ভাবতে পারেন, একজন বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী তরুণ, যে নীলফামারীর ডোমার সরকারি কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পেটে কতটা ক্ষুধা আর মনে কতটা জোর থাকলে সে ঢাকা শহরে কাজ করতে আসে! স্বপ্ন দেখতে পারে দিনমজুর বাবা-মায়ের ভাগ্য ফেরানোর। আসার সময় মাকে বলেছিল, ‘হাতের কাজ তো জানি, সেই কাজ করে তোমাদের একটা ঘর তুলে দেব।’ কারণ বয়োবৃদ্ধ দিনমজুর বাবা-মায়ের কোনো আবাদি জমি নেই, শুধু মাথা গোঁজার বসতভিটাটুকুই একমাত্র সম্বল।
অবশ্য সেই পরিবারটির হাতে এখন ৯ লাখ টাকা, ওহ না, আট লাখ টাকা। কারণ সমঝোতার ৯ লাখের মধ্যে এক লাখ নাকি দাফন-কাফন বাবদ খরচ হয়ে গেছে। তাই পরিবারের হাতে ৮ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে।
আর এই বাবা-মায়ের সঙ্গে আপসরফাটা কে করেছে? আরেক বাবা-মা, নিজেদের ছেলেকে আইনের হাত থেকে বাঁচাতে।
আইনের কথা যেহেতু এলই, এখানে একটু বলি। আইনের ধারক-বাহক যাঁরা, অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আইনজীবীরা, যাঁরা ভুক্তভোগীকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার জন্য শপথ নেন, তাঁদের হাত ধরেই কিশোর আজান আলি শরীফ ও তার পরিবার দায়মুক্তি পাওয়ার রাস্তা খুঁজছে। কীভাবে?
নিহতের ভাইয়ের করা প্রাথমিক এজাহারে আসামি হিসেবে লেখা হলো অন্য এক ব্যক্তির নাম—আকাশ মারক। সিসিটিভি ফুটেজে ড্রাইভিং সিট থেকে কিশোরকে নামতে দেখা যাওয়া সত্ত্বেও কেন এজাহারে তার নাম বাদ পড়ল? জনরোষের ভয়ে তাকে ‘হেফাজতে’ নেওয়ার কথা বলে চাচার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া, আর পরবর্তী সময়ে ফুটেজ বিশ্লেষণে কিশোরের সম্পৃক্ততা পেয়ে পুলিশ তাকে পুনরায় হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রাথমিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না?
আদালতে হাজিরার দিনে অভিযুক্তের পরিহিত টি-শার্টের দিকে কি বিচারিক সংস্কৃতির নজর পড়েছে? যে টি-শার্টে আঁকা ছিল ‘Superbad’ সিনেমার সেই কাল্পনিক চরিত্র ‘McLovin’-এর ফেক ড্রাইভিং লাইসেন্স—যেটি মূলত অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় ভুয়া পরিচয়পত্র দিয়ে আইনি নজরদারি এড়ানোর পপ-কালচারাল প্রতীক। একজন নিহত শ্রমিকের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে আদালতে এমন সংকেতবাহী টি-শার্ট পরা কি স্রেফ পোশাকের অসচেতনতা, নাকি কোনো গভীর অনুশোচনাহীনতার লক্ষণ?
অনুশোচনা শব্দটি কি ওই কিশোরের বাবা-মায়ের মধ্যে দেখা গেছে? যদি দেখা গিয়ে থাকে, তাহলে ৯ লাখ টাকায় মেহেদীর পরিবারের সঙ্গে কীভাবে আপসরফা করলেন? ধরে নিলাম, ক্ষুধার যন্ত্রণার কাছে মেহেদীর বাবা-মা নয় লাখ টাকায় আপস করতে বাধ্য হয়েছেন। ধরে নিলাম, তাঁদের বোঝানো হয়েছে, যে গেছে সে তো গেছেই, মামলা করতে করতে তোমাদের সারা জীবন যাবে। ৯ লাখ টাকায় বিক্রি হয়ে যাও। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আইন কী বলে? আপসরফা কি আইনসংগত?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেছেন, ‘যেকোনো ক্রিমিনাল কেস হচ্ছে নন-কম্পাউন্ডেবল। আর এটা যেহেতু মার্ডার কেস, এটা কম্প্রমাইজ করার কোনো সুযোগই নাই।’
মামলার এজাহার অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ধারা ৯৮ ও ধারা ১০৫-এ, যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে দণ্ডবিধির ধারা ৩০৪বি। উল্লেখ্য, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ধারা ৩৪৫ অনুযায়ী সংঘটিত অপরাধটি আপস-অযোগ্য।
সে ক্ষেত্রে যেহেতু আপস হয়েছে, ভুক্তভোগীর পরিবার ফৌজদারি মামলা তুলে নিতে পারবে কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘পারবে না।’
৯ লাখ টাকা দেওয়ার ফলে ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতির সুযোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তাঁর উত্তর, ‘না, কোনো সুযোগ নাই।’
তাঁর মতে, ‘ক্রিমিনাল অফেন্স রাষ্ট্রের বিপক্ষে অফেন্স, এটা শুধু ব্যক্তির বিপক্ষে না।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়াও ডেইলি স্টারকে বলেছেন, ‘ভুক্তভোগীর পরিবার শুধু এফআইআর করে। মামলার প্রকৃত বাদী রাষ্ট্র।’
তাঁর মতে, এই আপসনামা ‘ব্যক্তিগত সমঝোতার কাগজ’। ‘এর মাধ্যমে কেউ ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না।’
আইন অনুযায়ী ১৭ বছর বয়সী অপরাধীর ঠাঁই হয়েছে গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে শুরুতেই চালকের পরিচয় আড়াল করার আইনি মারপ্যাঁচ সাজানো হয়, চাবি হাতে তুলে দেওয়া অভিভাবকদের রাখা হয় জবাবদিহির সম্পূর্ণ বাইরে, আর ৯ লাখ টাকায় কেনাবেচা হয় রক্তের সমঝোতা নথি—সেখানে সিসিটিভি ফুটেজ উন্মোচনের পর তাকে সংশোধনাগারে পাঠানো কি সত্যিই কোনো বাস্তব সংশোধনের পথ দেখায়? নাকি এটি স্রেফ জনক্ষোভ ঠান্ডা করার এক প্রাতিষ্ঠানিক আইনি আড়াল?
শিশুর অধিকার সুরক্ষার জন্য তৈরি ‘শিশু আইন ২০১৩’ কি তবে আজ সুবিধাবাদী শ্রেণির হাতে এমন এক ঢাল—যা একদিকে বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রতায় বন্দি করে, আর অন্যদিকে মারাত্মক অপরাধে জড়ানো অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন অভিভাবকদের পার পাইয়ে দেওয়ার নিরাপদ রাস্তা তৈরি করে?
এখন তাহলে এই মামলার কী হবে? আইনজীবীদের মতে, এই মামলা তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে সুবিচার করা। তবে এখানেও প্রশ্ন আছে। কারণ আমরা দেখি, মামলাকারী ও অভিযুক্তের মধ্যে আপস হয়ে গেলে সে মামলা আর এগোয় না। ঠিক যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যম যে অন্যায় নিয়ে কথা বলে, সেখানেই কেবল সুবিচারের একটা আশা তৈরি হয়। নয়তো বেশির ভাগই হারিয়ে যায়।
যেমন মেহেদী যেদিন মারা গেল, সেদিন আরও এক শ্রবণপ্রতিবন্ধী প্রাণ হারিয়েছেন। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় মারা গেছেন দুলালী বেগম। কড়াইল বস্তির টিঅ্যান্ডটি মাঠের কাছে ময়লার স্তূপ থেকে ভাঙারি জিনিসপত্র কুড়াচ্ছিলেন তিনি। শ্রবণপ্রতিবন্ধী হওয়ায় গাড়ির শব্দ বা হর্ন শুনতে পাননি বলে ধারণা করা হচ্ছে। আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত ৯টার দিকে তিনি মারা যান।
রাষ্ট্রের কাছে সুবিচার পাওয়া তো সবার সাংবিধানিক অধিকার। তাহলে দুলালী বেগমের বিচারটা কে করবে?
- 0
- 0
- 0
- 0
