Written by 11:23 am বিজ্ঞান Views: 5

৫৬ বছর পর নাসা কেন কোটি ডলার খরচ করে সেই চাঁদেই অভিযান?

‘চাঁদ হেরিছে চাঁদ মুখখানি, খোঁপা খুলে দে না’ কিংবা ‘চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা’—এভাবেই প্রেমে-স্নেহে মানুষকে মুখর করেছে চাঁদ! পৃথিবী থেকে যার দূরত্ব ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার। আদিমকাল থেকেই মানুষের আগ্রহ-আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু চাঁদ। ৫৬ বছর পর দ্বিতীয়বার চাঁদ জয়ের পথে মানুষ। নাসার তথ্যমতে, পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে ‘অ্যাপোলো’র গড়া রেকর্ড ভেঙে দিতে চান আর্টেমিসের নভোচারীরা। প্রথমবার চাঁদের প্রতি মানুষের সেই আগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা প্রমাণ হয়েছিল ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পিছু হটিয়ে মানুষ প্রথম পা রাখে চাঁদের মাটিতে।

চন্দ্র জয়ের ৫৬ বছর পর আবারও বিশ্বব্যাপী তুমুল আলোচনার কেন্দ্রে আরেকটি চন্দ্র জয়ের যাত্রা! বিবিসির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে—নাসা এখন তাদের ‘আর্টেমিস’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে আবারও চাঁদে পৌঁছানোর চূড়ান্ত ক্ষণ গণনা করছে। প্রশ্ন হলো, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর কেন আবার এই চন্দ্রাভিযান? আল জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে—নাসার এই নতুন মিশনটি অ্যাপোলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। অ্যাপোলো মিশনের লক্ষ্য ছিল কেবল শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা, কিন্তু আর্টেমিস মিশনের লক্ষ্য অনেক গভীর। এবার নাসা চাঁদে কেবল পতাকা ওড়াতে যাচ্ছে না, বরং সেখানে একটি ‘লুনার গেটওয়ে’ বা স্থায়ী স্টেশন তৈরি করতে চায়, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের জন্য ট্রানজিট হিসেবে কাজ করবে। ফলে আর্টেমিস এখন কেবল একটি মহাকাশ অভিযান নয়, বরং মানব সভ্যতার দ্বিতীয় ঠিকানার খোঁজে এক সাহসী যাত্রা।

আরও একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্বজুড়ে—চন্দ্র জয়ের ৫৬ বছর পর নাসা আবারও কেন কোটি কোটি ডলার খরচ করে সেই চাঁদেই অভিযান চালাচ্ছে? এর অনেক উত্তর হতে পারে, তবে এর প্রধান উত্তর লুকিয়ে আছে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে। সায়েন্স জার্নালের তথ্যানুযায়ী, চাঁদের এই অন্ধকার অংশে জমাটবদ্ধ বরফের সন্ধান পাওয়া গেছে। নাসা নিশ্চিত করেছে যে, এই বরফকে প্রক্রিয়াজাত করে অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন পাওয়া সম্ভব। অক্সিজেন নভোচারীদের বাঁচিয়ে রাখবে, আর হাইড্রোজেন রকেটের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বিবিসি বলছে, চাঁদে এই জ্বালানি সুবিধা পাওয়া গেলে একে একটি ‘গ্যাস স্টেশন’ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, যা দিয়ে ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছানো অনেক সহজ হবে।

আগের চন্দ্রাভিযানগুলোর সঙ্গে এই অভিযানের পার্থক্য আসলে আকাশ-পাতাল। ১৯৬৯ সালে নাসা চাঁদ জয় করতে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল, বর্তমানের একটি সাধারণ স্মার্টফোনও তার চেয়েও কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। ফলে এবারের এই চন্দ্রাভিযান প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এক মাইলফলক। এদিকে আল জাজিরা জানাচ্ছে, আর্টেমিস মিশনে প্রথমবারের মতো নারী এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী চাঁদে পা রাখবেন। ফলে এই অভিযান মহাকাশ বিজ্ঞানে জাতিগত বৈষম্য ঘোচানোর একটি বড় ধাপ। এছাড়া নেচার জার্নালের একটি নিবন্ধ সূত্রে জানা গেছে—অ্যাপোলো অভিযানে নভোচারীরা মাত্র কয়েক ঘণ্টা চাঁদে অবস্থান করলেও, এবার নভোচারীরা সেখানে টানা কয়েক সপ্তাহ থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালাবেন। এমনকি চাঁদের কক্ষপথে একটি স্থায়ী স্পেস স্টেশন বা ‘গেটওয়ে’ তৈরির কাজও শুরু হতে যাচ্ছে এই প্রকল্পের অধীনে।

মহাকাশ তথা চাঁদ নিয়ে মানুষের আকর্ষণের মূল কারণ অজানাকে চেনার চিরন্তন পিপাসা এবং পৃথিবীর বাইরে মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ। তবে বারবার মানুষের চাঁদে যেতে চাওয়ার কারণ কেবল বৈজ্ঞানিক নয়, এর অর্থনৈতিক কারণও বিশাল। সায়েন্টিফিক আমেরিকানের মতে, চাঁদে প্রচুর পরিমাণে ‘হিলিয়াম-৩’ রয়েছে। এই রাসায়নিকটি দিয়ে পৃথিবীর জন্য কয়েক হাজার বছরের ক্লিন এনার্জি বা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। পাশাপাশি চাঁদের বুকে থাকা বিরল খনিজ উপাদান যেমন—নিওডিয়ামিয়াম এবং ল্যান্থানাম—স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরির অপরিহার্য কাঁচামাল। ফলে এসব বিরল খনিজ সংগ্রহের প্রতিযোগিতাও দেশগুলোকে চন্দ্রাভিযানে আগ্রহী করে তুলছে।

আর্টেমিস নামের এই অভিযানে বিশ্ববাসী আসলে কী পেতে যাচ্ছে? আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি এবং আল জাজিরার তথ্যমতে, এই অভিযান পৃথিবীবাসীকে প্রবেশ করাবে নতুন ‘স্পেস ইকোনমি’ বা মহাকাশ অর্থনীতির যুগে। সায়েন্স জার্নালের তথ্যমতে, চাঁদের খনিজ সম্পদ আহরণ এবং সেখানে মহাকাশ স্টেশন স্থাপনের ফলে পৃথিবীতে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। শুধু তাই নয়, গভীর মহাকাশের রেডিয়েশন থেকে বাঁচতে যে উন্নত চিকিৎসাপদ্ধতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই মিশনে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা সরাসরি পৃথিবীর ক্যানসার গবেষণা ও আধুনিক রোবোটিক্সে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। মূলত, চাঁদে যাওয়ার এই প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন ইন্টারনেটের গতি থেকে শুরু করে উন্নত পানি শোধন ব্যবস্থা—সবকিছুকেই এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।

নাসার ৫৬ বছর আগের সেই ‘ছোট্ট এক পদক্ষেপ’ পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে। বিবিসি এবং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের মতে, এই মিশন সফল হলে মানুষ আর কেবল পৃথিবীর বাসিন্দা থাকবে না, বরং হয়ে উঠবে মহাজাগতিক এক জাতি। নীল আর্মস্ট্রং যে দরজার কড়া নেড়েছিলেন, আর্টেমিস মিশনের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্ম সেই দরজা খুলে অসীমের পথে পা রাখতে চলেছে।

Visited 5 times, 5 visit(s) today
Close