভাবে?
দাম বাড়ার প্রথম ধাপ শুরু হয় বন্দরে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি মাল্টার আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা, আর তার ওপর শুল্ক-কর প্রায় ১০৭ টাকা। ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ডলার বাঁচাতে ফলে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার সম্পূরক শুল্ক আরও বাড়ায়। পরে কিছুটা কমলেও মোট করভার এখনো ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আমদানিকারকদের দাবি, সব খরচ ধরে কেজিতে তাঁদের ব্যয় ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা।
দ্বিতীয় ধাপ বাজারে। সেপ্টেম্বরে পাইকারিতেই মাল্টার কেজি উঠেছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়, খুচরায় ৫২০ টাকায়। অর্থাৎ করের পরও বন্দরের বাইরে দাম বেড়েছে কেজিতে দেড় থেকে আড়াই শ টাকা। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, লোকসানের কারণে আমদানি কমেছিল, তাই সরবরাহ কম ছিল। আমদানিকারকেরা বলছেন, খুচরায় কেজিতে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। দুই পক্ষের কোনো দাবিই এখনো যাচাই হয়নি।
কর বাড়ানোর পেছনে সরকারের ঘোষিত যুক্তি ছিল ডলার-সংকটে আমদানি নিরুৎসাহিত করা। কিন্তু ডেঙ্গুর মৌসুম প্রতিবছরই আসে। তাহলে আগাম প্রস্তুতি কোথায়? বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বুধবার চট্টগ্রামের ফলমন্ডিতে তিন প্রতিষ্ঠানকে মোট ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। অথচ গত অর্থবছরের হিসাবে দেশে দিনে গড়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকার মাল্টা বিক্রি হয়েছে।
দেশি ফলের অবস্থা কী? কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক মেহেদি মাসুদ ২০২৪ সালে প্রথম আলোকে জানান, দশ বছরে দেশে ফল উৎপাদন এক কোটি থেকে দেড় কোটি টনে উঠেছে। আর ডেঙ্গুর চিকিৎসা-নির্দেশিকা বলছে, আসল দরকার পর্যাপ্ত তরল। ফলের রস বা স্যালাইন সেই কাজ করে, নির্দিষ্ট কোনো ফল জরুরি নয়। তাহলে জ্বরের মৌসুমে দেশি ফল বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে না কেন?
আর বিদেশি ফলের টাকার বড় ভাগ যায় কোথায়? গত অর্থবছরে আপেল-মাল্টা থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৩,২২০ কোটি টাকা, বিদেশি বিক্রেতারা পেয়েছেন ২,৪৩৯ কোটি টাকা। আর আপনি পেয়েছেন সেই ৯৬ টাকায় আগের প্রায় অর্ধেক মাল্টা।
- 0
- 0
- 0
- 0
