এই যে যুদ্ধের ভয়াবহতা, এর পেছনে আছে পরমাণু কর্মসূচি আর পরমাণু অস্ত্র বানানোর অভিযোগ! আসল কারণ যা-ই হোক, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে ওলটপালট করে দেওয়া ইরান আক্রমণের জন্য আমেরিকা-ইসরাইল অজুহাত হিসেবে বেছে নিয়েছিল সেই পরমাণু কর্মসূচিকেই। অথচ হামলার আগ পর্যন্ত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা নিজেই বলছিল, ইরান পরমাণু অস্ত্র বানাচ্ছে না, আর জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএ-র নিয়মিত পরিদর্শনে ইরানের স্থাপনায় কোনো অস্বাভাবিক কার্যক্রমও ধরা পড়েনি। তবু বোমা পড়েছে, মানুষ মরেছে। আর এই ঘটনা প্রকাশ করেছে পরমাণু অস্ত্র প্রশ্নে দুনিয়ার দ্বিচারিতা।
ঠিক এই দ্বিচারিতার প্রেক্ষাপটেই প্রতি বছর ২৬ সেপ্টেম্বর পালিত হয় পরমাণু অস্ত্র নিরোধ দিবস। কিন্তু কোথা থেকে এল এই দিবস? ২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। সেই ধারাবাহিকতায় জোট-নিরপেক্ষ দেশগুলোর পক্ষে ইন্দোনেশিয়া সাধারণ পরিষদে একটি আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণার জন্য লিখিত প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদ ২৬ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ নির্মূল দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
জাতিসংঘের ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে উদ্যাপিত এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য—পরমাণু অস্ত্র মানুষের জন্য কতটা ভয়ংকর, সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং এই অস্ত্র পুরোপুরি নির্মূলের লক্ষ্যে বিশ্বকে চাপে রাখা। দিবসটি উপলক্ষে প্রতি বছর নিউইয়র্ক আর জেনেভায় বিশেষ অধিবেশন বসে, জাতিসংঘের মহাসচিব বার্তা দেন। উদ্যাপন বলতে এটাই। এ বছরও ব্যতিক্রম হয়নি। অফিসিয়াল বার্তায় আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন—‘পারমাণবিক বিপর্যয় এড়াতে হলে বিভাজনের বদলে সংলাপ, সংঘাতের বদলে কূটনীতি এবং ধ্বংসের বদলে নিরস্ত্রীকরণকে বেছে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।’ কিন্তু কেউ কি তাঁর কথা শুনছে?
তাঁর কথাও কেউ শোনেনি, আর ঘটা করে আয়োজন করে পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলোর কেউ এই দিবস পালনও করেনি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বিপুল আয়োজন করে, দারুণ নাম দিয়ে ক্যালেন্ডারে জাতিসংঘ যে দিবসকে স্থান দিল, সে দিবসের যথাযথ উদ্যাপন কেন নেই? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর দায়িত্বজ্ঞানহীন আগ্রাসী আচরণ। ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার ওয়েপনস বলছে, আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরাইল নিয়মিতই জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত আলোচনা ও সম্মেলন এড়িয়ে চলে। ফলে স্নায়ুযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলো একে একে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের নিজস্ব হিসাব বলছে, বিশ্বে এখনো মজুত আছে প্রায় ১২ হাজার ১৮৭টি পরমাণু ওয়ারহেড, কোনো চুক্তির আওতায়ই যার একটিও ধ্বংস হয়নি। এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে আমেরিকা-রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক নিউ স্টার্ট চুক্তি। ফেডারেশন অফ আমেরিকান সায়েন্টিস্টস বলছে, পরাশক্তিগুলো চুক্তি নবায়নের বদলে বিশ্বজুড়ে মজুত থাকা পারমাণবিক ওয়ারহেডের আধুনিকায়নে মেতেছে।
এই যখন বিশ্বের পরিস্থিতি, তখন পরমাণু অস্ত্র নিরোধ দিবস একটা হাসির বস্তুই বটে। ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন বলছে, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, পোল্যান্ড ও তুরস্কের মতো দেশগুলো পরাশক্তিগুলোর রক্তচক্ষু উপেক্ষা অথবা পদলেহন করেই পারমাণবিক অস্ত্রধারী হতে মরিয়া হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই চাওয়া? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল কারণ বৈশ্বিক ব্যবস্থার দ্বিমুখী নীতি, যেখানে পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা ছাড়া সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আর এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ লিবিয়া। ২০০৩ সালে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে স্বেচ্ছায় পরমাণু কর্মসূচি গুটিয়ে নেন লিবিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন যেন কচ্ছপের গতি! আর ২০১১ সালে ন্যাটো ও আমেরিকার সমর্থনে বিদ্রোহীরা গাদ্দাফিকে উৎখাত করে হত্যাই করে ফেলে। এর পরে লিবিয়ার অবস্থা তো সবারই জানা।
লিবিয়ার এই করুণ পরিণতি বিশ্বজুড়ে বার্তা দিয়েছে—পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করলে সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়। এই ঘটনার উদাহরণ টেনে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি বলেছিলেন—‘গাদ্দাফি নিজের পরমাণু সরঞ্জাম পশ্চিমাদের হাতে তুলে দিয়ে সবকিছু হারিয়েছেন, ইরান সেই পথে হাঁটবে না।’ যদিও তিনিও একই অজুহাতে আমেরিকার অন্যায় হামলায় প্রাণ দিয়েছেন। উত্তর কোরিয়াও একই যুক্তি দিয়ে নিজের অস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে পরাশক্তিগুলোর পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতার প্রলয়ংকরী প্রভাব সরাসরি এসে লেগেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। ফেডারেশন অফ আমেরিকান সায়েন্টিস্টস বলছে, পারমাণবিক শক্তিধর তিন প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও চীন ঘিরে আছে বাংলাদেশকে। তথ্য বলছে, ভারতের ১৮০টি, পাকিস্তানের ১৭০টি এবং চীনের ৬০০টির মতো পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে। এর ওপর সীমান্ত-সংলগ্ন মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রাশিয়ার পরমাণু সংস্থা রসাটমের সঙ্গে ছোট মডুলার পারমাণবিক রিয়্যাক্টর (SMR) স্থাপনের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। লই ইনস্টিটিউটের নিরাপত্তা গবেষণা এবং দি স্ট্র্যাটেজিস্টের আঞ্চলিক বিশ্লেষণ বলছে, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের অস্ত্রপ্রীতি ও পারমাণবিক উপাদানের চোরাচালান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে বাংলাদেশের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এবার একটু ভিন্ন আলাপ করি; আপনি কি জানেন, বিশ্বমঞ্চে শান্তির প্রবক্তা সেজে থাকা দেশগুলো অস্ত্রবাজিতে কত টাকা অপচয় করে? আল জাজিরা ও আইসিএএন-এর গ্লোবাল স্পেন্ডিং রিপোর্ট বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের ৯ পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ তাদের পরমাণু অস্ত্রাগারের পেছনে ব্যয় করেছে ১১৯ বিলিয়ন ডলার! এর মধ্যে কেবল আমেরিকার খরচই ৬৯.২ বিলিয়ন ডলার, যা বাকি সব দেশের সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়েও বেশি। এ ছাড়া চীন ১৩.৫ বিলিয়ন, যুক্তরাজ্য ১২.৬ বিলিয়ন, রাশিয়া ৯.৫ বিলিয়ন এবং ফ্রান্স ৭.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে অস্ত্র আধুনিকায়ন করেছে।
অথচ জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব থেকে ক্ষুধা দূর করতে বছরে দরকার মাত্র ৯৩ বিলিয়ন ডলার। যা এসব দেশের গত এক দশকের সামরিক খাতে খরচের এক শতাংশেরও কম! জাতিসংঘের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন অনুসারে, শান্তির দূত সাজা এসব দেশের অস্ত্রখাতের এই ১১৯ বিলিয়ন ডলারের সামান্য অংশ বরাদ্দ করলেই পুরো পৃথিবীর চরম ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও জলবায়ু সংকটের সমাধান করা সম্ভব।
তবুও পরাশক্তি নামধারী শান্তির ফেরিওয়ালারা ছুটছে বিনাশের আঁতুড়ঘর সমৃদ্ধ করার পেছনেই। কারণ ক্ষমতার রাজনীতিতে নিরাপত্তা মানেই ভয় দেখানোর সামর্থ্য, আর সেই সামর্থ্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক পরমাণু বোতাম। যতদিন বড় শক্তিগুলো নিজেরাই অস্ত্র ছাড়তে রাজি নয়, ততদিন নিরোধ দিবস শুধু একটা তারিখ মাত্রই!
- 0
- 0
- 0
- 0
