মরিচ আসলে কী? ফল? সবজি? নাকি মসলা?
কেজিতে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা অব্দি দাম ওঠার পরও যে জিনিসটা ছাড়া বাঙালির একবেলা ভাত খাওয়ার কথা ভাবাই যায় না, তা হলো কাঁচা মরিচ। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, যে মরিচের জন্য আজ আমরা এতটা দিশেহারা, ৫০০ বছর আগেও আমাদের এই অঞ্চলে সেই মরিচের কোনো অস্তিত্বই ছিল না? তাহলে ৫০০ বছর আগে বাঙালি ঝাল খেত কীভাবে? সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আসা এক পরদেশী ফলের বাঙালি হয়ে ওঠার গল্প আপনি জানেন কি? কীভাবে এক পরদেশী রাজকুমারী আমাদের রান্নাঘরের মূল প্রাণ হয়ে উঠল, চলুন, জেনে নেওয়া যাক।
গল্পটার শুরু ইউরোপের এক বিশাল মসলা সংকট থেকে। তখন ইউরোপীয়দের কাছে রান্নায় ঝাল ও স্বাদ আনার একমাত্র উপায় ছিল ‘গোলমরিচ’। এই গোলমরিচের খোঁজেই কি বদলে গিয়েছিল পৃথিবীর মানচিত্র? একদম তাই! ১৪৯২ সালে নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস ভারতের সেই বিখ্যাত গোলমরিচের খোঁজে জলপথে পূর্ব দিকে না গিয়ে ভুল করে চলে গেলেন পশ্চিমের এক অজানা মহাদেশে—আমেরিকায়।
সেখানে গিয়ে কলম্বাস দেখলেন, স্থানীয় আমেরিকান আদিবাসীরা প্রায় ৪,০০০ থেকে ৭,৫০০ বছর ধরে ‘আজি’ (Aji) নামের এক তীব্র ঝাল ফল দিয়ে রান্না করছে। গোলমরিচের মতো ঝাঁজালো স্বাদ পেয়ে কলম্বাস এই নতুন ফলের নামও দিয়ে বসলেন ‘পিপার’। এরপর তিনি জাহাজ বোঝাই করে সেই ‘পিপার’ স্পেনে নিয়ে যান এবং সান্তা মারিয়ার গির্জার সাধুদের উপহার দেন—যেখান থেকে ইউরোপে এর পথচলা শুরু হয়।
কিন্তু ইউরোপ ঘুরে এই মরিচ আমাদের ভারতবর্ষে এল কীভাবে? পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামার নৌবহর ব্রাজিল থেকে মরিচের বীজ নিয়ে আসে ভারতের গোয়ায়। মুম্বাইয়ের বাজারে প্রথম দিকে এর নাম হয় ‘গোয়া মির্চ’। কিন্তু ভারতের শতবর্ষী রাজা ‘গোলমরিচ’-কে এই নতুন ফল হারিয়ে দিল কীভাবে?
কারণটা খুব হিসেবি! গোলমরিচ কেনা ছিল ব্যয়বহুল, অন্যদিকে মরিচ ঘরের উঠোনেই বিনামূল্যে ফলানো যেত। সুবিধার কারণে খুব দ্রুতই রাজকীয় গোলমরিচের সিংহাসন দখল করে নিল এই সহজলভ্য মরিচ। ভাস্কো দা গামার ভারতে আসার মাত্র ত্রিশ বছরের মধ্যেই গোয়ার আশপাশে অন্তত তিন জাতের মরিচ গাছ দেখা যেতে শুরু করে।
আপনি কি জানেন, আমাদের ‘মরিচ’ শব্দটির আসল মালিক কে ছিল? ‘মরিচ’ বা ‘মরীচ’ আদতে ছিল গোলমরিচের সংস্কৃত নাম। নতুন এই ফলটি আসার পর মানুষ গোলমরিচের নামের সাথে মিলিয়েই এর নাম রেখে দেয় ‘মরিচ’।
দেখতে দেখতে এটি আমাদের সংস্কৃতিতে এমনভাবে মিশে গেল যে, বিদেশী উপাদান গ্রহণে অনাগ্রহী আয়ুর্বেদ চিকিৎসকেরাও একে ওষুধ হিসেবে গ্রহণ করলেন। এমনকি জ্যোতির্বিদ খনার বচনেও ঠাঁই পেল মরিচ চাষের উপায়—“ছাইয়ে লাউ, উঠোনে ঝাল”।
যে বিদেশী ফলকে একসময় এদেশের মানুষ চিনতই না, আজ তা বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও আবেগ-অনুভূতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই পরের বার ভাতের পাতে মরিচে কামড় দেওয়ার সময় মনে রাখবেন—একটি ভুল সিদ্ধান্ত আর ৫০০ বছরের ইতিহাস তৈরি করেছে বাঙালির এই ঝাল ভালোবাসা!
- 0
- 0
- 0
- 0
