Trial & Beta Version

Homeবিশেষ পোস্টলামিয়ার আত্মহত্যা ও দশটি তীব্র প্রশ্ন

লামিয়ার আত্মহত্যা ও দশটি তীব্র প্রশ্ন

Date:

গণঅভ্যুত্থানের হাত ধরে আসা নতুন নেতৃত্বের বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশের এক শহীদের কন্যা, ১৭ বছরের কলেজছাত্রী লামিয়া। পটুয়াখালীর পাংগাশিয়ায় বাবার কবর জিয়ারত করে নানাবাড়িতে ফেরার পথে ধর্ষিত হয় সে। ধর্ষণকারীরা তার ছবি তোলে, ভিডিও করে, এবং হুমকি দেয়—‘কাউকে বললে ছড়িয়ে দেবো।’

তবু লামিয়া ভয় পায়নি; নিজেই থানায় মামলা করে, দুজনকে গ্রেপ্তারও হয়, তারা আদালতে স্বীকারোক্তিও দেয়।

কিন্তু ছয় সপ্তাহ পর, ২৬ এপ্রিল, ঢাকার শেখেরটেকের ভাড়া বাসায় দরজা ভেঙে পাওয়া যায় লামিয়ার ঝুলন্ত দেহ। শেখ রাসেল মেডিকেল কলেজে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শোনা যায় আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়েছে—এমন উড়ো খবরের ভয়ে লামিয়া এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও পুলিশ নিশ্চিত করেছে, আসামিরা কারাগারেই ছিল।

বাবার কবরের পাশে দাফন করা হয় লামিয়াকে। সেই নির্মম দৃশ্য—ছেলের পাশে নাতনির কবর খুঁড়ছেন দাদা—আজও সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তোলে। কিন্তু এই মৃত্যুর পর কিছু তীব্র প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় আমাদের সামনে।

প্রথম প্রশ্ন:
ধর্ষণের ঘটনার পর প্রায় ছয় সপ্তাহ সময় ছিল। রাষ্ট্র কি এই ভুক্তভোগী তরুণীকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে পেরেছিল? একটি কিশোরী কি রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়েছিল?

দ্বিতীয় প্রশ্ন:
মামলার প্রধান আসামিরা জেলে থাকলেও ‘জামিনে বেরিয়েছে’—এই গুজব কীভাবে ছড়ালো? ভুল তথ্য (misinformation) ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের ভূমিকা কতটা কার্যকর ছিল?

তৃতীয় প্রশ্ন:
ধর্ষণের পর লামিয়া পুনঃপৈনিক হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে বান্ধবীদের জানিয়েছিলেন—এগুলো কি দ্বিতীয় দফা সামাজিক ধর্ষণ নয়? শহর থেকে গ্রাম—কোথাও কি আমাদের সমাজ এই ধরনের মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পেরেছে?

চতুর্থ প্রশ্ন:
ট্রমায় আক্রান্ত এই কিশোরীটির চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সমাজের অমানবিক কৌতূহল আর সাংবাদিকতার অতি-আগ্রহ কি সেই মানসিক ট্রমা আরও বাড়িয়ে দেয়নি?

পঞ্চম প্রশ্ন:
আমাদের মিডিয়া কি যথেষ্ট জেন্ডার-সেন্সিটিভ? শিরোনাম, বর্ণনা এবং ছবির ব্যবহার কি লামিয়ার মতো ভুক্তভোগীর মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে করা হয়েছিল?

ষষ্ঠ প্রশ্ন:
আদালত দ্রুত বিচার নিশ্চিতে কী পদক্ষেপ নিয়েছিল? তদন্ত, মেডিকেল রিপোর্ট, সাক্ষ্যগ্রহণ—ছয় সপ্তাহে কতদূর অগ্রগতি হয়েছিল?

সপ্তম প্রশ্ন:
জুলাই আন্দোলনের শহীদের কন্যা হয়েও যখন অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয় না, তখন সাধারণ মানুষের কন্যারা কতটা সুরক্ষিত? এই ব্যর্থতার দায় কার?

অষ্টম প্রশ্ন:
অভ্যুত্থানের পরে রাষ্ট্রযন্ত্রে নতুন নেতৃত্ব আসার পরও ‘পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্র’-এর মতোই আচরণ দেখা যাচ্ছে। দলগুলো কি এই ইস্যুতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে, নাকি দায়সারাভাবে শোক ও ক্ষোভ জানিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছে?

নবম প্রশ্ন:
শোক মঞ্চে দাঁড়িয়ে কঠোর শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু আইনি লড়াই চালাতে লামিয়ার পরিবারকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা কি কেউ দিয়েছে? সেই আস্থার জায়গা কি কেউ তৈরি করতে পেরেছিল?

দশম প্রশ্ন:
এই মৃত্যু কি কেবল ‘আত্মহত্যা’? নাকি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, সামাজিক বিদ্রূপ, মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা এবং বিচারহীন সংস্কৃতির যুগপৎ হত্যাকাণ্ড?

প্রশ্নগুলো কাঁধে নিয়ে আমরা কোথায় দাঁড়াই?

গণঅভ্যুত্থান সদ্য ফ্যাসিবাদ ভেঙে দিয়েছে। সেই আন্দোলনের প্রথম বর্ষপূর্তির আগেই শহীদ পরিবারের একটি দীপ নিভে গেল। আমরা কি মেনে নিতে পারি?

কিন্তু, যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হতো, যদি গুজব থামানো যেত, যদি রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজ মিলে একটি কিশোরীকে শক্ত করে ধরে রাখতে পারত—তাহলে কি লামিয়া আজ বেঁচে থাকতো না?

লামিয়া শুধু একটি নাম নয়—তিনি আমাদের রাষ্ট্র এবং সমাজের সামষ্টিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

আর সেই মুখটাকে আমরা সিলিং ফ্যানে ঝুলতে দেখেছি।

আরেকজন লামিয়া আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার আগে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে। নাহলে এই রাষ্ট্রযন্ত্রের অমানবিকতা আর উদাসীনতার শিকার হয়ে আরও কতজন লামিয়া ঝুলবে—তা আমাদের কেউ জানে না।

Related articles:

এক দিনে দুই ভোটে কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর ভাগ্য নির্ধারিত হবে

ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে...

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা এবং একজন প্রফেসর রাজ্জাক |

স্ক্রিপ্টটি প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব, তাঁর চিন্তা, শিক্ষা-পদ্ধতি...

মানুষ ভালো নেই। বড্ড অসহায় আজ সাধারণ মানুষ |

স্ক্রিপ্টটি নতুন বাংলাদেশের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে—যেখানে চিকিৎসার খরচ...

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাম্য হত্যাকাণ্ড: দায় কার?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ছাত্র এবং ছাত্রদলের...