Written by 11:19 am বিনোদন Views: 2

বহুমাত্রিক নজরুল

আমরা কাজী নজরুল ইসলামকে প্রায়ই কয়েকটি পরিচিত উপাধির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি—‘জাতীয় কবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, কিংবা ‘সাম্যের কবি’। কিন্তু এই পরিচয়গুলো তাঁর চিন্তার বহুমাত্রিকতাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। রাষ্ট্র, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির ভেতরে থাকা ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করাই ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্যতম শক্তি। এই লেখায় নজরুলকে নতুনভাবে পাঠ করার চেষ্টা করা হয়েছে—একজন কবি হিসেবে নয়, বরং একজন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চিন্তক হিসেবে।

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে চিনেছি। কিন্তু সেই পরিচয়ের শুরুতেই তাঁকে আমরা একটি নিরাপদ বাক্সে বন্দি করে ফেলি। সেই বাক্সের গায়ে লেখা থাকে—‘জাতীয় কবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘সাম্যের কবি’। এই লেবেলগুলো তাঁকে শ্রদ্ধা করতে সাহায্য করলেও তাঁকে বোঝার পথকে অনেক সময় সংকুচিত করে ফেলে।

নজরুল কোনো অনুমেয় মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন এক সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণ, যা নিজের সময়ের রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ ও নান্দনিকতাকে একসঙ্গে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে তাঁকে যত বেশি সরলীকরণ করা হয়, তত বেশি তাঁর চিন্তার ভেতরের অস্থিরতা ও শক্তি আড়ালে চলে যায়।

রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির ভেতরে নজরুলকে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—তিনি কোনো কাঠামোর ভেতর স্থির হয়ে থাকেন না; বরং প্রতিটি কাঠামোকেই প্রশ্ন করেন।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার সেই বিখ্যাত উচ্চারণ—

“আমি চির-বিদ্রোহী বীর,
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির।”

এই ‘আমি’ কেবল একজন ব্যক্তি নয়; এটি এমন এক রাজনৈতিক সত্তা, যে রাষ্ট্র, ধর্ম কিংবা সামাজিক নৈতিকতার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে না। রাষ্ট্র যেখানে নাগরিককে পরিচয় ও শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ করতে চায়, নজরুল সেখানে মানুষের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দেন। এই তোলপাড় করে দেওয়ার মধ্যেই তাঁর রাজনীতি।

তাঁর ‘কুলি-মজুর’ কিংবা ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় শ্রমিক, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে কেন্দ্র করে যে ভাষ্য তৈরি হয়, তা ক্ষমতার কেন্দ্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শ্রেণি, শ্রম ও মর্যাদার প্রশ্নকে তিনি সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।

আজকের বাংলাদেশেও এই পাঠ প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্র উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের ভাষায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, কিন্তু সেই ভাষ্যের আড়ালে যে বৈষম্য, শ্রেণিবিভাজন ও সামাজিক চাপ কাজ করে, নজরুল তার পর্দা সরিয়ে দেন। তাঁর মানবতাবাদ কোনো বিমূর্ত নৈতিকতা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থান।

“গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”

এখানে রাষ্ট্র, ধর্ম কিংবা পরিচয়ের চেয়ে মানুষকেই তিনি বড় করে দেখান। তবে নজরুলকে কেবল বিদ্রোহের কবি হিসেবেও দেখা যথেষ্ট নয়। তাঁর সবচেয়ে গভীর চিন্তা লুকিয়ে আছে সংস্কৃতির ভেতরে থাকা মৌলবাদী পরিচয়বোধের বিরুদ্ধে অবস্থানে। তিনি শিল্প ও সংস্কৃতিকে কখনো একক ধর্মীয় বা জাতিগত সম্পত্তি হিসেবে ভাবেননি। তাঁর কাছে সংস্কৃতি ছিল ইতিহাস, আবেগ, বিশ্বাস ও নানা ঐতিহ্যের এক চলমান সংলাপ। এই কারণেই তাঁর সৃষ্টিতে ইসলামি হামদ-নাত, গজল, শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন, লোকসুর ও রাগসংগীত একসঙ্গে সহাবস্থান করে। এটি শুধু শৈল্পিক বৈচিত্র্য নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক অবস্থান—শিল্পকে বাক্সবন্দি করা যায় না।

তাঁর গজল কিংবা শ্যামাসঙ্গীতেও ধর্ম কোনো রাজনৈতিক বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে না; বরং মানুষের অস্তিত্বগত সংযোগের ভাষা হয়ে ওঠে। বিশ্বাস এখানে ‘আমরা বনাম তারা’ তৈরির উপকরণ নয়, বরং একটি সার্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতা। এই জায়গায় নজরুল শিল্প ও সংস্কৃতিকে পুনর্গঠন করেন। তিনি দেখান, সংস্কৃতি কোনো রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় সম্পত্তি নয়; এটি একটি প্রবাহমান প্রক্রিয়া, যেখানে ভিন্ন ঐতিহ্য সংঘাত, সংযোগ ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করে।

আর এখানেই তাঁর চিন্তার সবচেয়ে রাজনৈতিক দিকটি লুকিয়ে আছে। কারণ যে সংস্কৃতি নিজেকে ‘বিশুদ্ধ’ দাবি করে, সেটিই প্রায়শই বর্জনের রাজনীতি তৈরি করে। নজরুল সেই বিশুদ্ধতার ধারণাকে ভেঙে দেন। তাঁর কাজ দেখায়—পরিচয় সবসময়ই মিশ্র এবং পরিবর্তনশীল। তাই তিনি শুধু একজন কবি বা সুরকার নন; তিনি এমন একজন চিন্তক, যিনি সংস্কৃতির ভেতরের ক্ষমতা কাঠামোকেই প্রশ্ন করেন।

আজকের বাংলাদেশে, যেখানে ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতি ক্রমশ ‘আমরা বনাম তারা’ কাঠামোর মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ছে, সেখানে নজরুলের চিন্তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক এবং একই সঙ্গে অস্বস্তিকর। কারণ তিনি কোনো একক পক্ষের প্রতিনিধি নন। তিনি একই সঙ্গে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করেন, আবার ধর্মীয় ক্ষমতার সমালোচনা করেন; রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেন, আবার মানুষের সার্বজনীনতাকে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে স্থান দেন; শ্রেণি-অসমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, আবার সংস্কৃতির ভেতরের বিভাজনও ভেঙে দেন। এই কারণেই আমরা তাঁকে উদযাপন করি, কিন্তু পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারি না।

সমাজ স্থির নয়, রাষ্ট্রও পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়, আর মানুষের সংস্কৃতির যাত্রা সবসময়ই চলমান—নজরুল তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের এই সত্যটিই মনে করিয়ে দেন। যতদিন আমরা এই সত্য গ্রহণ করতে না পারব, ততদিন তিনি কেবল কয়েকটি প্রতীকে সীমাবদ্ধ থাকবেন। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম একজনই। তাঁর ভাবনাকে মুছে ফেলা সহজ নয়। আর সেই জায়গাতেই তাঁর সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ এখনো চলমান।

Visited 2 times, 2 visit(s) today
Close