বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বর্ষীয়ান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বদরুদ্দীন উমরের বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। চলমান রাজনৈতিক সংকট, অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিস্তার নিয়ে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ আমাদের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচন করেছে।
ক্ষমতাহীন সংস্কার ও নির্বাচনের তাগিদ
উমরের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার কোনো মৌলিক সংস্কার আনতে সক্ষম নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুলিশ বা প্রশাসনিক কোনো খাতে বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “সংবিধানের মতো বিষয়ে হাত দিতে পারে কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই।” তাই সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করা।
জুলাই অভ্যুত্থান: বিপ্লব নয়, ক্ষমতার পালাবদল
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও, উমরের দৃষ্টিতে তা কোনো সামাজিক বিপ্লব নয়। “শ্রেণি কাঠামো বা মালিকানার সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আসেনি,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কর্তৃত্ব আগের মতোই অটুট। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদল, রাষ্ট্র গঠনের নতুন ভিত্তি তৈরি হয়নি।
ছাত্র রাজনীতির দক্ষিণমুখী বাঁক
বায়ান্ন, ঊনসত্তর, নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলন ছিল বামপন্থী চরিত্রের। কিন্তু সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনকে তিনি অবাক বিস্ময়ে দক্ষিণপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেন। “এটি রাজনীতির এক অভাবনীয় ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন,” বলে উমর বুঝিয়ে দেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন দক্ষিণপন্থার প্রভাব অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
এনসিপি: আদর্শহীন, ব্যবসায়ী প্রভাবিত দল
উমরের মতে, নবগঠিত ছাত্র সংগঠন এনসিপি আদর্শিকভাবে দুর্বল এবং ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রভাবাধীন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে অভ্যুত্থানের পরপরই এই দল বিত্তবৈভব অর্জন করল? তাঁর ভাষায়, “তাদের লক্ষ্য দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়া, মৌলিক সমস্যা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই।”
মধ্যপন্থা: প্রচ্ছন্ন দক্ষিণপন্থা?
এনসিপি নিজেদের ‘মধ্যপন্থী’ বলে দাবি করলেও, উমর তা নাকচ করেন। তাঁর মতে, “মধ্যপন্থা আসলে প্রচ্ছন্ন দক্ষিণপন্থা।” ধর্মীয় বাগাড়ম্বর ও কৃষক-শ্রমিক প্রশ্নে নীরবতা এটি প্রমাণ করে।
নির্বাচনই এখন একমাত্র সমাধান
উমরের ভাষায়, দেশের বর্তমান নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতিতে দ্রুত নির্বাচনই একমাত্র সমাধান। সরকারের কালক্ষেপণ সংকটকে আরও গভীর করবে। “ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন না হলে পরিস্থিতি আরও নাজুক হবে,” এমনটাই তাঁর সতর্কবার্তা।
আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণ: সময়ের দাবি?
নীতিগতভাবে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিরোধী হলেও, আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা তিনি সমর্থন করেন। উমরের মতে, “বর্তমান আওয়ামী লীগ আর রাজনৈতিক দল নয়। এটি বিদেশি শক্তির চর এবং দেশের স্বার্থবিরোধী। শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের সাথে এর কোনো মিল নেই।”
উমরের বক্তব্যে আরও উঠে আসে, “শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ভারতের নির্দেশে চলে। ভারতের কলকাতার নিউ টাউন তাদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।” তাঁর মতে, এদের কার্যক্রম চলতে দেওয়া দেশের জন্য বিপজ্জনক।
আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান সম্ভব নয়
জামায়াতের মতো আওয়ামী লীগও গোপনে সংগঠিত হতে পারবে না বলে মনে করেন উমর। কারণ দলটি গণবিচ্ছিন্ন এবং নাশকতামূলক কাজেই মনোযোগী। জনগণের সমর্থন ছাড়া পুনরুত্থান সম্ভব নয়।
বামপন্থার ভবিষ্যৎ
সবশেষে, উমর আশাবাদ ব্যক্ত করেন বামপন্থার পুনর্জাগরণের বিষয়ে। তাঁর মতে, “শোষণ ও শ্রেণিদ্বন্দ্ব থাকায় বাম রাজনীতির শর্ত এখনও বিদ্যমান।” যদিও বর্তমানে তা দুর্বল, ভবিষ্যতে এর উত্থান অবশ্যম্ভাবী। তবে, কবে সেটি বাস্তবায়িত হবে, তা বলা কঠিন।
চিন্তার খোরাক: চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
উমরের এই বিশ্লেষণ আমাদের সামনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উপস্থাপন করে—
1️⃣ জুলাই অভ্যুত্থান ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটালেও কেন সামাজিক বিপ্লব আনতে ব্যর্থ হলো?
2️⃣ নবগঠিত এনসিপি কেন সুস্পষ্ট আদর্শগত ভিত্তি ছাড়াই ভাসমান অবস্থায় রয়েছে?
3️⃣ অন্তর্বর্তী সরকার মৌলিক সংস্কারে অক্ষম হলে, দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে না কেন?
4️⃣ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক বাম প্রভাব থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণপন্থার এমন বিস্তার কেন ঘটল? এর ভবিষ্যৎ কী?



