Trial & Beta Version

Homeবিশেষ পোস্টফারাক্কা লং মার্চ: ৯০ বছরের সিংহের গর্জনে কেঁপে উঠেছিল আগ্রাসনের তখত

ফারাক্কা লং মার্চ: ৯০ বছরের সিংহের গর্জনে কেঁপে উঠেছিল আগ্রাসনের তখত

Date:

আজ ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ দিবস। ফিরে যাই ১৯৭৬ সালের ১৬ই মে। বাংলাদেশ দেখেছিল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য—৯০ বছরের এক বৃদ্ধ, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। শরীর ক্লান্ত, কিছুদিন আগেই ফিরেছেন হাসপাতাল থেকে। তবুও তাঁর চোখে ছিল তারুণ্যের আগুন। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর পেছনে, উদ্দেশ্য ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক লং মার্চ।

ফারাক্কা বাঁধের পটভূমি
ভারত ১৯৭৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ তৈরি করে। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার অজুহাতে শুরু হলেও এর প্রকৃত লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ বন্ধ করা। শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে মরুকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি ভাগাভাগির একটি সমঝোতা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, পানি ভাগাভাগি না হওয়া পর্যন্ত ফারাক্কা চালু হবে না। কিন্তু ভারত সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনি। ১৯৭৫ সালের ২১শে এপ্রিল ‘পরীক্ষামূলক’ বলে শুরু হওয়া ফারাক্কা বাঁধের কার্যক্রম আর থামেনি। বাংলাদেশের নদ-নদী শুকিয়ে ফেলে শুরু হয় চরম পানি সংকট।

মজলুম জননেতার ডাকে সাড়া
১৯৭৬ সালের ১৮ই এপ্রিল হাসপাতাল থেকে ফিরে মাওলানা ভাসানী ঘোষণা দেন, “ভারত যদি বাংলাদেশের পানি বন্ধ করে, আমি লং মার্চ করব!” তাঁর এই ঘোষণায় সারা দেশ চমকে ওঠে। ৯০ বছরের বৃদ্ধ একা কীভাবে নেতৃত্ব দেবেন এই কঠিন যাত্রার? কিন্তু তাঁর ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেনি কেউ।

ঐতিহাসিক পদযাত্রা
১৬ই মে, রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দানে সমবেত হয় লাখো মানুষ। এক আওয়াজে ধ্বনিত হয়, “ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও!” ভাসানী এলেন নীল গাড়িতে চেপে, জনসমুদ্র গর্জে উঠল। শুরু হলো ৬৪ মাইল দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক পদযাত্রা। রাজশাহী থেকে প্রেমতলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মনকষা হয়ে শিবগঞ্জ পর্যন্ত।

পথে মুষলধারে বৃষ্টি হলেও কেউ থামেনি। পথে হাজারো মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল মিছিলকারীদের জন্য খাবার আর পানি নিয়ে। সেই দীর্ঘ যাত্রার একপর্যায়ে মহানন্দা নদীর বুকে নিজেরাই নৌকা তৈরি করে পার হয়ে যায় লাখো মানুষ। এটি ছিল এক অসাধারণ ঐক্যের প্রতিচ্ছবি।

কানসাটের জনসমুদ্র ও ভাসানীর হুঙ্কার
লং মার্চ পৌঁছায় কানসাটে, ভারতীয় সীমান্তের একদম কাছে। সেখানে আয়োজিত জনসভায় মাওলানা ভাসানী বললেন, “ভারত যদি বাংলাদেশের দাবি উপেক্ষা করে, তবে ভারতীয় পণ্য বর্জন করতে হবে।” তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল জাতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা। তিনি বলেন, “বাংলার মানুষ এক আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না।”

সীমান্তের ওপারে ভারতীয় সেনারা ছিল সতর্ক প্রহরায়, কিন্তু ভাসানীর ডাকে আসা লক্ষ মানুষের দৃঢ়তা তাদের ভীত করেছিল।

ফলাফল ও দীর্ঘশ্বাস
মাওলানা ভাসানীর অসুস্থতার কারণে লং মার্চ সীমান্তের কাছে এসে থেমে যায়। কিন্তু এর প্রতিধ্বনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে যায়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই ইস্যু জাতিসংঘে তুলে ধরেন, এবং ভারত কিছুটা নমনীয় হয়।

তবে, সেই ঐতিহাসিক পদযাত্রার পরে মাওলানা ভাসানীর শরীর আর সায় দেয়নি। ১৯৭৬ সালের ১৭ই নভেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন।

১৯৯৬ সালে পানি চুক্তি হয় বটে, কিন্তু তাতে ছিল শুভঙ্করের ফাঁকি। গ্যারান্টি ক্লজ না থাকায় শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ প্রায়শই পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়।

Related articles:

এক দিনে দুই ভোটে কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর ভাগ্য নির্ধারিত হবে

ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে...

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা এবং একজন প্রফেসর রাজ্জাক |

স্ক্রিপ্টটি প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব, তাঁর চিন্তা, শিক্ষা-পদ্ধতি...

মানুষ ভালো নেই। বড্ড অসহায় আজ সাধারণ মানুষ |

স্ক্রিপ্টটি নতুন বাংলাদেশের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে—যেখানে চিকিৎসার খরচ...

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাম্য হত্যাকাণ্ড: দায় কার?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ছাত্র এবং ছাত্রদলের...