একটা শিশু ধর্ষিত হয়েছে। মানুষ রাস্তায় নেমেছে। দাবি একটাই—প্রকাশ্যে ফাঁসি দাও।
মন্ত্রী বললেন, এটা মধ্যযুগীয়। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো আরেক ঝড়—‘এটা নাকি রাসূল (সা.)-এর অবমাননা!’ এখন প্রশ্ন হলো—আর জামায়াত বা তার মতো অন্য ইসলামিক দল এবং ইসলামি বক্তারা হঠাৎ এত প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠলেন কেন?
সেই বিষয়টা একটু বোঝার চেষ্টা করি বরং।
আচ্ছা, ‘মধ্যযুগীয়’ শব্দটা শুনলেই মনে হয়—আরে, এটা ইসলামকে গালি দেওয়া হচ্ছে? না। মধ্যযুগ মানে ৫ম থেকে ১৫শ শতক পর্যন্ত ইউরোপের একটা বিশেষ সময়কাল। সেই সময়ে রাজা বা গির্জার বাইরে কোনো আইন ছিল না। আপনি অভিযুক্ত? তাহলে প্রমাণ করতে হবে আগুনে হাত দিয়ে যে আপনি নির্দোষ। পুড়ে গেলে দোষী, না পুড়লে নির্দোষ। আর শাস্তি? জনসম্মুখে মাথা কাটা, শরীর ঝুলিয়ে রাখা। কেন? কারণ এটা রাজার ক্ষমতার বিজ্ঞাপন।
মিশেল ফুকো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ: দ্য বার্থ অফ দ্য প্রিজন”-এ জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড বা নির্যাতনের রাজনৈতিক দিকটি আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে মধ্যযুগে ও প্রাক-আধুনিক যুগে রাজা বা সার্বভৌম শাসক তাঁর ক্ষমতা জাহির করতে প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড বা শরীরকে চরম শাস্তির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। ফুকোর মতে, এই আনুষ্ঠানিকতার উদ্দেশ্য ছিল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি পুরো সমাজকে শাসক বা রাজার অসীম ক্ষমতার প্রদর্শনী দেখানো এবং এই বার্তা দেওয়া যে, অপরাধীর শরীর ও জীবনের ওপর কেবল রাজারই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তো এই ধারণাটার সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক কোথায়? কোথাও না। ‘মধ্যযুগীয়’ একটা ঐতিহাসিক টার্ম—ধর্মীয় অবমাননা না।
এখন অনেকে বলবেন—ঠিক আছে, ঐতিহাসিক তর্ক বাদ দেন। ধর্ষকদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দিলে কি অপরাধ কমবে না? এটা ভালো প্রশ্ন। উত্তরটা দেয় অপরাধবিজ্ঞান, মানে ক্রিমিনোলজি। গবেষণা বলে—শাস্তির নৃশংসতা দিয়ে অপরাধ কমে না। অপরাধ কমে শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে। মানুষ অপরাধ করে কারণ সে মনে করে ধরা পড়বে না—ফাঁসির ভয়ে নয়। যেসব দেশে শাস্তি সবচেয়ে কঠোর, সেসব দেশ কি সবচেয়ে নিরাপদ? তালেবান স্টেডিয়ামে মানুষ হত্যা করেছে, আফগানিস্তানে কি নারী নিরাপদ? সৌদি আরবে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ হয়, সেখানে কি অপরাধ নেই?
অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্রগুলো গড়ে উঠেছে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড এবং ডেনমার্কের মতো আইনের শাসনভিত্তিক স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বা নর্ডিক দেশগুলোতে। সেখানে মৃত্যুদণ্ডই নেই। কারণ তারা বিনিয়োগ করেছে শক্তিশালী ফরেনসিক সিস্টেম, দ্রুত বিচার, সাক্ষী সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অস্থিতিশীল এলাকা যেমন কাবুলের মতো অঞ্চলে এই মানের রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হয়নি। তেলে ভাসা ধনী দেশ সৌদি আরবেও হয়নি।
এখন আসি জামায়াতের কথায়। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন—সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই ‘মদিনার সনদের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা’ এবং ‘শরিয়াবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন না করার’ মৌখিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। অথচ বাস্তবে ইসলামী শরিয়া আইনকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলে হেয় প্রতিপন্ন করার মাধ্যমে তাদের আদর্শিক দেউলিয়াত্ব, সস্তা রাজনৈতিক অবস্থান এবং দ্বিচারিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তাদের কৌশলটা আসলে খুব পুরনো—কোনো নীতিগত বিতর্ককে ধর্মীয় অবমাননার প্রশ্নে রূপান্তর করো। জনগণের আবেগ একত্রিত করো। তারপর নিজেকে ইসলামের একমাত্র পাহারাদার হিসেবে হাজির করো।
কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক ও গবেষক ড. লুবনা তুরিন। তিনি বলছেন—এই একই জামায়াত, যখন তাদের নিজেদের নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হলো, তখন তারাই সবচেয়ে জোরে বলেছিল—‘সন্দেহাতীত প্রমাণ নেই।’ ‘আন্তর্জাতিক মান মানা হয়নি। বিচার রাজনৈতিক।’ তখন তাদের ফরেনসিক এভিডেন্স লাগে, ডিউ প্রসেস লাগে, আপিলের সুযোগ লাগে। মানে, নিজেদের জন্য—জেনেভা কনভেনশন। বাকিদের জন্য—প্রকাশ্যে ফাঁসি। এই দ্বিচারিতার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।
তাহলে এবার একটা সহজ প্রশ্ন করি—যখন মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে—তখন এই একই মহলের কাছ থেকে কী শোনা যায়? তারা বলেন—‘DNA টেস্ট হয়েছে?’ ‘হুজুরকে ফাঁসানো হচ্ছে। ষড়যন্ত্র হতে পারে।’ আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করি—মাদ্রাসায় ছাত্রদের ওপর নিপীড়ন হয়, বলাৎকার হয়—সেটা কি কোনো জামায়াত নেতা বা ইসলামপন্থী দল বা ওয়াজে কখনও কথা বলতে শুনেছেন? প্রতিবাদ দেখেছেন কোথাও? তখন কোথায় যায় প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবি? তখন কোথায় যায় শিশু সুরক্ষার এই তীব্র আবেগ? এই প্রশ্নের উত্তর একটাই—এই ক্রোধ শিশুর জন্য না। এই ক্রোধ রাজনৈতিক হাতিয়ার।
তাহলে আসল কথায় আসি। বাংলাদেশে ধর্ষণ বাড়ছে কারণ শাস্তি কম কঠোর—এটা না। বাড়ছে কারণ—বিচার দেরিতে হয়। সাক্ষী হুমকিতে থাকে। ফরেনসিক ব্যবস্থা দুর্বল। পুলিশের জবাবদিহি নেই। ক্ষমতাশালীরা পার পেয়ে যায়। আমরা বিচার ব্যবস্থাকে একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলিনি—গবেষক তুরিন যেমন বলছেন, বাংলাদেশের ট্র্যাজেডি হলো, আমরা এখনো বিচারব্যবস্থাকে ইনস্টিটিউশন হিসেবে না দেখে revenge theatre হিসেবে দেখি। যেন ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য জনতার রাগ শান্ত করা।
তাই ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে দরকার দ্রুত বিচার। সাক্ষীর নিরাপত্তা। ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন। পুলিশের দক্ষতা। আর সমাজে লিঙ্গ সমতার সংস্কৃতি। টাউন স্কয়ারে ফাঁসি দিয়ে সমাজ নিরাপদ হয় না। ইতিহাস সেটা বারবার প্রমাণ করেছে। মানুষের ক্ষোভ আছে, এটা সত্য। একটা শিশুর সঙ্গে যা হয়েছে, তাতে রাগ না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। কিন্তু ক্রোধ এবং সমাধান—এক জিনিস না। আমরা যদি সত্যিই এই শিশুদের জন্য কিছু করতে চাই, তাহলে দরকার বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা—উত্তেজনায় ভেসে গিয়ে আরেকটা তামাশার মঞ্চ তৈরি করা না।
