গৌতম ২৯ বছর বয়সে এক মধ্যরাতে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। পেছনে ফেলে যান পরিবার আর সহায়-সম্পত্তি। তিনি সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে গৃহহীন ভবঘুরে হিসেবে ঘুরে বেড়ান এবং খুঁজতে থাকেন দুঃখ থেকে রক্ষা পাওয়ার পথ।
আশ্রমে আশ্রমে ঘুরে তিনি গুরুদের পদতলে বসে থাকেন। কিন্তু কিছুই তাকে পুরোপুরি মুক্তি দেয়না। কিছু না কিছু অতৃপ্তি সবসময় থেকে যায়। তিনি হতাশ হননি। গৌতম নিজেই অনুসন্ধানে ব্রতী হতে স্থিরপ্রতিজ্ঞ হন যতদিন পর্যন্ত না সম্পূর্ণ মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া যায়।
গৌতম ছয় বছর ধরে ধ্যান করেন মানুষের যন্ত্রণার সার, কারণ এবং উপশম খুঁজে পেতে। শেষতক তিনি বুঝতে পারেন যে দুঃখের কারণ দুর্ভাগ্য, সামাজিক অবিচার বা ঐশ্বরিক খেয়াল নয়। বরং, পীড়ার কারণ হলো আমাদের মনের আচরণের ধরন।
গৌতম উপলব্ধি করেছিলেন যে, মন যেই অভিজ্ঞতাই লাভ করুক না কেন তা সাধারণত কামনার জন্ম দেয় এবং কামনা সব সময়ই সাথে আনে অতৃপ্তি।
যখন মন কোনো অরুচিকর কিছু প্রত্যক্ষ করে, তখন সে চায় সেই বিরক্তি ঝেড়ে ফেলতে। যখন মন কোনো সুখকর কিছু প্রত্যক্ষ করে, তখন তার বাসনা হয় এই তৃপ্তি যেন টিকে থাকে এবং তীব্রতর হয়। এ কারণে মন সবসময় অতৃপ্ত ও অস্থির থাকে।
এটি পরিষ্কার বোঝা যায় যখন আমরা কোনো অপ্রীতিকর কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করি, যেমন ব্যথা। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যথা অনুভূত হয়, ততক্ষণ আমরা অতৃপ্ত থাকি এবং ব্যথা এড়াতে সাধ্যমত সবকিছু করি।
তথাপি যখন আমরা আনন্দময় কিছুর অভিজ্ঞতা পাই, তখনও আমরা তৃপ্ত হই না। আমরা ভয় পাই যে হয়তো এই আনন্দ মুছে যাবে। আকাঙ্ক্ষা করি যেন আনন্দ কেবল বাড়তেই থাকে।
মানুষ বছরের পর বছর ভালোবাসা খুঁজে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে কিন্তু খুঁজে পেলে কদাচিৎ তৃপ্ত হয়। কেউ কেউ উদ্বিগ্ন হয়, তার সাথী তাকে ছেড়ে চলে যাবে এই ভেবে। আবার কেউ কেউ ভাবে, সস্তায় থিতু হলো বোধ হয়, হয়তো আরও ভালো কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত। আমরা সবাই এমন মানুষকে চিনি যারা আবার এই দুই দিকেই আছেন।
মহৎ দেবতারা আমাদের জন্য বৃষ্টি পাঠাতে পারেন, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যায়বিচার ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারে এবং সৌভাগ্যক্রমে আমরা কোটিপতিও হয়ে যেতে পারি। কিন্তু এর কোনোটাই আমাদের মনের ছাঁচের মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে না। এই কারণে পরাক্রমশালী রাজারাও উৎকণ্ঠার মধ্যে বাঁচে, নিরন্তর দুঃখ ও যন্ত্রণা পায়, আর জীবনভর আরও বেশি ভোগের পেছনে ছোটে।
গৌতম আবিষ্কার করেছিলেন যে এই দুষ্টচক্র থেকে বের হবার একটা উপায় আছে। যখন কোনো আনন্দ বা বিষাদের অভিজ্ঞতা হয় তখন মন যদি এগুলো ঠিক যেমন শুধু সেভাবেই এদের গ্রহণ করে তবে আর পীড়া থাকবে না।
যদি তুমি দুঃখের অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করো দুঃখ প্রশমিত হবার আকাঙ্ক্ষা বাদ দিতে পার তবে তুমি হয়তো দুঃখ পাবে ঠিকই কিন্তু এর থেকে পীড়ন অনুভব করবে না। আসলে, দুঃখের মধ্যেও প্রাপ্তি থাকতে পারে। যদি তুমি আনন্দের অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করো একে দীর্ঘায়িত ও তীব্রতর করার বাসনা বাদ দিয়ে তবে তুমি তোমার মনের শান্তি নষ্ট না করেই আনন্দটুকু অনুভব করতে থাকবে।
কিন্তু কামনা বাদ দিয়ে মনকে দিয়ে কীভাবে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা যেমন আছে তেমনভাবেই গ্রহণ করানো সম্ভব? দুঃখকে দুঃখ, আনন্দকে আনন্দ, বেদনাকে নিছক বেদনা হিসেবে কী করে গ্রহণ করা যায়?
গৌতম কিছু ধ্যানের কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন, যেগুলো বাসনা বাদ দিয়ে বাস্তবতা যেমন আছে তেমনভাবেই গ্রহণ করতে মনকে অনুশীলন করায়।
এ চর্চা মনকে শিক্ষা দেয় সমস্ত মনোযোগ ‘আমি কী অর্জন করতে পারতাম?’- এর পরিবর্তে, ‘আমি এখন কী অভিজ্ঞতা অর্জন করছি?’ এই প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত করতে। এরকম মনের অবস্থা অর্জন করা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। গৌতম এই ধ্যানের কৌশলগুলোর ভিত্তি প্রোথিত করেছিলেন কিছু নৈতিক নীতিমালার মধ্যে, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল কামনা ও কল্পনাকে এড়িয়ে প্রকৃত অভিজ্ঞতার উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করাকে সহজতর করে তোলা।
তিনি তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন খুন, ব্যাভিচার এবং চুরি করা এড়িয়ে চলতে যেহেতু এগুলো বাসনার আগুনকে উস্কে দেয় (ক্ষমতা , ইন্দ্রিয়সুখ অথবা সম্পদের জন্য)। যখন এই আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে ফেলা যাবে, তখন বাসনাকে প্রতিস্থাপন করবে পরিপূর্ণ তৃপ্তি ও প্রশান্তি, যাকে বলা হয় নির্বাণ (এর আভিধানিক অর্থ আগুন নেভানো)। যারা নির্বাণ লাভ করেছেন, তারা সমস্ত পীড়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তারা বাস্তবতার অভিজ্ঞতা লাভ করেন কল্পনামুক্ত এবং ভ্রান্তিহীন পরম স্বচ্ছতার সাথে। অপ্রীতিকর অবস্থা এবং বেদনার মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাগুলো তাদের জন্য দুর্দশা বয়ে আনে না।
যে মানুষ আকাঙ্ক্ষা করে না, সে পীড়নও অনুভব করে না।
বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, গৌতম নিজে নির্বাণ লাভ করেছিলেন এবং সবরকম দুঃখ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। সে কারণে তিনি পরিচিত হন ‘বুদ্ধ’ নামে, যার অর্থ ‘আলোকিত জন’।
বুদ্ধ তার বাকি জীবন অতিবাহিত করেছিলেন অন্যদের কাছে এই আবিষ্কারের ব্যাখ্যা প্রচার করে, যাতে তারাও পীড়ন থেকে মুক্ত হয় । তিনি তার শিক্ষাকে একটি একক অনুশাসনের মধ্যে আবদ্ধ করেছিলেন: পীড়ার উৎপত্তি হয় বাসনা থেকে; পীড়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হবার একমাত্র উপায় হলো বাসনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া; এবং বাসনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হবার একমাত্র উপায় হলো বাস্তবতা যেমন তাকে ঠিক সেভাবেই মেনে নিতে মনকে অনুশীলন করানো।
‘ধর্ম’ বা ‘ধৰ্ম্ম’ নামে পরিচিত এই বিধানকে বৌদ্ধরা প্রকৃতির বিশ্বজনীন নিয়ম হিসেবে গণ্য করে। ‘পীড়ার উৎপত্তি হয় বাসনা থেকে’ একথা সর্বদা এবং সর্বত্র সত্য, যেমন আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে E সবসময় mc2- এর সমান। বৌদ্ধরা এই বিধানে বিশ্বাস করে এবং তাদের সমস্ত কার্যক্রমের অবলম্বন হিসেবে একে গ্রহণ করে।
জগতের সকল প্রাণী সুখি হোক।



