Written by • 11:39 am• স্বাস্থ্য • Views: 4

হাম কেনো ভয়ঙ্কর হলো 

বাংলাদেশের ৫৬টি জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং মৃত্যু ৫০ ছাড়িয়ে গেছে। টিকাদানে অবহেলাকে এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে WHO।

শুধু যথাযথ সময়ে টিকা প্রদানের মাধ্যমে যে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল, সেই ‘হাম’ এখন বাংলাদেশে আবির্ভূত হয়েছে মারণব্যাধি হয়ে। সরকারি দায়িত্ব অবহেলায় প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া ‘হাম’ বর্তমান বাংলাদেশের মূল স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম। দায় চাপানোর রাজনীতির আড়ালে চাপা পড়ছে মৃত্যুর খবর। এরই মধ্যে এলো এক ভয়ঙ্কর সংবাদ! দেশের ৫৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে হাম; আর এই তথ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা!

স্বাস্থ্য খাতের সাফল্যের তালিকায় ওপরের দিকেই ছিল হাম নির্মূলের বিষয়টি। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরু থেকেই সেই চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতে সংক্রামক ব্যাধির টিকা প্রদানে অবহেলার অভিযোগ তুলছে অনেকেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন বলছে—হামের এই প্রচণ্ড হয়ে ফেরার প্রধান কারণ ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয় লিখিতভাবে জানিয়েছে যে, দেশের ৫৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে হামের সংক্রমণ। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল রাঙ্গামাটি, বাগেরহাট, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও বান্দরবান—এই আটটি জেলা বাদে পুরো দেশ এখন হামের গ্রাসে পরিণত হচ্ছে।

হামের আক্রমণে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা বোঝা যায় মৃত্যুর মিছিল দেখে। ঢাকা ট্রিবিউন এবং প্রথম আলোর মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে—সারা দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এরই মধ্যে ৫০ ছাড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে, যার মধ্যে ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসেরও কম। অর্থাৎ, দেশের কনিষ্ঠতম জনগোষ্ঠী এখন সবচেয়ে বেশি জীবনঝুঁকিতে রয়েছে।

ফলে জনতার মনে প্রশ্ন—কেন আবার এমন ভয়ঙ্কর হয়ে ফিরল ‘হাম’? দেশে কোভিড মহামারির সময় টিকাদানে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল, তার ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার এক বা একাধিক ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। গণমাধ্যম বলছে—২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হামের সংক্রমণ প্রতি ১০ লাখে ১-এর নিচে থাকলেও বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে সংক্রমণের হার ১৬.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা দেশব্যাপী বিস্তারের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাব এবং কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যায়ে উপযুক্ত জনবলের ঘাটতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেনের মতে, শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এখন প্রশ্ন হলো, সামনে কী অপেক্ষা করছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, যদি দ্রুত সাড়াদান কার্যক্রম এবং ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’ জোরদার করা না হয়, তবে সংক্রমণ নতুন এলাকায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে। ২০২৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে হাম ও রুবেলা নির্মূল করার যে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ভীতিকর এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সরকারকে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দ্রুত উচ্চমানের দেশব্যাপী টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করা, আক্রান্তদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুলসহ যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সঠিক তথ্য প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানো। একইসঙ্গে যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে পদায়ন করে টিকাদান কর্মসূচিকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

টিকা দিতে উপেক্ষা আর অবহেলার মাশুল দিচ্ছে দেশের শিশুরা। সময় এসেছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে টিকাদান কর্মসূচিকে পুনরায় শক্তিশালী করার, নয়তো ৫৬ জেলার এই সংক্রমণ পুরো মানচিত্রকে বিপন্ন করে তুলবে।

  • 0
  • 0
  • 0
  • 0
Visited 4 times, 1 visit(s) today
↑
Close