Written by 5:39 am মতামত Views: 5

‘বাল্যবিবাহ’ শুধু মেয়েদের জন্য বিপদ নয়, পুরুষের জন্যও বিপদ!

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ শুধু মেয়েদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নয়, ছেলেদের জীবনকেও প্রভাবিত করছে—সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও গবেষণার আলোকে বিশ্লেষণ।

কয়েকটা পরিসংখ্যান দিয়ে আলাপটা শুরু করতে চাই। ২০২৫ এর নভেম্বরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ প্রকাশিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে নামের এক প্রতিবেদন দেখা যাচ্ছে দেশে অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রতি দুটি মেয়ের মধ্যে একটি মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। দেশজুড়ে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৫৬ শতাংশ। বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরী মাতৃত্বও বেড়েছে। কিশোরী অবস্থায় প্রতি ১০০০ জনে ৯২ জন মা হয়ে যাচ্ছে।

এতো গেল স্বাস্থ্যের কথা, কিন্তু এই বাল্যবিবাহের একটা ক্ষতিকর দিক আছে সেটা ভেবেছেন কখনও? মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বলছে, বাল্যবিবাহের ফলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের সম্ভাবনার দিক থেকে বছরে সাত থেকে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমান গতিতে চললে বাল্যবিবাহমুক্ত দেশ গড়তে ৬৪ বছরের বেশি সময় লাগবে।

এতো নেতিবাচকতা যে বিষয়টিতে তাতেই থামছে না এই বিয়ে। বরং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে হেল্পলাইন ১০৯ এর হিসাব জানাচ্ছে, বাল্যবিবাহের অভিযোগে এ বছর এখন পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে আটটি করে অভিযোগ এসেছে। ২০২৫ সালে ছিল ৯৯১টি, ২০২৪ সালে ছিল ৮৬৫টি।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো আমরা ধরেই নিই যে বাল্যবিবাহের প্রকোপ হয়তো কেবল নিম্নবিত্ত পরিবারেই। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবরে ব্র্যাকের “বর্ন টু বি আ ব্রাইড” শিরোনামের এক জরিপ বলছে, বাল্যবিবাহের পেছনে দারিদ্র্য বড় কারণ বলা হলেও ধনী ও মধ্যবিত্ত পরিবারেও বাল্যবিবাহের উচ্চ হার রয়েছে। বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি দরিদ্র পরিবারে, ৬০ শতাংশের মতো। তুলনামূলক কম দরিদ্র পরিবারে এ হার প্রায় ৬২ শতাংশ, মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রায় ৫৫ শতাংশ, উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে ৫৪ শতাংশের বেশি ও উচ্চবিত্ত পরিবারে ৫০ শতাংশের বেশি। যে পরিবারে একটি মাত্র মেয়ে, সেখানে বাল্যবিবাহের হার অস্বাভাবিক হারে বেশি—৮৯ শতাংশ।

কিন্তু এই যে সমাজের প্রায় সব স্তরের নারীর বাল্যবিবাহ একটা ব্যাধির মতো ছড়িয়ে গেছে, সেখানে কি কখনও ভাবা হয় যে মেয়েটি বিয়ের জন্য প্রস্তুত কিনা? একটা মেয়েকে কি বিয়ের জন্য তৈরি করা হয়? মেয়েদের বিয়ের জন্য তৈরি করা মানে নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত প্রায় সব পর্যায়ই মোটা দাগে বোঝে ঘরকন্যার কাজের জন্য তৈরি করা।

মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম প্রথম আলোকে বলেন, “তাঁদের সময়ে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানো হতো মূলত বিয়ের বাজারে দাম বাড়ানোর জন্য। বিয়েটাই ছিল মূল লক্ষ্য। মেয়েটিকে বিয়ের জন্য কীভাবে তৈরি করা হবে, সেটাই ভাবা হতো।”

নারীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবা হয় না। এবং একই সাথে ভাবা হয় না যে শিশুশ্রম আর বিয়ের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। ভেবে দেখুন, বাংলাদেশে ১৭ বছর বয়সে কোন ছেলে বিয়ে করলে তাকে উপার্জনের জন্য কেউ চাপ দেয় না। ১৭ বছরের শিশুটিকে সবাই ছোট হিসেবেই দেখে। সবাই স্বাভাবিকভাবেই মনে করে—১৭ বছরের বিবাহিত এই ছেলে বড় হয়ে টাকা কামাবে। আপাতত তার বেকার থাকা বা ছাত্র থাকা স্বাভাবিক। ১৭ বছরের এই শিশু মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয় না। তার বাড়ি, বাবা ও পরিবারের সুরক্ষা, বন্ধন তাকে ত্যাগ করতে হয় না।

কিন্তু ১৭ বছরের বা এমনকি ১৪ বছরে বিবাহিত কোন মেয়ের বেকার থাকা স্বাভাবিক নয়। বিয়ের পর তাকে পেশায় যুক্ত হতে হবেই। এই পেশার নাম “ঘরের কাজ” বা “গৃহিণী”। যেটাকে আবার বেশিরভাগ ছেলেরা কোন কাজই মনে করে না।

শিশু অবস্থায় মাতৃস্নেহ ছেড়ে, পরিবারের আরাম আর নিরাপত্তা ছেড়ে মেয়েটাকে আরেকটা বাসায় আসতে হয়। এসেই শুরু হয় শিশুশ্রম। ঘরের মেয়ে কাজ করবে না—এটা তবু বাংলাদেশের মায়েরা মেনে নিতে পারে। কিন্তু ঘরের বউ কাজ করবে না, এটা বাংলাদেশের সাধারণ শাশুড়িরা মানতে পারে না। ফলে তাকে শ্রমিক হতেই হয়।

কিন্তু চাপ থেকে কি ছেলেটা মুক্ত পায়? যে ছেলেটা একটা ১৪ বা ১৭ বছরের মেয়ে বিয়ে করছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার বয়স ২০ থেকে ২৫ এর মধ্যে। এই দেশে পরিবারের টাকা পয়সার দায়িত্ব কাকে নিতে হয়? একটা ছেলেকেই নিতে হয়। ২৫ বছরের কমে এই দেশে কেউ অনার্স করে বের হতে পারে না। চার সদস্যের পরিবার চালানোর মত আয় করতে একটা ছেলের বয়স ২৮ পার হয়ে যায়। সে হিসেবে ১৮ বছর বয়সে সে কচি খোকা। তার কৈশোর, তারুণ্য, বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি, কক্সবাজার ঘুরতে যাওয়া, একটা বাইক কেনার স্বপ্ন—এসব ছাই দিয়ে আপনি কেন তার গলায় একটা মেয়ে ঝুলিয়ে দিতে চান?

এই দেশের বেশিরভাগ ছেলে এই ছোটে, একটু যৌতুকের লোভে তারুণ্যকে বিসর্জন দিয়ে মেয়ে+টাকা বেছে নেয়। কিছু বছর বিবাহিত জীবন কাটানোর পর তার মনে হয়, “ওহহ! তাহলে এই ছিল ব্যাপার। তারপর?” তারপরের উত্তর পায় না সে। তারপর তার যৌতুকের ২/৫ লাখ দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তারপর বয়সের দোষে, বোরিং লাগায় ও শিশু মস্তিষ্কের সিদ্ধান্তে বা অসাবধানতায় তার একটা সন্তান হয়। এবং সন্তান হওয়ার পর সে বুঝে কত ধানে কত চাল। সে মনে মনে তওবা করে—এই অর্থনীতিতে আর কোনদিন বাচ্চা নেবে না। তার সব ছুটি হারাম হয়ে যায়। মরো বা বাঁচো, আগামী ২৫ বছর এই বাচ্চাকে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, সময়, আদর, ধৈর্যের পরীক্ষা তোমাকে দিতেই হবে।

২০২৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার জন্মহার বেড়েছে। এটা শিশুবিবাহের সরাসরি ফলাফল। স্বাধীনতার পর এই প্রথম দেশে মাতৃমৃত্যুর হার বেড়েছে। আমরা উল্টো পথে হাঁটছি।

একই সাথে অধিক শিশু বিবাহ এবং তার ফলে স্বল্পকালীন ব্যবধানে অধিক জন্মহার—এর প্রভাব আমরা ৫-১০ বছরে আমাদের অর্থনীতিতে দেখব।

Visited 5 times, 1 visit(s) today
Close