Written by • 10:07 am• অর্থনীতি, পড়ুন • Views: 3

বাংলাদেশে লিভিং স্ট্যান্ডার্ড: বেতন, খরচ ও দারিদ্র্যের হিসাব

দারিদ্র্যসীমার হিসাব আর বাস্তব খরচের ফারাক কতটা? বেতন, মূল্যস্ফীতি ও পে-স্কেলের তথ্যে খুঁজে দেখা হয়েছে, বাংলাদেশে লিভিং স্ট্যান্ডার্ড আছে কি না।

“বাংলাদেশে কোনো লিভিং স্ট্যান্ডার্ড নাই, বিদেশে অন্তত একটা আছে।” এই কথাটা আমরা শুনেছি, আড্ডায় বসে বুঝেছি, এবং অনেকে নিজেও বিশ্বাস করি। কিন্তু লিভিং স্ট্যান্ডার্ড আসলে কী? আমাদের কি কখনো সেটা ছিল? বাংলাদেশে বেতন আর খরচের কোনো মিল আছে কি? একজন রিকশাচালক, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী, এমনকি সদ্য পে-স্কেল বাড়া সরকারি কর্মচারী… কারো জীবনে কি লিভিং স্ট্যান্ডার্ড আছে?

আপনি গরিব না ধনী, এটা বুঝবেন কীভাবে? মাসে গড়ে ৩,৮২২ টাকা খরচের সামর্থ্য থাকলে সরকারি হিসাবে আপনি আর গরিব নন; এদিকে খাবার, বাসা, যাতায়াত, চিকিৎসা, সব কিন্তু এই টাকার মধ্যেই। অথচ জাতিসংঘের হিসাবে ২০২৫ সালে একজনের শুধু স্বাস্থ্যকর খাবারেই লাগে দিনে প্রায় ১৬০ টাকা, মাসে প্রায় ৪,৮০০। রাষ্ট্র যাকে “দরিদ্র নয়” বলছে, তার পুরো মাসের বাজেটেও নিজের পুষ্টিকর খাবারটুকু হয় না। তাহলে রিকশাচালক, বেসরকারি চাকরিজীবী, এমনকি সদ্য পে-স্কেল বাড়া সরকারি কর্মচারী, কারো জীবনে কি লিভিং স্ট্যান্ডার্ড এসেছে?

উন্নত দেশে লিভিং স্ট্যান্ডার্ড একটা মাপার বিষয়। সেখানে কত টাকায় একটা পরিবার মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারবে, সেই হিসাব ধরে তার বেতনের দরকষাকষি হয়। ২০২৪ সালের মার্চে আইএলও-র সংজ্ঞা বলছে, স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার মজুরিতে একজন শ্রমিক ও তার পরিবার স্ট্যান্ডার্ড জীবন চালাতে পারলে সেটাই লিভিং ওয়েজ। সহজ কথায়, আপনি কত আয় করেন তা নয়; সেই টাকায় কেমন জীবন কিনতে পারেন, সেটাই লিভিং স্ট্যান্ডার্ড।

এখন ভেবে দেখেন, আপনি সেই স্ট্যান্ডার্ডের জীবনযাপন করেন কি না! গবেষকদের অ্যাঙ্কার পদ্ধতিতে গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ঢাকায় চার সদস্যের পরিবারের দেড়জনের বেশি উপার্জনকারী ধরলে স্ট্যান্ডার্ড জীবনের খরচ দাঁড়ায় মাসে ৪৮,০২২ টাকা। এদিকে আমাদের সরকারের এমন লিভিং স্ট্যান্ডার্ডের কোনো মাপ নেই; আমাদের আছে শুধু দারিদ্র্যসীমা। মানে, টিকে আছি কি না তার হিসাব আছে সরকারের কাছে। এখন টিকে তো রাস্তার কুকুরও আছে। তাহলে মানুষ হিসেবে আমাদের প্রাপ্য কি এটুকুই?

আচ্ছা, আমাদের কি কখনো স্ট্যান্ডার্ড লিভিং ছিল? বিশ্বব্যাংকের নভেম্বর ২০২৫-এর মূল্যায়ন বলছে, ২০১০ থেকে ২০২২ সালে দারিদ্র্য ৩৭.১% থেকে নেমে ১৮.৭% হয়েছে, ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়েছে। কিন্তু ২০১৬-র পর প্রবৃদ্ধির সুফলের বড় অংশ গেছে ধনী পরিবারে; আয়-বৈষম্যের গিনি সূচক ৫১ থেকে উঠেছে ৫৪-তে। দেশ গড়ে এগিয়েছে, কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের কেনার ক্ষমতা প্রায় এগোয়নি।

এদিকে ২০২২ থেকে শুরু হয় উল্টো যাত্রা। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দারিদ্র্য বেড়ে হয়েছে ২১.২%; পিপিআরসির জরিপে ২৭.৯৩%। যদিও তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এই গবেষণার ফোন-জরিপের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু দারিদ্র্য যে বেড়েছে, এটা নিয়ে তো কোনো সন্দেহ নাই।

আবার, জাতিসংঘের ২০২৬ সালের খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশের ৩৮.৬% মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারেনি। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দারিদ্র্য তখন ছিল একুশের ঘরে। দুটো আলাদা পদ্ধতির হিসাব হলেও এটা পরিষ্কার যে, মোটামুটি প্রতি ছয়জনে একজন বাংলাদেশি গরিবের খাতায় নেই। কিন্তু তার আবার পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। তাহলে হিসাব কি মিলল?

বাস্তব উদাহরণ বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে মোহাম্মদপুরের রিকশাচালক আলমগীরের বনরুটি-চায়ের নাশতা ২০ থেকে ২৫ টাকা হয়েছে। পাঁচ টাকা বাড়তি শুনতে কিছুই না, প্রতিদিন হলে মাসে ১৫০। নিরাপত্তাকর্মী আনসার হোসেন আর গৃহকর্মী স্ত্রীর মিলিত আয় প্রায় ২০ হাজার; অথচ ঢাকায় চারজনের শুধু খাবারেই লাগে ২৬,৮৮৪ টাকা। মাস শেষে ধার ছাড়া উপায় নেই।

এটা ব্যতিক্রম নয়। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এ বেতনভোগীর গড় আয় ১৫,৫৫৪ টাকা, আর কর্মজীবীদের ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে বেতন সমন্বয়ের কোনো নিয়ম নেই। পোশাকশ্রমিকের ১২,৫০০ টাকার মজুরি ঠিক হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে; আইনে তিন বছর পর পর্যালোচনার কথা, অথচ শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে মজুরি বোর্ডই গঠিত হয়নি।

বেসরকারি অফিসেও ছবিটা একই। গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ রুবাবা হাসান বলেছেন, বাজার খবরে সাড়া দেয় ব্যাংকের চেয়ে দ্রুত; বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়ানোর আগে জিজ্ঞেস করে না তিনি সরকারি চাকরি করেন কি না। বিবিএসও কাছাকাছি কথা বলে: আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৮.২৬%, মজুরি বৃদ্ধি ৮.০৫%।

আর সরকারি কর্মচারী? ১১ জুনের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিজেই বলেছেন, প্রায় ১১ বছর তাঁরা একই স্কেলে ছিলেন। তাই নতুন পে-স্কেলের বড় অংশ ক্ষতিপূরণ। সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ থেকে ২০,০০০ হলেও প্রথম ধাপে মিলছে বর্ধিত অংশের অর্ধেক, অর্থাৎ প্রায় ১৪,১২৫। পুরো কাঠামোয় ঢাকায় ভাতাসহ সর্বনিম্ন বেতন ৩৬ হাজারের কিছু বেশি; তাতেও চারজনের খাবারেই যায় প্রায় ৭৫ শতাংশ টাকা।

তাহলে মানুষ মাস পার করছে কীভাবে? প্রথমেই মানুষের খাদ্য তালিকা থেকে কাটা পড়ে প্রোটিন, তারপর সঞ্চয়, তারপর আসে ধার। শেষে পরিবারের আরেকজনকে কাজে পাঠাতে হয়। কিন্তু সেই দরজাও এখন সংকুচিত হচ্ছে। কারণ, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৪ সালে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন, যাঁদের ২৪ লাখই নারী। আর দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ একটা অসুখ বা দুর্যোগেই আবার দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছেন।

এই দায় তাহলে কার? সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ বলছে, জীবনযাত্রার মানের অবিরাম উন্নতি ঘটিয়ে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব; যদিও ৮(২) অনুচ্ছেদে তা আদালতে দাবিযোগ্য নয়। ১৯৭২ সালের গণপরিষদে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন আশ্বাস দিয়েছিলেন, সামর্থ্য হলে এগুলো ধীরে ধীরে পূরণ হবে।

আমাদের সামনে তাহলে কী আসছে? ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের রিপোর্ট বলছে, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪%, মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯% হবে। সরকারের লক্ষ্য যেখানে ৬.৫% ও ৭.৫%। প্রবাসী আয়ে ভোগ চলবে, কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের কেনার ক্ষমতা কমাতেই থাকবে।

তাহলে, স্বাধীনতার পর নতুন রাজনৈতিক সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল, ধীরে ধীরে হবে। কিন্তু ৫৪ বছর পরও আমরা একই দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। তাহলে, আমরা কি লিভিং স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করছি, নাকি কোনো রকমে শুধু টিকে আছি?

  • 0
  • 0
  • 0
  • 0
Visited 3 times, 3 visit(s) today
↑
Close