Trial & Beta Version

Homeধর্ম-দর্শনবহুজনহিতায়, বহুজনসুখায়, লোকানুকম্পায়ৈ, মহতো জনকায়স্যার্থায়

বহুজনহিতায়, বহুজনসুখায়, লোকানুকম্পায়ৈ, মহতো জনকায়স্যার্থায়

Date:

আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম…
আমি ধম্মের শরণ নিলাম…
আমি সংঘের শরণ নিলাম…

আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। এই দিনটি বুদ্ধের বিশেষ তিনটি স্মৃতি বিজড়িত দিন। এই দিন বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

আবার এই দিনেই বুদ্ধ বোধি লাভ করেন, ‘নির্বাণেই পরমানন্দ’ এই বোধ লাভ করেও বুদ্ধ থেকে গিয়েছিলেন মানুষের কাছে, আমাদের মাঝে। থেকে গিয়েছিলেন উপরের শ্লোকের অর্থ হয়ে, ‘‘বহু মানুষের মঙ্গলে, বহু মানুষের সুখের জন্য, প্রাণীদের প্রতি মমতার বশে, বৃহৎ মানবজাতির কল্যাণে।’’

তার বহু বছর পর এইদিনেই আবার শিক্ষাদান সম্পূর্ণ করে বুদ্ধ লাভ করেন মহাপরিনির্বাণ। ব্যাক্তিগত ভাবে আমাকে সর্বপ্রাণের প্রতি প্রেমাসক্ত করে তোলার জন্য এই মানুষটির প্রতি আমার শ্রদ্ধার আসলে সীমা নাই।

মায়ানমারের মংকেত শহরকে কেন্দ্র করে ৩৫০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটা বৃত্ত আঁকলে সেই বৃত্তটার ভেতরে যত মানুষ বাস করে- বাকি গোটা দুনিয়ায় তার চাইতে কম মানুষ বাস করে। যদিও এই ৩৫০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের বৃত্তের ক্ষেত্রফলের অর্ধেক এলাকা জুড়েই আছে সমুদ্র।

এই অর্ধবৃত্তের ভেতরে বাস করে দুনিয়ার অধিকাংশ বুদ্ধ, হিন্দু এবং ইসলাম ধর্মের অনুসারী মানুষেরা। এই বৃত্তের ভেতরে দুনিয়ার অধিকাংশ মিঠাপানির সংস্থান হয়। এই বৃত্তের ভেতরেই দুনিয়ার অধিকাংশ ফসল ফলে। এই বৃত্তের ভেতরেই আছে দুনিয়ার অধিকাংশ নদী। মানুষকে যদি একটা ফসল হিসাবে চিন্তা করি তাহলে মানুষ সবচেয়ে ভালো ফলে এই অঞ্চলে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় সাফল্য নদীর। মাটির সাথে বোঝাপড়া সবচেয়ে ভালো এইখানকার মানুষের। এই বৃত্তের মধ্যেই জন্মেছিলেন মহামতি গৌতম বুদ্ধ!

বুদ্ধ তো কোন স্পিরিচুয়াল গুরু নন। বুদ্ধ মূলত একজন কার্যকরণপন্থী বিজ্ঞানী, বুদ্ধ একজন দার্শনিক। বুদ্ধের সব দর্শন কিংবা বিজ্ঞানের মূল খোঁজাখুজিটা কেবল একটা প্রশ্নকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে।

সেই প্রশ্ন আর সেই খোঁজের বিষয়টা হচ্ছে ‘দুঃখ’। দুঃখ কি? দুঃখ কেন হয়? দুঃখ থেকে মুক্তির উপায় কি?

বুদ্ধ খুঁজেছেন, খুঁজতে খুঁজতে একদিন বুদ্ধ উত্তরও পেয়েছেন!

কি সৌভাগ্য আমাদের যে- এই ভূমিতে, এই মাটির এক অশুথ গাছের নিচে বসে আমাদের জন্য চার আর্যসত্যের নিরিখে দর্শনের মালা গেঁথেছিলেন তথাগত গৌতম!

বুদ্ধ পূর্ণিমা দিনটির শুরু থেকে শেষে আমাদের বুদ্ধের বোধিলব্ধ জ্ঞানের চর্চায় কাটানো উচিত। নিচের বুদ্ধকে নিয়ে নয়টি ছোট ছোট লেখা তুলে ধরলাম আপনাদের জন্য:

এক.

‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’

এই জগতে যেকোন কালে যখনই মানুষকে বলা হয়েছে তুমি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো? উত্তরে মানুষ ঈশ্বরকে দেখতে চেয়েছে। উত্তরে মানুষ কার্যকরণের কথা বলেছে। উত্তরে মানুষ নিরাকারকে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

কিন্তু বুদ্ধের প্রশ্ন ছিলো ব্যাতিক্রম, বুদ্ধ মানুষকে প্রশ্ন করেছেন ‘তুমি কি দুঃখে বিশ্বাস করো?’

মানুষ জানে দুঃখ নিরাকার। তবুও মানুষ এই নিরাকারকে অনুভব করেছে। জীবনে কোন না কোন সময় দুঃখ দ্বারা সে আক্রান্ত হয়েছে। দুঃখ থেকে পরিত্রাণ খুঁজেছে।

তাই মানুষের কাছে যখন দুঃখের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে তখন প্রখর জড়বাদী মানুষটিও অস্বীকার করতে পারেনি। তাঁর কার্যকরণের শাখা-প্রশাখা ভেঙে পড়েছে। প্রবল আবেগে চোখ আদ্র হয়ে এসেছে মানুষের। অসহায় মনুষ্যের আদ্র চক্ষু মুছে দিয়ে বুদ্ধ বলেছেন, ‘এসো আমার সাথে।’

বুদ্ধ দুখির, অসুস্থের, অসহায়ের সহায় হয়ে বলেছেন, ‘আমি তোমার দুঃখের নিদান দেবো।’

বার্ট্রান্ড রাসেল শেষমেশ ক্ষেপে গিয়ে বলেছেন, ‘বুদ্ধ চতুর। নিজেকে নাস্তিক দাবি করে এই লোক সবাইকে আস্তিক বানিয়ে ছেড়েছে!’

দুই.

‘সর্বম্ দুঃখম্ দুঃখম্’

মহামতি তথাগত গৌতমের বোধিলব্ধ প্রথম সত্য (যেটাকে ধর্মীয় পরিভাষায় বলে আর্যসত্য) হলো- ‘সর্বম্ দুঃখম্ দুঃখম্’। অর্থাৎ এই সংসারের সবকিছু দুঃখময়। জীবের জীবন দুঃখে পরিপূর্ণ। জন্ম, জরা, বিচ্ছেদ এবং মৃত্যু সবই দুঃখময়। দুঃখ মানব অস্তিত্বের নিত্যসাথী।

কার্ল মার্ক্স যেমন উদ্বৃত্ত মূল্যের হারিয়ে যাওয়া উৎসকে আবিষ্কার করেছিলেন, ঠিক সেই মাপের দুনিয়ার আর একটি মাত্র আবিষ্কারই হয়েছিল বলে চিহ্নিত করেন রাহুল সাংকৃত্যায়ন, সেটা হল দুঃখের সার্বজনীনতা।

বুদ্ধ মতে সুখ কখনোই দুঃখের বিপরীত কিছু নয়, সুখও এক ধরণের দুঃখ। উনি সুখকে বলেন দুঃখের ছদ্মবেশ বা ছদ্মবেশি দুঃখ। বুদ্ধের মতে এই সংসার যেহেতু অনিত্য এবং যা কিছু অনিত্য তাই দুঃখময়, ফলে সবকিছুই দুঃখময়। সর্বগ্রাসী এই দুঃখের কারণ আর দুঃখ থেকে মুক্তির উপায়ই গৌতম বুদ্ধের সাধনার লক্ষ্য। গৌতম বলছেন:

‘জন্মে দুঃখ, নাশে দুঃখ, রোগ দুঃখ, মৃত্যু দুঃখময়। অপ্রিয়ের সংযোগ দুঃখময়, প্রিয়জনের বিয়োগ দুঃখময়। সকল কিছুই দুঃখময়।’ (মহাসতিপতানসূত্ত/২২/১৮)

এই দুঃখ অল্প নয়, প্রচুর, ধম্মপদে বুদ্ধ বলছেন:

‘এ (দেহরুপ) গৃহের নির্মাতাকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে (জ্ঞানাভাবে) তাকে না পেয়ে বহু জন্ম এই সংসার পরিভ্রমণ করলাম। বারবার জন্ম নেয়াটাও দুঃখজনক, কষ্টদায়ক।’ (ধম্মপদ/জরাবর্গ/৮)

সবকিছুতে দুঃখ দেখতে পায় বলে অনেকে বৌদ্ধদর্শনকে নৈরাশ্যবাদী (নিহেলিস্ট) দর্শন হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়, এ চাওয়াটাই যে বিরাট একটা সাধনাকে নালিফাই করার একটা ব্যর্থ চেষ্টা, বৌদ্ধদর্শন যে আশাবাদে পরিপূর্ণ এবং এ দুঃখরোগের নিরোধ যে আছে সেটা ধম্মপদে বুদ্ধ স্বয়ং বলছেন:

‘প্রিয় কিংবা অপ্রিয় কোন কিছুতেই অনুরক্ত হয়ো না। কারণ প্রিয়বস্তুর অদর্শন এবং অপ্রিয়বস্তুর দর্শন উভয়ই দুঃখজনক। তাই প্রিয়ানুরাগী হয়ো না। প্রিয়বিচ্ছেদ দুঃখজনক। যাঁর প্রিয়-অপ্রিয় কিছুই নেই তাঁর কোন বন্ধন থাকে না। প্রিয় থেকে শোকের উৎপত্তি হয়, প্রিয় থেকে ভয়ের উৎপত্তি হয়। যিনি প্রিয়াসক্তি থেকে উত্তীর্ণ তাঁর শোক থাকে না, ভয় থাকবে কিভাবে? প্রেম থেকে, আসক্তি থেকে শোকের উৎপত্তি হয়। প্রেম থেকে, তৃষ্ণা থেকে ভয়ের উৎপত্তি হয়। যিনি প্রেম, আসক্তি, কাম, তৃষ্ণা থেকে উত্তীর্ণ তাঁর শোক থাকে না, ভয় থাকবে কিভাবে?’ (ধম্মপদ/প্রিয়বর্গ/২-৮)।

দুঃখ জিনিসটা আসে আকাঙ্ক্ষা থেকে। অপ্রিয় মানুষকে না দেখতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আবার প্রিয় মানুষকে দেখতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দুটো ঘটনায় দিনশেষে জীবনকে দুঃখময় করে তোলে। বুদ্ধ বোঝাতে চাইছেন সুখ জিনিসটাও দুঃখের ছদ্মবেশ।

তিন.

‘এবং খাদ্য নিয়ে তথাগত যা বললেন!’

সেমেটিক কিংবা সনাতন যেই মতবাদের কথাই বলেন, আমার এই জীবনে কঠোরভাবে ধর্ম অনুসারিদের রিলিজিয়াস আলাপ যতটুকু দেখার সৌভাগ্য হয়েছে তাতে মনে হয়েছে- সাধারণ লেভেলের ‘আম’ অনুসারিদের গভীরে গিয়ে চিন্তা করতে খুব কমই উৎসাহিত করা হয়েছে। বুদ্ধবাদ ব্যাতিক্রম বো’ধয় এই জায়গাতেই।

যেখানে বুদ্ধইজম একেবারেই হিন্দুইজমের কাছাকাছি সময়ের একটা মতবাদ, যা আসলে জৈন বা শিখ কিংবা বাহাইজম বা আহমদিদের মত একটা বড় পরিপুষ্ট ধর্মের ছায়াশ্রিত মতবাদের বদনাম থেকে বের হতে পারার কথা না, সেখানে গৌতম বুদ্ধ কি এমন করলেন যেটা তাকে বিশ্বব্যাপী সফলতা এনে দিয়েছে? আমার মতে সেই জিনিসটা হচ্ছে আওয়াম বা সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে চিন্তা করতে উৎসাহ দিয়ে বুদ্ধ বলতে চেয়েছেন: ‘তোমার দার্শনিক তুমি নিজে হও!’

শেষ পর্যন্ত অবশ্য আর সব ধর্মের মতই সংখ্যাগরিষ্ঠ বুদ্ধধর্মালম্বিদের কাছে বুদ্ধের দর্শনটা আচারি ধর্মই থেকে গেছে, তবু এখনো তাদের মঙ্কদের টিচিং-এ গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করাকে কমবেশি উৎসাহ দেয়া হয়। তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বুদ্ধ একবার তার সঙ্গীদের একটা গল্প বলছেন কোন জিনিস খাওয়া যাবে আর কোন জিনিস খাওয়া যাবে না এটা বোঝাতে গিয়ে।

বুদ্ধ বলছেন, ধর একটা তরুণ দম্পতি তাদের দুই বছরের আদরের সন্তানকে নিয়ে একটা বিশাল মরুভূমি পার হতে চেষ্টা করছেন। কোন না কোন কারণে এই মরুভূমিটা পার হতেই হবে এই দম্পতিকে। তাদের কোন একটা কমিটমেন্ট আছে। তো তাদের কাছে সামান্য যে খাদ্য ছিল সেই খাদ্য নিয়ে তারা এগিয়ে চলছে। কিছুদূর যাওয়ার পর তাদের খাবার শেষ হয়ে গেলো।

তারা চিন্তা করে দেখলো এইভাবে তাদের পক্ষে মরুভূমি পার হওয়া সম্ভব হবে না। মরুভূমিটা পার হবার আগেই তারা মারা পড়বে। তখন তারা ভাবলো যদি তারা তাদের সন্তানকে হত্যা করে এবং তার মাংস খায় তাহলে হয়তো তারা মরুভূমিটা পার হয়ে তাদের কমিটমেন্ট ফুলফিল করতে পারবে।

গল্পের এই পর্যায়ে এসে বুদ্ধের সঙ্গীরা খুব অস্বস্তি বোধ করতে থাকলো। মানে এরকম নৃশংস উদাহরণ দেয়ার প্রয়োজনটা কি? অনেকে প্রশ্ন করে বসলেন, সন্তানকে হত্যা না করে একসাথে মরেও যেতে পারাও তো সমাধান হতে পারে।

বুদ্ধ বললেন তোমরা এই গল্পটার আসল জায়গাটা মিস করছো। আগে আমি কথা শেষ করি।

উনি বললেন, ধরে নাও তারা তাদের আদরের সন্তানটাকে খেয়েই ফেললো সার্ভাইভ করার জন্য। তর্কের খাতিরে ধরেই নাও। আমার প্রশ্নটা হলো নিজের সন্তানের মাংস খাওয়ার সময় তারা কি সেই মাংসটাকে এঞ্জয় করতে পারবে? তারা কি বলতে পারবে তাদের সন্তানটা অনেক সুস্বাদু ছিলো? পারবে কি?

সবার খুব বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলো, ‘না’। এই খাদ্যের প্রশংসা বা অ-প্রশংসা কোনটাই করা সম্ভব না।

বুদ্ধ বললেন সবরকম খাদ্যের ক্ষেত্রেই ঘটনাটা তাই। এই পুরো জগত কোন না কোন ভাবে কানেক্টেড। সবাই আমাদের আত্মীয়। আমি যখন আমার নিজের সন্তানের মাংস খাই তখন আমি এপ্রিশিয়েট করতে পারি না, কিন্তু গরুর সন্তানের মাংস আমি এপ্রিশিয়েট করতে পারি। কারণ আমি গরুর সাথে নিজেকে কানেক্টটেড ফিল করি না। এটা শুধু গরুর বেলাতেই হয় না। একটা তৃণের বেলাতেও একই ঘটনা ঘটে। আমি কষ্ট দিয়েই তার পাতাটা খাচ্ছি, চালটা খাচ্ছি। কেউ না কেউ কষ্ট পাচ্ছে।

ফাইনলাইন হল জীবন নামের এই দীর্ঘ মরুভূমি পার হতে আমাদের অনেক প্রাণ হত্যা করতে হতে পারে। আমি তোমাদের কখনোই বলবো না- তুমি মাংস খাবে, নাকি মাছ খাবে, নাকি শাক-লতাপাতা খাবে। আমি শুধু বোঝাতে চাই তুমি যেটাই কনজিউম করছো সেটাই আরেকজনের সাফারিং-এর মধ্য দিয়ে আসছে, এই বিষয়টা শুধু মাথায় রেখো। খাবার জিনিসটাকে কখনো এঞ্জয় কোরো না। আরেকজনের সাফারিং এঞ্জয় করা উচিত নয়। খাবার খাও সার্ভাইভ করার জন্য। কোনমতে টিকে থাকার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু। এর বেশি না, কমও না।

খৃষ্টের জন্মের ৪৮০ বছর আগে জন্ম নেয়া গৌতম আবিষ্কার করেছিলেন মানুষের সাফারিং-এর মূল কারণ তার এটাচমেন্ট। আজকে দুই হাজার পাঁচশ দুই বছর পরে এসেও যদি আমরা অনেকে এই সিম্পল জিনিসটা বুঝতে না পারি, তাহলে কি হয় বলেন?

চার.

‘আর বেশি না, মাত্র দুই মাইল’

একবার গৌতম বুদ্ধ আর আনন্দ হেঁটে হেঁটে একটা গ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। সকাল থেকে হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা হতে চলল। কিন্তু গ্রামের দেখা নাই। সামনে একটা গা ছমছম করা জঙ্গল।

আনন্দ ভর সন্ধ্যাবেলায় জঙ্গলের পথ দিয়ে যেতে একটু ভয় পাচ্ছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল যেভাবেই হোক জঙ্গলে যেন রাতটা না কাটাতে হয়।

আনন্দ রাস্তায় এক কৃষককে দেখে বললেন, ভাই গ্রাম আর কতদূর?

কৃষক উত্তর দিলেন, আর বেশি না মাত্র দুই মাইল…

কৃষকের সাথে বুদ্ধের চোখাচোখি হল। দুইজনই স্মিত হেসে মাথা নেড়ে বিদায় নিলেন। আনন্দ একটু অবাক হলেন! বুদ্ধ হেসে উঠলেন কেন? যাই হোক কথা না বাড়িয়ে দুইজন পা বাড়িয়ে হাঁটতে লাগলেন।

আরও পাঁচ মাইল হাঁটার পর হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লান্ত আনন্দ পথ দিয়ে আরও একজন কৃষককে হেঁটে ফিরতে দেখলেন। তাকেও একই প্রশ্ন করলেন।

কৃষক উত্তর দিলেন, এই তো চলে আসছেন আপনারা, আর মাত্র দুই মাইল…

এই কৃষকের সাথেও বুদ্ধের চোখাচোখি হল। দুজনই হেসে উঠলেন।

আর দশ মাইল হাঁটার পর ঠিক একই ঘটনা ঘটলো। আনন্দ বুদ্ধের সাথে চল্লিশ বছর আছে। নীরবতার অনেক মানেই তিনি জানতেন। কিন্তু এবার আর বাঁধ ধরে রাখতে পারলেন না। বুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি আপনার সাথে বহুরাত হেঁটে কাটিয়েছি, এই কৃষকরা সবাই আমাদের মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে সেটা নিয়ে আমার কোন সমস্যা নাই, আমি শুধু বুঝতে পারছি না আপনারা হাসছেন কেন?’

‘কারণ আমরা আসলে একই লোক’, বুদ্ধ বললেন, ‘আনন্দ, ঐ গ্রামটাতে আমি আরও গিয়েছি। আগামীকাল সারাদিন হাঁটার পরেও আমরা ঐ গ্রামটাতে পৌঁছাতে পারবো না। এটা ঐ কৃষকরা যেমন জানেন, আমিও তেমন জানি। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে তোমার শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তোমার এখন সত্যের চাইতে প্রণোদনা বেশি দরকার। এই কৃষকেরা তোমাকে সেটাই দিচ্ছেন। আমিও পথের ধারের এই কৃষকের মতই সারাজীবন মানুষকে বলেছি আর একটু হাঁটো… সামনেই মুক্তি…। একই পেশার দু’জন মানুষের দেখা হলে হেসে শুভেচ্ছা বিনিময় করাটাই নিয়ম। এজন্যই আমরা হাসলাম।’

সত্য মিথ্যা এই বিষয়গুলো খুব প্রশ্ন সাপেক্ষ। সাদা তথ্য উপস্থাপন সবসময় সত্য না। আরও গভীরভাবে বললে সাদা তথ্য উপস্থাপন কখনোই সত্য না। বরং সত্য তো সেটাই যেটা আমাকে দুই মাইল সামনে হাঁটার প্রেরণা দেবে।

পাঁচ.

‘পাপ হবে কেন?’

জাপানে সেবার খুব শীত পড়েছে। শস্যক্ষেত ও পাইনের বন বরফে ঢেকে আছে। পাইন বনের ওপারের পাহাড়টিও বরফে ঢাকা। পাহাড়তলীর এক দরিদ্র কৃষক। সে তার পরিবারের লোকজন নিয়ে তীব্র শীতে ভুগছিল। কাঠ ফুরিয়ে গেছে। ভয়ানক শীতে জমে যাবার উপক্রম।

কৃষক অবশেষে ভালুকের ছালের পোশাক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অথৈ তুষারের মধ্যে দাঁড়ালেন। ধীরে ধীরে পাহাড়ের দিকে যেতে থাকেন কৃষক। পাহাড়ে জেন সন্ন্যাসীরা বাস করেন। সাধুদের কাছ থেকে কাঠ চেয়ে আনবেন। জেন সন্ন্যাসীরা দয়ালু। তারা নিশ্চয়ই কৃষককে ফিরিয়ে দেবেন না।

কৃষক বহুকষ্টে পাইন বনের শুভ্র তুষার পেরিয়ে জেন সাধুদের কাঠের কুটিরে পৌঁছলেন। প্রধান জেন সাধু তুষারময় পাথুরে প্রাঙ্গনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি কৃষককে অভ্যর্থনা জানালেন। কৃষক বলল, ‘মাননীয়, আমার কাঠ ফুরিয়ে গেছে। দয়া করে আমাকে কিছু কাঠ দিয়ে সাহায্য করুন।’

‘তুমি অপেক্ষা কর, আমি তোমার জন্য কাঠ নিয়ে আসছি।’, বলে জেন সাধু ভিতরে চলে গেলেন। একটু পর ফিরে এলেন। দু-হাতে বড় একটি কাঠের মূর্তি! কৃষককে দিয়ে বললেন, এই নাও।
কৃষক আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘এ কি! এ যে বুদ্ধমূর্তি।’

  • হ্যাঁ। তো? আমাকে বুদ্ধমূর্তি পোড়াতে দিলেন?
  • হ্যাঁ। আমাদের এখানে আর কাঠ নেই।

বুদ্ধমূর্তি পোড়ালে পাপ হবে না?

  • না। পাপ হবে কেন? তোমার কাঠের প্রয়োজন। যাও, বাড়ি ফিরে এটা পুড়িয়ে শীতের কষ্ট থেকে বাঁচো!

আমাদের বুদ্ধকে নিয়ে এতসব আলোচনা সবই আসলে নিজের জন্য, আমি যেন একটু সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারি তার জন্য। শীতের প্রয়োজনের বুদ্ধমূর্তি পোড়াতে হলে এতে কোন পাপ নাই।

ছয়.

‘শান্তি’

একবার এক লোক বুদ্ধের কাছে এসে বললেন, ‘তথাগত, আমি শান্তিতে থাকতে চাই’।

বুদ্ধ বললেন প্রথমে তোমার বাক্য থেকে ‘আমি’ কথাটা বাদ দাও, এইটা ইগো। তারপর বাদ দাও ‘থাকতে চাই’ কথাটা, এইটা আকাঙ্ক্ষা।

দেখো এখন কি পড়ে আছে? ‘শান্তি’, ‘শুধুই শান্তি’

সাত.

ধম্মপদে বুদ্ধ বলেন:

মানুষ ‘আমার পুত্র’, ‘আমার সম্পদ’ এসব চিন্তায় যন্ত্রণা ভোগ করে। যখন সে নিজেই নিজের না তখন পুত্র বা সম্পদ তার হয় কিভাবে?

বুদ্ধ আরও বলেন:

লোকে আমাকে ‘তিরস্কার করিলো’ কিংবা আমাকে ‘প্রহার করিলো’ কিংবা আমাকে ‘পরাস্ত করিলো’ (মিথ্যা সাক্ষ্য বা দোষ অস্বীকার করিয়া) কিংবা আমার ‘দ্রব্য অপহরণ করিলো’, এই চিন্তা যাহারা সবসময় মনে পোষণ করেন, তাহাদের বৈরভাব বা ক্রোধ কখনো শান্ত হয় না।

ধম্মপদ, অধ্যায়: ১

আট.

এইচ জে ওয়েলস একবার বলেছিলেন, গৌতম বুদ্ধ হলেন এক প্যারাডক্স, ঘোর অধার্মিক এবং তারপরেও সবচেয়ে ধার্মিক মানুষ। তিনি কখনো ঈশ্বর সম্পর্কে কথা বলেন নি, তিনি কখনও ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতেও বলেন নি। তাঁর শিক্ষায় ঈশ্বরের কথা একেবারে অনুপস্থিত। তাঁর মতে এটা আলোচনার প্রয়োজনীয়তা নেই। ঘোর অধার্মিক এবং তারপরেও সবচেয়ে ধার্মিক লোকটার নাম বুদ্ধ। বুদ্ধের মতো ঈশ্বরপ্রেমী আর কেউ নেই, বুদ্ধের মত এমন সহজ মাধুর্যময়- ঠিক একটা পদ্মফুলের মতো, অনুমেয় শুদ্ধতম চেতনা, সকালের সূর্যের আলোয়, ভোরের সূর্যের আলোয় শিশির বিন্দুর মত বিশুদ্ধ।

নয়.

কালাম সূত্রে বুদ্ধ বলেন, ‘হে ভিক্ষু, কোন কথা এমনকি স্বয়ং আমি বলছি বলেই তা বিশ্বাস কোরো না।’

কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হবে সেটা নিয়ে আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে তথাগত গৌতম বলেছেন:

  • কোন কথা বারবার শুনছ বলেই তা বিশ্বাস কোরো না।
  • কোন কথা প্রাচীনকাল থেকে শুনে আসছ বলেই তা বিশ্বাস কোরো না।
  • যে কথা গুজব বা শোনা কথা, তা বিশ্বাস কোরো না।
  • কোন কথা ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে বলেই তা বিশ্বাস কোরো না।
  • যে কথা শুধুমাত্র অনুমান করে বলা হয়েছে, তা বিশ্বাস কোরো না।
  • কোন কথা তোমার নিজের ভাবনার সাথে মিলে যাচ্ছে বলেই, তা বিশ্বাস কোরো না।
  • যে কথা যিনি বলছেন, তিনি খুব বুদ্ধিমান বা ক্ষমতাশালী মনে হচ্ছে, তাই বিশ্বাস কোরো না।
  • কোন কথা একজন সন্ন্যাসী, গুরু কিংবা ‘আমি’ বলেছি বলেই তা বিশ্বাস কোরো না।

এরপর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতের দুটো উপায় বাতলে দেন বুদ্ধ:

  • নিজে চিন্তা করো এবং পর্যবেক্ষণ করো।
  • যদি দেখো যে কোনো কিছু ভালো, নির্দোষ, উপকারী এবং পরীক্ষিত জ্ঞানীরা যা প্রশংসা করছেন, তা তুমি মেনে নিতে পারো এবং অনুসরণ করতে পারো।

অর্থাৎ, বুদ্ধ নিজের বিচার ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করতে উৎসাহিত করছেন। তিনি বলছেন, চোখ বুজে কিছু মেনে নিও না— নিজে যাচাই করে দেখে সত্যকে চিনে নাও।

Related articles:

হারারি গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে জীবন বদলে দেয়ার মত কিছু কথা বলেছিলেন

গৌতম ২৯ বছর বয়সে এক মধ্যরাতে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে...

গাজীর পীর, বনবিবি আর বাঘ দেবতার গল্প: সুন্দরবনের অনন্য সহাবস্থান

ছবিটা দেখুন—একদিকে এক দেবী, তার পাশে দাঁড়ি ও টুপি...

নবী মুহাম্মদ: ইতিহাসের প্রথম নারীবাদী?

ইউবি-কুইটি ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর জিম গ্যারিসন, যিনি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়...

বুদ্ধের চার আর্যসত্য

গৌতম বুদ্ধের দর্শন ও শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চারটি মৌলিক...

নূহের প্লাবন: বাইবেল ও কোরআনের আখ্যান

নবী নূহের প্লাবনের গল্প বাইবেল ও কোরআনে গুরুত্বপূর্ণভাবে বর্ণিত...